ইস্পাত খাত কোন কোন বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে?
ইস্পাত খাতে যে ধরনের সম্প্রসারণ হবে বলে প্রত্যাশা ছিল সেভাবে কিন্তু হচ্ছে না। যেহেতু সরকারের ব্যয় কমানো হয়েছে—অবকাঠামো উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৬০-৭০ শতাংশ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে মূলত সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে। কিন্তু এটা এখন আগের মতো নেই। এখানেই সবচেয়ে বড় একটা চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি নতুন অবকাঠামো তৈরির ওপর জোর দেয় তাহলে ইস্পাতের চাহিদা বাড়তে থাকবে। দেশে মূল্যস্ফীতি আছে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ ইস্পাতসহ সব খাতেই বেড়েছে। বিভিন্ন পরিষেবার খরচ বাড়তে থাকলে তা শিল্পের জন্য অনেক যন্ত্রণাদায়ক। নতুন বিনিয়োগে এটা সরাসরি প্রভাব ফেলে। এছাড়া নতুনভাবে যারা উদ্যোগ নিতে চান তাদের জন্যও অস্বস্তিকর।
স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর কর কাঠামো কি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন?
স্থানীয় শিল্প জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি। এজন্যই এর সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য উপযুক্ত নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। ইস্পাত খাতে আমাদের বেশির ভাগ উপাদানই আমদানি করতে হয়। আমদানি প্রতিস্থাপক কোনো শিল্প কিংবা বিনিয়োগ যদি কেউ করে সেক্ষেত্রে সরকারের একটা নীতি আগে থেকেই করে রাখা উচিত। অর্থাৎ এ আমদানি প্রতিস্থাপক পণ্যের শিল্প যখনই রেডি হয়ে যাবে, সেই পণ্যের আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দিয়ে প্রটেকশান নিশ্চিত করতে হবে। এখন বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে, আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প হওয়ার পর এনবিআরের পেছনে পেছনে দৌড়াতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এমনটা কেন হবে? এমন একটা পলিসি থাকা দরকার যেন আগে থেকেই জানা যায় যে এ রকম একটা স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিলে কী কী সুবিধা নিশ্চিত করা হবে সরকারের পক্ষ হতে। আর এটির ওপর হিসাব কষে বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি হবে এবং সেই নীতিটা যে দীর্ঘমেয়াদি হবে সেটাও আশ্বস্ত করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে নতুন এবং উদীয়মান শিল্পের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে তারা প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।
আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ইস্পাত খাতের জন্য কী ধরনের নীতিসহায়তা প্রত্যাশা করছেন?
আমাদের দেশে করহার এমনিতে অনেক বেশি। নতুন করে যেন ট্যাক্স, আমদানি শুল্ক না বাড়ানো হয়। সরকার প্রেসারে আছে—আমরা সেটাও বুঝি কিন্তু এটাও অনুধাবন করতে হবে যে করহার যৌক্তিক পর্যায়ে থাকলে শিল্প ভালো থাকে। যারা কর দিতে থাকবে তাদেরকে ঘুরেফিরে চাপ না বাড়িয়ে নতুনভাবে নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার বাংলাদেশে এখনো যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। মিনিমাম ইনকাম ট্যাক্সকে আরো বিবেচনায় আনা উচিত। অগ্রিম করের (এআইটি) মতো এমন কোনো পদ্ধতি রাখা উচিত না যেটা ফেরত পেতে আরো কষ্টের মধ্যে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। আসলে রিফান্ডের বাজেট থাকে না। এর ফলে রিফান্ডও আর করা হয় না ব্যবসায়ীদেরকে। এই যে রিফান্ডে উদ্যোক্তাদের এতগুলো টাকা আটকে রয়েছে, এগুলো বাজারে থাকলে তো ইকোনমিতে সক্রিয় থাকত। বাজেটে রিফান্ডের ব্যাপারে একটা ভালো খবর পেতে চাই। ফরেন ইনভেস্টমেন্ট টানতেও তো ট্যাক্সের বিষয়টি অ্যানালাইসিস করবে ইনভেস্টররা। ট্যাক্সের ক্ষেত্র কীভাবে বিস্তার ঘটবে এটার একটা রূপরেখা তৈরি করা উচিত এনবিআরের, যাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আমাদের প্রত্যাশা মূলত একটি শিল্পবান্ধব এবং এমন একটি বাজেট যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করবে।
কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিয়ে বৈশ্বিক চাপ বাড়ছে। সরকার কি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?
বিএসআরএম পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই উৎপাদন পদ্ধতির ওপর জোর দিচ্ছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় বাইরের দেশে কিন্তু প্রণোদনা আছে। কার্বণ নিঃসরণে ভূমিকা রাখলে আমাদের দেশে কর রেয়াত কিংবা অন্য কোনোভাবে উৎসাহ দেয়া হলে এর একটা ভালো প্রভাব দৃশ্যমান হবে। মোটিভেশন হবে। ব্যাংক খাতগুলোর সবুজ অর্থায়নের ব্যাপারেও আরো প্রচারণা হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে যে টেকসই উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।
ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার দামের ওঠানামার পরিস্থিতি এখন কেমন? ইস্পাত খাতের রফতানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার জায়গাটা কেমন?
ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে যেভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করেছে তা প্রশংসনীয়। আমরা চাই এভাবে স্ট্যাবল থাকুক। আর রফতানির ক্ষেত্রে যে সুযোগ আছে, সেক্ষেত্রে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের সঙ্গে সরকারের আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে।
ইস্পাত খাতের উন্নয়নে নীতিনির্ধারকদের কোন বিষয়টি নজরে আনতে চাইবেন?
আমীর আলীহুসাইন: যারা পলিসি মেকার সবসময় চিন্তাটা যেন পজিটিভ রাখেন। নেগেটিভ চিন্তায় পলিসি করলে তাতে শিল্পের জন্য ভালো কিছু হওয়ার সুযোগ থাকে না। ইস্পাতসহ সব খাতের জন্যই নীতিনির্ধারকরা যেন ভাবেন কীভাবে উদ্যোগটা সহজে এগিয়ে নেয়া যায়, সিম্পল করা যায় এবং এটাই প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার একটি দূরদর্শী বাজেট প্রণয়ন করবে যা সব অংশীজনের স্বার্থ রক্ষা করবে।
সাক্ষাৎকার: রাশেদ এইচ চৌধুরী










