চট্টগ্রাম আবাসন খাতের বর্তমান অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
চট্টগ্রামের আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধি এখন আর আগের মতো নেই। বিগত সময়ে চট্টগ্রামে বেশকিছু অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। তবু এ খাতে প্রত্যাশিত গতি নেই। চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে একটি সংকুচিত শহরে রূপ নিচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। নতুন জমির সংকট প্রকট। বিদ্যমান জমিগুলোরও রয়েছে নানামুখী সমস্যা। নতুন করে কোনো সুপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠেনি। ফলে আবাসন খাতেও কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ ঘটছে না। এ শহরের বাজার তুলনামূলকভাবে ছোট। ক্রেতাদের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি—একই ঘরানার ক্রেতারা ঘুরেফিরে রয়েছেন। নতুন মানুষ চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না; বরং অনেকেই ঢাকা বা দেশের বাইরে স্থায়ী হচ্ছে। ফলে যে পরিমাণ গ্রোথ রেট আমরা আশা করেছিলাম, বাস্তবে তা ধরা দিচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট ও ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে?
নির্মাণ ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, যার প্রভাব সরাসরি বিক্রয়মূল্যে পড়েছে। গত বছরের জুনে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল, কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে কাঁচামালের বাজারে আবার অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। অন্যদিকে ডলার সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর কাঁচামাল সংগ্রহেও প্রচুর জটিলতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারও খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমদানিতে সুবিধা পাওয়া গেলেও বর্তমানে সে সুযোগ আর থাকছে না। এ পরিস্থিতিতে প্রজেক্ট কস্টিং ও প্রাইসিংয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের আবাসন খাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য ইউনিট তৈরি ও বাজারজাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
চট্টগ্রামে হাই-এন্ড বা এক্সক্লুসিভ ফ্ল্যাটের চাহিদা সীমিত। মধ্য ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। আগে ৬০-৮০ লাখ টাকায় যেসব ইউনিট পাওয়া যেত, বর্তমানে কাঁচামাল ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধির ফলে একই ধরনের ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকার ঘরে। এ দামের সঙ্গে মধ্যবিত্তদের বাজেটের সামঞ্জস্য থাকছে না। ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে গেছে। ফলে ফ্ল্যাট কেনার প্রবণতাও কমেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে শহরের বাইরে কম মূল্যের ফ্ল্যাট খুঁজছে।
নগরের বাইরের এলাকা বা পেরিফেরি অঞ্চলে আবাসন প্রকল্প সম্প্রসারণে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
গত চার-পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম শহরের সীমানা কোনো দিকেই সম্প্রসারণ হয়নি। অথচ এখন সময় এসেছে শহরকে বড় করে দেখার। সরকারি পর্যায়ে বড় উদ্যোগ নিতে হবে। নাগরিকদের শহরের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে হবে। একই কেন্দ্রে সবকিছু আটকে রাখলে সম্ভব না। চট্টগ্রামে আবাসিক এলাকার পরিধি না বাড়ালে এ খাতের প্রকৃত উন্নয়ন হবে না। ঢাকার কিছু কোম্পানি একসময় চট্টগ্রামে এসে ব্যবসা করত, কিন্তু এখন সেসব প্রতিষ্ঠানও এখান থেকে সরে যাচ্ছে। কেউ কেউ এলেও তারা কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন পাচ্ছে না বলে টিকে থাকতে পারছে না।
সার্বিক বিবেচনায় চট্টগ্রামের আবাসন খাত এখন এক ধরনের দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি এ মুহূর্তে সাহসী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে হয়তো এ খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
রেজিস্ট্রেশন ফি, কর কাঠামো ও অন্যান্য সরকারি চার্জ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন খরচ আমাদের ব্যবসার ওপর নির্ভর করে না, এটা পুরোপুরি সরকার নির্ধারিত। কিন্তু এ খরচ এত বেশি যে অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট কেনায় নিরুৎসাহিত হন। রেজিস্ট্রেশনের মৌজার দাম অনুযায়ী করের পরিমাণ ওঠানামা করে। ফলে আমাদের ট্যাক্স হিসাবেও জটিলতা তৈরি হয়। এ কর কাঠামোয় একটি যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কিছু বড় সিদ্ধান্ত আসবে। আবাসন এখন আর বিলাসিতা নয়, মানুষের মৌলিক চাহিদা। তাই এ খাতে এক অংকের সুদে ঋণের সুযোগ দিলে মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট কেনার মতো সক্ষমতা অর্জন করবে।
২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ফান্ডের মাধ্যমে সিঙ্গেল ডিজিট লোন ব্যবস্থা ছিল, যা এ খাতের জন্য আশীর্বাদ ছিল। এমন একটি উদ্যোগ যদি আবার নেয়া হয় তাহলে রেজিস্ট্রেশন ফিসহ অন্যান্য চার্জ কমিয়ে এনে বাজারকে গতিশীল করা সম্ভব হবে। শহরের বাইরে যারা প্রকল্প করছে, তারা যেন বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আসে এটি জরুরি। কারণ তারা শহরকে বড় করার কাজ করছেন। আবাসন মানেই শুধু ঘর বিক্রি নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মেইনটেন্যান্স, সার্ভিস ও বিভিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট। যারা দীর্ঘমেয়াদে ভালো সেবা দিতে পারে, তারাই টিকে থাকে। গ্রাহকের সন্তুষ্টিই আমাদের আসল বিপণন শক্তি।
আবাসন খাতে সিপিডিএলের কার্যক্রম জানতে চাই।
আমরা সেসব প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি, যেগুলো বসবাসযোগ্য একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে। প্রতিটি প্রকল্পেই আলো-বাতাস চলাচলের যথেষ্ট ব্যবস্থা, উন্মুক্ত খেলার মাঠ, ছাদে সবুজায়ন ও খোলা জায়গা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করছি, যা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ নয়, বরং বাগান বা কমন এরিয়ায় ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব আবাসন সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
আপনি যদি সরকারের কাছে সুপারিশ রাখতে চান, সেগুলো কী হবে?
সরকারের উচিত একটি বিশেষায়িত হাউজিং ফান্ড গঠন করা, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট আয়-পরিসরের মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী সুদের ভিত্তিতে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ পাবে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন খরচ ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। যেন এ খাতে কালো টাকার প্রবেশ না ঘটে। অন্যান্য দেশে যেমন রেজিস্ট্রেশন খরচ ২-৪ শতাংশ, আমাদেরও তেমনি যৌক্তিক সীমায় আনতে হবে। যারা শহরের বাইরের দিকে কাজ করছেন, শহরকে বড় করতে অবদান রাখছেন, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। আবাসন খাতকে শুধু ঘর বানানোর দৃষ্টিতে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সেবা খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমেই আবাসন খাতে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: দেবব্রত রায়










