এবারের বাজেটে ফিড ব্যবসায়ীদের চাওয়াগুলো কী?
আমারা ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খাবার, সব ধরনে মাছের খাবার, গরুর খাবার, একদিনের মুরগির বাচ্চা ও মুরগি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। ফিড ব্যবসায়ীরা সব সময় লাভে ব্যবসা করেন তা কিন্তু না। অন্য ব্যবসা থেকে এ খাত একটু আলাদা। এখানে একটা জটিলতা অগ্রিম আয়কর নিয়ে। আমরা যদি লাভ করি তখন আয়কর সরকার নিয়ে যাক, তাতে কোনো আপত্তি নেই। অগ্রিম আয়কর নেয়ার পর সেটি আগে বছর শেষে সমন্বয় করা যেত, তবে এখন যায় না। এছাড়া সব ইন্ডাস্ট্রিতে ভ্যাট ডিডাকশন অ্যাট সোর্স (ভিডিএস) থাকে। ক্রেতারা যখন ক্রয় করেন, তখন তিনি ভ্যাট দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের থেকে যখন কৃষক ফিড কেনেন, তখন কোনো ভ্যাট থাকে না। এখন কোম্পানির ক্ষেত্রে ইনপুট ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। যখন আউটপুট ভ্যাট নেই তখন ইনপুট ভ্যাট সমন্বয় কীভাবে হবে? এটা ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোর খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দিন শেষে সেটি কৃষকের ওপরই যাচ্ছে। এটা ফিড ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালো কোনো বিষয় নয়।
ফিডের বেশির ভাগই আমদানি করতে হয়। দেশেই উৎপাদন করা যাচ্ছে না কেন?
আমাদের দেশে জমি সীমিত। এখানে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কখন কোন ফসল চাষ হবে। এটি অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এখানে কোনো ফসলই অগণিত পরিমাণ উৎপাদন করার সুযোগ নেই। আমরা যে সয়াবিন তেল খাই সেটির জন্য সয়াবিন আমদানি করা হয়। তেল ছাড়ানোর পর বাকি থাকা সয়াবিনের অংশ (খৈল) ফিড ইন্ডাস্ট্রিতে আসে। সয়াবিন তেলের সঙ্গে আসে দুই মিলিয়ন টন খৈল, চাহিদা আছে তিন মিলিয়ন টনের। ফলে এক মিলিয়ন টন আমদানি করতে হয়। দেশের এ পরিমাণ উৎপাদন করার সক্ষমতা নেই। জমি তো সীমিত। কৃষক ধান উৎপাদন করবেন নাকি সয়াবিন উৎপাদন করবেন? ভুট্টা উৎপাদনে আমরা অনেক এগিয়েছি। ৬০ শতাংশ এখানে উৎপাদন করা যায় আর ৪০ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়।
আপনারা সরাসরি কৃষক থেকে না কিনে মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে ফিড তৈরির জন্য বিভিন্ন পণ্য কেনেন কেন?
আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়কে একটি প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা বলেছি ভুট্টা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করব। সেই উদ্যোগটা ব্যাহত হয়েছে। এখানে একটি আইন আছে—ট্যাক্স ডিডেকশন সোর্স (টিডিএস) কাটতে হবে। এখন সেটি করতে হলে কৃষকের ট্যাক্স আইডেন্টিটিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) থাকতে হবে। আমাদের দেশের প্রান্তিক কৃষকের তো সেটি নেই। ফলে আমরা এ প্রক্রিয়ায় আর এগোতে পারিনি। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় করলে কোম্পানি লাভবান হতো, কৃষকও ভালো দাম পেতেন। মধ্যস্বত্বভোগী থাকত না। যেসব এলাকায় ভুট্টা চাষ হয়, সেসব জায়গায় আমরা ক্রয় কেন্দ্র তৈরি করেছিলাম। এখন সেগুলো বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এটা উৎপাদক ও কৃষকের জন্য বাধা।
ফিড ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে সরকারের নীতিগত দিক থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করেন?
সম্প্রতি আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি—বিশেষ করে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের ক্ষেত্রে। বাণিজ্য উপদেষ্টা আমাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছেন। হয়তো খুব শিগগিরই নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার তুলে দেয়া হবে। ফলে আমদানি খরচ আরো কমে যাবে। এছাড়া আমরা দাবি জানিয়েছি, যে ১০ শতাংশ ভিডিএস আছে সেটি প্রত্যাহার করার।
বাংলাদেশ থেকে প্রাণিজ খাদ্য রফতানির সুযোগ কতটুকু?
আমরা যে কয়টি দিক নিয়ে কাজ করি সেখান থেকে রফতানি করার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। তবে খুব শিগগিরই হয়তো মিঠা পানির মাছ রফতানির পরিস্থিতি তৈরি হবে। মাছ রফতানির ক্ষেত্রে চাষের প্রক্রিয়ায় আরো উন্নয়ন করতে হবে, কৃষককে আরো দক্ষ করতে হবে। আমাদের এখানে গড় মাথাপিছু ডিম খাওয়া হয় বছরে ১৩৪টি। আমাদের লক্ষ্য বছরে একজন ব্যক্তির জন্য গড়ে অন্তত ২০০টি ডিম উৎপাদন করা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ফলে এখনই রফতানির খুব একটা সুযোগ নেই।
দেশে এগ্রো ফিডের চাহিদা, বাজারের আকার এবং উৎপাদন সক্ষমতা কেমন?
আমরা বর্তমানে ৭৮ লাখ টন খাবার তৈরি করছি। এটি চাহিদা অনুযায়ী ঠিক আছে। এখানে প্রায় ৫০ লাখ টন মুরগির খাবার, ১২ লাখ টন গরুর খাবার এবং বাকিটা মাছের খাবার। এখন যদি রাতারাতি ডাবল তৈরি করতে হয়, তাও সম্ভব। ইন্ডাস্ট্রির সেই সক্ষমতা আছে। বর্তমানে সক্ষমতার ৬০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। আরো প্রায় ৪০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে। ফলে প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় জোগান দেয়া যাবে। এ খাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি নারী। গার্মেন্টস খাতের পর সবচেয়ে বেশি নারীর কর্মসংস্থান এ খাতে। এর ফলে এ ৬০ লাখ মানুষের পরিবারের পুষ্টি চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। সে যেহেতু ডিম, মুরগি, মাছ উৎপাদন করছে নিশ্চয়ই এখান থেকে পরিবারের চাহিদাও মেটাতে পারছে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ব্যাংক লোন নিয়ে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু দাবি-দাওয়া আছে। সেগুলোর অগ্রগতি কতটুকু, সরকার কী বলছে?
আমাদের সরাসরি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয়নি। আমাদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করতে হয়। ফলে আমাদের পণ্য সরাসরি কৃষি নয়, কৃষির একটি শাখা হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যুতে সাবসিডি দেয়া আছে। সেখানকার ভর্তুকিটা বিদ্যুৎ বিভাগকে সরাসরি কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পরিশোধ করা হয়। কিন্তু আমরা যেহেতু কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নই এবং আমাদের পণ্যের যেহেতু সরাসরি কৃষি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি নেই, তাই আমরা এটি পাই না। অন্যদিকে এখানে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নেই, বীমার ব্যবস্থা নেই। যেকোনো সময় বড় কোনো দুর্যোগে এ খাত ক্ষতির মুখে পড়ে। বন্যায় মাছের ঘের, পুকুর ভেসে যায়, ঝড়ের সময় মুরগির খামার ক্ষতির মধ্যে পড়ে। তখন কৃষকের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা থাকে না, বীমা ব্যবস্থা না থাকার কারণে। আবার পুঁজির জোগানের জন্য স্বল্প সুদে যে ব্যাংক ঋণ নেবে সেই সুযোগও নেই। কারণ এ খাতের ৮০ শতাংশ উৎপাদন কৃষক করেন। বাকি ২০ শতাংশ করপোরেট কোম্পানিগুলো করে। আবার করপোরেট কোম্পানিগুলো ফিড বিক্রি করে কৃষকের কাছে। ফলে কৃষককে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে পুরো সিস্টেমটাই ভেঙে পড়বে। ছোট ফার্মগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনে এ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা দরকার। তাহলে সাপ্লাই চেইনের মধ্যে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দেয়া যাবে।










