মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারে ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। এর ফলে গ্রামীণফোনের আয়-ব্যয়ে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে?

এ বছরের শুরুর দিকে মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। গ্রাহকদের দাবি, মোবাইল ফোন অপারেটরদের যুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়।

ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির জন্য সংকল্পবদ্ধ টেলিযোগাযোগ শিল্প। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ এ অগ্রগতি ব্যাহত করবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য বাড়াবে। গ্রাহকদের স্বার্থে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গঠনের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা চাই, সরকার যেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেয়। আমরা প্রত্যাশা করছি, আগামী বাজেটে সরকার টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর আরোপিত কর কমিয়ে আনবে।

দেশে গ্রামীণফোনের ২৮ বছর হলো। দীর্ঘ এ যাত্রায় উল্লেখযোগ্য কী ভূমিকা রেখেছে গ্রামীণফোন?

আজ থেকে ২৮ বছর আগে ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা। দীর্ঘ এ যাত্রায় আমাদের মূল ভূমিকা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষকে সংযুক্ত করা ও সমাজের ক্ষমতায়ন ঘটানো। বর্তমানে আমরা দেশের প্রায় সাড়ে আট কোটি গ্রাহককে মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করছি, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং যোগাযোগ, জীবিকা ও জীবনযাত্রার ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সর্বশেষ প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক মানের সেবা প্রদান করে দেশের ১ নম্বর অপারেটর হিসেবে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছি আমরা। দেশের ৯৫ ভাগের বেশি এলাকা এবং ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ এখন আমাদের নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে।

গ্রামীণফোন দেশের শেয়ারবাজারে অন্যতম নির্ভরযোগ্য একটি নাম, ২০০৯ সালে নিবন্ধিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার লভ্যাংশ প্রদান করেছে। টেলিকম খাতে সর্বোচ্চ করদাতা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে সাফল্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গ্রামীণফোন। আমরা প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করে যাচ্ছি, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছি, মুনাফা নিশ্চিত করে ব্যবসা পরিচালনা করছি এবং শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের তাদের প্রাপ্য প্রদান করছি। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে, আরো বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে ভূমিকা পালন করছে গ্রামীণফোন।

দেশের বৃহত্তম সংযোগ প্রদানকারী কোম্পানি হিসেবে শহর ও গ্রামে ডিজিটাল অ্যাকসেস পৌঁছে দিয়েছে গ্রামীণফোন। ডিজিটাল জীবনধারার প্রসারে এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে ভূমিকা রেখেছে। দেশের ডিজিটালাইজেশন ও মোবাইল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট প্রদান করছি আমরা।

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, জিপি একাডেমি, জিপি এক্সিলারেটর ও বিভিন্ন পার্টনারশিপের মাধ্যমে দেশের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে অবদান রাখছে গ্রামীণফোন। ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কাজ করছি আমরা।

গ্রামীণফোনকে আরো বেশি মানুষের কাছে নিয়ে যেতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা কী?

করের বোঝা কমানো, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে নতুন করে সাজানো এবং রেগুলেটরি বিধিনিষেধকে সহজ করা—এই সবকিছুকে মাথায় রেখে টেলিযোগাযোগ নীতিতে একটি সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি কর্মকাঠামো (পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক), প্রেডিক্টেবল রেগুলেশন এবং স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব রেগুলেটরি পরিবেশ। রেগুলেটর ও অপারেটরদের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতে একটি সহজ, আধুনিক ও সহায়ক রেগুলেটরি পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

এছাড়া বাংলাদেশে টেলিকম খাত দীর্ঘদিন ধরে অযৌক্তিকভাবে উচ্চ হারে করের আওতাভুক্ত, যা গ্রাহক কর ও করপোরেট কর দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এশিয়ার অনুরূপ অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের কর কাঠামো দুই থেকে চার গুণ বেশি। এ অস্বাভাবিক উচ্চ করহার দেশের ডিজিটালাইজেশন ও টেলিকম খাতের সম্ভাব্য উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি এমন একটি পরিবেশে নেয়া হচ্ছে, যেখানে করদাতা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ সবাই কর কাঠামোর বাস্তব ও ইতিবাচক পরিবর্তনের ব্যাপারে আশাবাদী। এ প্রেক্ষাপটে আমরা আশা করছি, বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে হলে সরকারের উচিত টেলিকম খাতে করের চাপ হ্রাস করা এবং সামগ্রিক কর কাঠামোকে আরো সরল, যুক্তিযুক্ত ও আধুনিক করে গড়ে তোলা।

উদ্ভাবন ও সাবলীল অগ্রগতি নিশ্চিত করতে মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের পরিবর্তে প্রয়োজন প্রিন্সিপাল বেজড অ্যাপ্রোচ। সহজ রেগুলেশন প্রক্রিয়া এবং অপারেটরদের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলে অপারেটররা তাদের সর্বোচ্চটা দেয়ার সুযোগ পাবে, যা বাংলাদেশের ডিজিটাল যাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।

এছাড়া বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে। টেলিকম ভ্যালু চেইনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কাটাছেঁড়া করে জটিল করে তোলা হয়েছে, যা বর্তমানে ঠিকমতো কাজ করছে না। এ অবস্থার পরিবর্তন এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দৃষ্টি রেখে অগ্রসর হতে হবে। এতে দিন শেষে গ্রাহকরাই লাভবান হবেন। পাশাপাশি অপারেটররা তাদের পুরো দক্ষতা কাজে লাগাতে এবং গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতের টেলকো-টেক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হতে পারবে।

সরকার আইসিটি খাতের রোডম্যাপ নতুন করে তৈরি করছে। সেখানে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

টেলিযোগাযোগ খাতে মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি সংস্কার নিয়ে কাজ করছে। এ সংস্কার হলো টেলিযোগাযোগ খাতকে কীভাবে আরো দ্রুততার সঙ্গে মানুষের কল্যাণের জন্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। যেখানে মান বাড়বে, দাম সহনশীল হবে এবং বিনিয়োগকারীরা ব্যবসাও করতে পারবে। এ ব্যাপারে কাজ শুরু হয়েছে। আমাদেরও প্রত্যাশা একই রকম।

পাশাপাশি কীভাবে স্মার্টফোনের দাম কমানো যায় এবং ইন্টারনেটকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়া যায় এ বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি ও আমরা কাজ করছি।

স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা দেশে আনার জন্য কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে সরকার, আপনারা এটাকে কীভাবে দেখছেন?

যেকোনো নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানায় গ্রামীণফোন যা মানুষের জীবন, সমাজ, অর্থনীতি ও সর্বোপরি দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। তবে নতুন কোনো লাইসেন্স চালুর ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন বৈষম্য তৈরি না করে, বাজার প্রতিযোগিতা বহাল থাকে এবং সংশ্লিষ্ট বাজার ব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকে।

ইন্টারনেট ও কলসেবা আধুনিকায়নে আগামী বাজেটে আইসিটির কোন জায়গায় সরকার বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে পারে বলে মনে করেন?

আইসিটি খাতের বাজেটটা এমনভাবে সাজাতে হবে যেন দেশে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির সুযোগ প্রসারিত হয়। গ্রাহকের প্রয়োজন ও সন্তুষ্টির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এমন বাজেট হতে হবে যা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ও নতুন প্রযুক্তি চালুর বিষয়টিকে উৎসাহিত করে।