চলতি অর্থবছরের বাজেটে ফার্নিচার খাত নিয়ে প্রত্যাশার প্রতিফলন কেমন ছিল?

চলতি অর্থবছরের বাজেটটি মোটামুটি পূর্ববর্তী ধারারই অনুসরণ করেছে। নতুন কোনো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বা প্রণোদনা ফার্নিচার খাতের জন্য দেখা যায়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে আমদানি পর্যায়ে ফার্নিচারের কাঁচামালের ওপর শুল্ক কাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়েছে, যা স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মনে করি, সম্ভাবনাময় খাতটির বিকাশে আরো লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত সহায়তা সময়ের দাবি।

ফার্নিচার খাতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের নীতি সহায়তা আপনারা প্রত্যাশা করেন?

বর্তমানে ফার্নিচার আজ শুধু বিলাসপণ্য নয়, বরং প্রতিটি ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি মৌলিক চাহিদা। এ বাস্তবতায় স্থানীয় উৎপাদন খরচ সহনীয় রাখতে কাঁচামালের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক কমানো জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল যেমন বোর্ড, ফোম কেমিক্যাল, ফ্যাব্রিকস, হার্ডওয়ার ইত্যাদিতে উচ্চ শুল্ক রয়েছে, যা আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদের অভাবও এ শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি ফার্নিচার শিল্পের জন্য বিশেষায়িত স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তোলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ খাতভিত্তিক সাবজেক্ট চালু করে তাহলে আমরা একটি সুসংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও রফতানিমুখী শিল্পে রূপ নিতে পারব।

এছাড়া এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের যে সরকার এবং বর্তমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এরই মধ্যে বন্ড সুবিধা চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছে, যা শতভাগ ব্যাংক গ্যারান্টির ভিত্তিতে প্রদান করা হবে। এটি ফার্নিচার খাতের জন্য একটি ইতিবাচক ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। বাংলাদেশের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে এ সুবিধার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল এবং অবশেষে এটি বাস্তবায়ন হবে বলে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। এছাড়া ব্যাংকিং সেক্টরে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা দরকার।

আগামী বাজেটে ফার্নিচার খাতে আপনাদের দাবিগুলো কী?

আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় ফার্নিচার খাতের প্রকৃতি বিবেচনায় ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। ফার্নিচার একটি উচ্চমূল্যের পণ্য, এটি দৈনন্দিন ব্যবহৃত এফএমসিজি পণ্যের মতো নয়, যেখানে দ্রুত বিক্রি ও উচ্চ ভলিউম থাকে। ফলে এখানকার বিদ্যমান ভ্যাট হার অনেক শিল্পকে কর কাঠামোর বাইরে রেখে দিচ্ছে। যদি ভ্যাট হার যৌক্তিকভাবে কমানো হয়, তাহলে অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠান স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভ্যাট নেটওয়ার্কে আসবে, যা সরকারের রাজস্ব দ্বিগুণ করতে পারে। এখনো ভ্যাট রিবেট গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে, কারণ অধিকাংশ কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যাট সিস্টেমের আওতায় আসে না। ফলে ভ্যাট রিবেট পাওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে, যা ফার্নিচার উৎপাদনকারীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই যৌক্তিকভাবে ভ্যাট হার কমানো এবং অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যৌক্তিক বলে মনে করি।

এছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেসব প্রতিষ্ঠান রফতানিমুখী ফার্নিচার উৎপাদন করছে তাদের জন্য বন্ড সুবিধা চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বর্তমানে এ ধরনের সুযোগ না থাকায় রফতানিমুখী উদ্যোক্তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। তাই সরকারের উচিত অন্যান্য রফতানিমুখী খাতের মতো ফার্নিচার খাতের জন্যও দ্রুত সহজ শর্তে বন্ড সুবিধা চালু করা।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফার্নিচারের অবস্থান কী?

বাংলাদেশের ফার্নিচার ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি পাচ্ছে এবং এরই মধ্যে কিছু গন্তব্যে নিয়মিত রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের ফার্নিচার প্রধানত ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় রফতানি হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আরো বড় আন্তর্জাতিক আমদানিকারকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে, যা রফতানি কার্যক্রম আরো প্রসারিত করবে।

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মান, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে লক্ষ্যেই এখন দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতালির অভিজ্ঞ ডিজাইনার ও প্রযুক্তিনির্ভর ডিজাইন হাউজগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নিচ্ছে। এ আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আমাদের ফার্নিচারকে আরো আধুনিক, স্টাইলিশ এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

দেশীয় ফার্নিচারের বাজার এখন কত হাজার কোটি টাকার? ডলার সংকটে কাঁচামাল আমদানিতে এ খাতে কী প্রভাব পড়েছে?

দেশীয় ফার্নিচারের বাজারের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে আনুমানিক এটি প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বাজার। এ বাজার কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, বিশেষ করে নগরায়ণ, হাউজিং ও করপোরেট সেক্টরের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে।

তবে ফার্নিচার শিল্পের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর যেমন বোর্ড, ফোম কেমিক্যাল, ফ্যাব্রিকস, ল্যাকার, হার্ডওয়্যার ইত্যাদি। দুই বছরে ডলার সংকটের কারণে এ কাঁচামাল আমদানিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এলসি খোলার জটিলতা, মূল্যবৃদ্ধি ও কাঁচামালের অপ্রতুলতা উৎপাদন ব্যাহত করেছে এবং খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ফার্নিচারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দেশে ফার্নিচারের বিভিন্ন ডিজাইন ও অলংকরণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো কি গড়ে উঠেছে? এটির প্রয়োজন কিংবা চাহিদাই বা কতটুকু?

ফার্নিচারের ডিজাইন একটি অত্যন্ত সৃজনশীল ও পছন্দভিত্তিক বিষয়, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে উন্নত মানের ডিজাইন অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে ফার্নিচার খাতের উন্নতির জন্য ডিজাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে ডিজাইনের মান ও স্টাইলের আধুনিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত ফার্নিচার ডিজাইন ইনস্টিটিউট বা ফোকাসড ডিজাইন শিক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ডিজাইন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এমন একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা জরুরি, যা প্রফেশনাল ফার্নিচার ডিজাইনার তৈরিতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কারিকুলামে ফার্নিচার ডিজাইন বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে এ খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি হয়। ডিজাইন শিক্ষা ও গবেষণায় উন্নতি করলে ফার্নিচার শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং দেশীয় ফার্নিচার বিশ্ববাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

ফার্নিচারের বাজারকে আরো সম্প্রসারণ করতে করণীয় কী?

বাংলাদেশে ফার্নিচার শিল্পটি দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠেছে। যদিও কিছু বড় বিনিয়োগকারী আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে কমপ্লায়েন্স সম্পন্ন কারখানা তৈরি করেছেন, কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিকাংশ কারখানা এখনো ফায়ার সেফটি, পরিবেশগত এবং রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এ কমপ্লায়েন্সগুলো পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে সেগুলোর খরচ অনেক বেশি এবং এটি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট শিল্প এলাকা বা স্পেশাল ইকোনমিক জোন নির্ধারণ করে দেয়, যেখানে কেন্দ্রীয়ভাবে ফায়ার সেফটি, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সরকারি সেবা থাকবে, তাহলে উদ্যোক্তারা উৎপাদনে মনোযোগ দিতে পারবে এবং খরচ কমে যাবে। এতে শিল্পটি আরো সংগঠিত ও প্রতিযোগিতামূলক হবে।

এছাড়া ফার্নিচার শিল্পে বিনিয়োগের রিটার্ন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও কম সুদের ব্যাংকিং সুবিধা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এটি হাই-মার্জিন ফাস্ট-মুভিং পণ্য নয়, বরং পরিকল্পনা, সময় ও স্টকভিত্তিক একটি ধীরগতি সম্পন্ন খাত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে দেশে যতগুলো ফার্নিচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। কাজটি বাংলাদেশ ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় করা যেতে পারে। এতে শুধু রাজস্ব আয়ই বাড়বে না, বরং এলোমেলো ও অপরিকল্পিত শিল্প বিকাশ রোধ হবে এবং পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব কমবে।

ফার্নিচার ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?

ফার্নিচার ব্যবসার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং আমদানিনির্ভরতা, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, যার প্রভাব সরবরাহ চেইনে পড়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে দেরি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা এসব বিষয় আমাদের উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া এ শিল্পে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহার হয় যেমন বোর্ড, ফোম, ফ্যাব্রিকস, ল্যাকার, হার্ডওয়্যারসহ বহু ভ্যারাইটি কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে ভালো মানের স্থানীয় সরবরাহকারী নেই। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে কিছু উপকরণ তৈরি করছে। তবে সে পণ্যের দাম অনেক বেশি, মানও স্থির নয়। ফলে অনেক সময় আমরা একই কাঁচামালের জন্য চীনের তুলনায় দ্বিগুণ মূল্য দিচ্ছি, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছি।

এ সমস্যা মোকাবেলায় সরকারকে উৎসাহমূলক নীতি ও সুবিধা দিতে হবে, যেন নতুন উদ্যোক্তারা এ ব্যাকওয়ার্ড ইন্ডাস্ট্রি যেমন বোর্ড, ল্যাকার, ফোম কেমিক্যাল, হার্ডওয়্যার ইত্যাদির উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে পারে। এতে একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে।

টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফার্নিচার উৎপাদনে কী পদক্ষেপ দরকার বলে আপনি মনে করেন?

টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফার্নিচার উৎপাদন নিশ্চিত করতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল এবং শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব প্রযুক্তির গবেষণা এবং উন্নয়নে আরো বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে পরিবেশের ওপর চাপ কমানো যায় এবং খাতটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে।