দেশে বালাইনাশকের বাজার কত বড়? এখানে স্থানীয় উৎপাদন হয় কতটা?
আমাদের দেশে বালাইনাশেকের বাজার প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার প্রতি হেক্টরে তুলনামূলকভাবে কম। আমেরিকা, জাপান ও ফ্রান্সে প্রতি হেক্টর জমিতে ৭-১০ কেজি বালাইনাশক ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি চীনে এটা আরো বেশি—১৩ কেজি। ভারতের তুলনায়ও আমাদের দেশে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতে পারলে এগুলোর মূল্য ৩০-৪০ শতাংশ কম হবে। দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করা যাবে। মান নিয়ন্ত্রণও সহজ হবে। দেশে গত বছর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বালাইনাশক আমদানি করা হয়।
দেশে আমদানি করা জিনিস আবার রি-প্যাকিং করে বিক্রি করা হয়। ফলে গ্রাহক বা কৃষক পর্যায়ে এটার বাজার হবে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার। স্থানীয়ভাবে আমরা ২০ বছর আগে দেশে উৎপাদন শুরু করেছিলাম। ২০ বছরে এখন দেশে মোট চাহিদার ১০ শতাংশ বালাইনাশক উৎপাদন করা হচ্ছে। বেশকিছু অসুবিধার কারণে স্থানীয় উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না।
আমদানি-নির্ভরতা হ্রাসে করণীয় কী?
আমদানি কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে নীতি-সহায়তার প্রদানের জন্য স্বল্প সুদে পাঁচ বছরের জন্য একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। তা করা গেলে এ খাতে অনেক বিনিয়োগ হবে, কৃষকের জন্য যা লাভজনক হবে। সাশ্রয়ী মূল্যে বালাইনাশক পাওয়া যাবে। এজন্য স্থানীয়ভাবে এ শিল্প বিকাশের বাধাগুলো দূর করতে হবে। দেখুন, আমাদের দেশে আমদানির তালিকাভুক্ত কোম্পানি প্রায় ১ হাজার ৩০০। যারা আমদানি করে কোনো মূল্য সংযোজন ছাড়া ট্রেডিং করছে। কিন্তু চীনের মতো বড় দেশে ট্রেডার রয়েছে ১ হাজার ৭০০। আমাদের দেশে এত বেশি ট্রেডার থাকার মানে, এখানে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। অন্যদিকে আমাদের ওষুধ খাতের আমদানি করা কোম্পানি হাতেগোনা কয়েকটি। কিন্তু উৎপাদনকারী ২৮৭টি। বিপরীত চিত্র এগ্রোকেমিক্যাল শিল্পে। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, এখানে কিছু একটা ব্যত্যয় রয়েছে, যেটা সংশোধন করা খুবই জরুরি।
স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কী?
উৎপাদন বাড়াতে হলে উৎপাদনকারীদের মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেমন মূল সমস্যা হচ্ছে কাঁচামাল আমদানি নিয়ে, রেজিস্ট্রেশন নিয়ে; এখান মূল্য যাচাই করে প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ নেই, যা সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতাবিরোধী বিষয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তুষ্ট করতে এমন নীতি করা হয়েছে। এমন পরিবেশে দেশীয় শিল্প বিকাশের কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে মালামাল আমদানি করতে পারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। কিন্তু দেশীয় উৎপাদনকারীরা সস্তা দামে যেকোনো দেশ থেকে আমদানির সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের নানা শর্তের মধ্যে আটকে থাকতে হচ্ছে। এগুলো দ্রুত সমাধান করা উচিত।
দীর্ঘদিন ধরে আপনারা বালাইনাশক নীতিমালা ও নিবন্ধনের কথা বলে আসছেন, অগ্রগতি কতদূর?
এটা নিয়ে ২০১৮ সালে অসম্পূর্ণ আইন পাস হয়েছে। কিন্তু আইনের আলো যে বিধিবিধান প্রণয়নের কথা, তা এখনো হয়নি। যদিও আইন পাসের পর থেকেই সেই আইন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এখনো বিধি প্রণয়নের কাজ চলছে। কিন্তু এটা কবে হবে তা আমরা জানি না।
কাঁচামালের সোর্স বা উৎসদেশ উন্মুক্ত রাখার দাবি করছেন আপনারা, কিন্তু কেন?
সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এটার একটি সাময়িক সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি। কাঁচামালকে আলাদা রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয় না। উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই। বিদেশী ট্রেডারদের থেকে নমুনা নিয়ে স্থানীয় কোম্পানির নিজস্ব ব্যান্ড নামে এ রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে, যা কাঁচামাল আমদানিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ফলে দেশে এখন ট্রেডার সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ এবং উৎপাদনকারী মাত্র ২২ জন।
কৃষির উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বালাইনাশক কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
দেখুন, সার এবং কীটনাশকের পেছনে কৃষকের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশ চলে যায়। এটা কিন্তু অনেক বড় ব্যয়। সারের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা ব্যবহার কমাতে পারি। যাতে উৎপাদন ব্যয় কমবে। আবার উৎপাদন বাড়িয়েও আমরা উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারি।
এবারের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
কৃষি যেহেতু এখনো অর্থনীতির মেরুদণ্ড, এখানে ৪৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। যারা তুলনামূলক দরিদ্র। তাই দারিদ্র্য বিমোচন ও তাদের জীবনমান উন্নয়নে কৃষিভিত্তিক শিল্পের জোয়ার তৈরি করতে হবে। যাতে এখানে সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশী বিনিয়োগ আসে। সেসব বিষয় এ বাজেটে থাকা উচিত। বাজেট মানে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিকল্পনা, বাজেট মানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাজেট মানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বাজেট মানে উন্নয়ন, বাজেট মানে দুর্নীতি রোধ, বাজেট মানে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি।










