দেশে মোটরসাইকেলের বাজার কত?
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাসে গড়ে ২৫-২৬ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসের তুলনায় ২০২৫ সালে এ বাজার ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৫ মার্চের ঈদুল ফিতরে গত ২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেলের বাজার প্রায় ৫০ হাজার ইউনিট অতিক্রম করে, যা খুব আশাজনক।
২০১৮ সালের মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালায় ২০২৭ সালের মধ্যে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনো তিন-চার লাখ উৎপাদনের মধ্যে আটকে আছি। তবে সরকারের মোটরসাইকেল শিল্পবান্ধব নীতিমালা ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলে ২০২৭ সালের মধ্যে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
বাজার বিস্তারে বাধা কাটিয়ে উঠতে সরকারে কাছে আপনাদের দাবি কী?
যদি বাজার বিস্তারে প্রতিবন্ধকতার কথা বলি, তাহলে প্রথমেই বলব মূলধন ও ঋণ সুবিধার কথা। আসিয়ান দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাব, কোনো গ্রাহক মোটরসাইকেল কিনতে চাইলে ওইসব দেশের প্রায় সব ব্যাংক ও অর্থ জোগানদানকারী প্রতিষ্ঠানই তাকে স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে, যা আমাদের দেশে এখনো নেই। আমাদের মোটরসাইকেল ক্রেতাদের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষই বেশি। এ জায়গায় নীতি-সহায়তা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে যদি ঋণ দেয়ায় উদ্বুদ্ধ করা যায় তাহলে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের বাজার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব। ফলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে জিডিপির একটি বড় অংশ এ খাত থেকেও আয় করা সম্ভব।
দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতা—দেশে মোটরসাইকেলের দাম পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় এখনো বেশি। মোটরসাইকেলের দামের সঙ্গে নিবন্ধন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে পণ্যটির দাম সবচেয়ে বেশি।
তৃতীয়ত—ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে না ওঠা। মোটরসাইকেল তৈরিতে ইঞ্জিন থেকে শুরু করে চেইন, সিট কভার ও অন্যান্য নানা যন্ত্রাংশ উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে। এ প্রয়োজন মেটাতে ভেন্ডর-নির্ভর ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলতে হবে।
আর চতুর্থ প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে—স্থানীয় দক্ষ লোকবল ও কারিগরি দক্ষতার অভাব। এ বিশাল দক্ষ লোকবলের চাহিদা মেটাতে আমাদের স্থানীয় লোকবলকে আরো বেশি করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
এছাড়া আরেকটি নতুন বিষয় আমি সংযুক্ত করতে চাই—তা হলো ইজিবাইক। দুজনের বাহন মোটরসাইকেল ১০ বছরের জন্য নিবন্ধন ফি প্রায় ২৫ হাজার টাকার মতো, এর সঙ্গে লাইসেন্স ফি তো রয়েছেই। থ্রি হুইলারের ক্ষেত্রে ফি আরো বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে ৪০ লাখের বেশি ইজিবাইক রয়েছে। সরকারকে কোনো রেজিস্ট্রেশন ফি বা ট্যাক্স না দিয়েই তিন-১০ জন যাত্রী নিয়ে এ বাহন রাস্তায় চলছে, চালকদের নেই কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা এ সম্পর্কিত জ্ঞান। এ বিষয়টি আমাদের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়। আমি ইজিবাইক চলাচলের বিপক্ষে নই। তবে তা হতে হবে আইন অনুসারে, যুক্তিযুক্ত ফি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে—যাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো যায়।
সরকার মোটরসাইকেলের দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরিতে উৎসাহ দিচ্ছে। বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোকেও এখানে উৎপাদন কারখানা গড়ার আহ্বান জানাচ্ছে। সে অনুযায়ী উৎপাদকরা নীতি-সহায়তা কতটা পাচ্ছে?
মোটরসাইকেলের দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরির জন্য পৃথিবীজুড়ে পর্যালোচনা করে মোটরসাইকেল শিল্প ব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি নতুন নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। সরকারের নীতি-সহায়তার কথা যদি বলি, এখনো এটা অপ্রতুল। অর্থনৈতিক ও শুল্ক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলে দেশের বাজারে কতটুকু চাহিদা মেটাতে পারছে?
মাত্র সাত বছর আগেও দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদার ৯৫ শতাংশ মেটানো হতো আমদানির মাধ্যমে। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি বিপরীত। সরকারের নীতিগত সহায়তা পাওয়ায় এ শিল্পের প্রাথমিক কিক-স্টার্ট শুরু হয়েছে। বর্তমানে রাস্তায় চলছে এমন সব মোটরসাইকেলের প্রায় ৯৫-৯৮ শতাংশই হয় দেশে তৈরি। ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনে দশটির মতো কারখানা বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছে।
মোটরসাইকেলের দাম আরো কমানো এবং গ্রাহকের নাগালে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ ডলারের দাম। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দুইভাবে পড়ে। প্রথমত, সরাসরি আমদানি খরচ বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, আমদানিতে শুল্ককর আরোপের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডলারের দাম বাড়ায়। এতে শুল্ককরের পরিমাণ বাড়ে। ফলে দাম কমানোর পাশাপাশি গ্রাহকের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জরুরি যা মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক পরিবেশ, চাকরিচ্যুতি, বেকারত্বের হার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্ভব।
বর্তমানে মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে কিছুটা শুল্ক সমন্বয় করা গেলে এ খাতের উদ্যোক্তারা স্বস্তি পাবেন।










