বাংলাদেশের নির্মাণ খাতের বর্তমান চিত্র কী?

বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় খাত, যা দেশের অবকাঠামোগত অগ্রগতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বর্তমানে এ শিল্প কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেলেও তা ভবিষ্যতের জন্য উন্নয়নের নতুন দিক উন্মোচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশের অস্থিরতা—এসব চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য এক ধরনের সচেতনতা তৈরি করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার পথে অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখলে বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্প আরো আত্মনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই হয়ে উঠতে পারে।

ইস্পাত, সিমেন্ট, পাথর, বিটুমিন, ইট ও জ্বালানির মতো মূল নির্মাণ উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ফলে বহু স্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, মুনাফা সংকোচন এমনকি আর্থিক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নির্মাণ কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের বোঝা, যা স্থানীয় ঠিকাদারদের জন্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই অসম্ভব করে তুলছে। বিদেশী প্রতিষ্ঠান কম সুদে আন্তর্জাতিক ঋণ প্রাপ্তির সুবিধা লাভের কারণে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকছে।

এ বাস্তবতা স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে একপ্রকার হতাশা ও বঞ্চনার বোধ সৃষ্টি করেছে। এমনকি বহু অভিজ্ঞ এবং কারিগরি দক্ষতা-সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানও আর্থিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। দেশের প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম, আব্দুল মোনেম লিমিটেড (এএমএল), ঠিক এ কাঠামোগত সংকটগুলো মোকাবেলায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় ঠিকাদারদের পারফরম্যান্স কেমন?

বিভিন্ন প্রতিকূলতা মধ্যেও বাংলাদেশী ঠিকাদাররা দৃঢ়তা ও সহিষ্ণুতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। তারা রোড, ব্রিজ, মেট্রোরেল, এমনকি পাওয়ার প্লান্টের মতো প্রকল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদেশী ঠিকাদারদের চেয়েও দ্রুততম সময়ে প্রকল্প হস্তান্তরে সক্ষম হয়েছেন।

তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও দরপত্রে অসম প্রতিযোগিতার কারণে অনেক স্থানীয় ঠিকাদার বৃহৎ প্রকল্পে এককভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। ফলে তারা বিদেশী প্রতিষ্ঠান-নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগে ২য় পর্যায়ের পার্টনার হয়ে নিয়োজিত হচ্ছেন। এতে স্থানীয় ঠিকাদারদের লাভ কমে যায় এবং সক্ষমতা বিকাশের সুযোগও সংকুচিত হয়। কারিগরি দক্ষতা ও জনবল সুদৃঢ় হলেও এএমএলের মতো কোম্পানির জন্য বিদেশী দরদাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

বড় প্রকল্পগুলোয় বিদেশী ঠিকাদারদের আধিপত্য কেন?

বাংলাদেশের অধিকাংশ মেগা প্রকল্প এডিবি, জাইকা, বিশ্বব্যাংক এবং এআইআইবির মতো বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের শর্তানুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশী ঠিকাদার নিয়োগ বাধ্যতামূলক থাকে।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, উন্নত প্রযুক্তি, শৃঙ্খলিত প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি নিয়ে আসে। এদের এ প্রাথমিক সুবিধাগুলোর কারণে প্রাক-বাছাই পর্বেই অধিকাংশ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে যায়। এমনকি যখন বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় অংশীদার হিসেবে যুক্ত থাকে, তখনো আর্থিক ও চুক্তিগত নিয়ন্ত্রণে অনগ্রসর থাকায় তাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে এবং দক্ষতা ও লাভ ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও সমতা বজায় থাকে না।

বিদেশী ঠিকাদারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় ঠিকাদারদের জন্য কী ধরনের সরকারি সহায়তা প্রয়োজন?

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে স্থানীয় ঠিকাদারদের সক্ষম ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে, লক্ষ্যভিত্তিক ও সমন্বিত সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংক অথবা উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে স্বল্পসুদে কার্যকর ঋণ ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নিশ্চিত করা যেতে পারে। বৃহৎ প্রকল্পে দরপত্রে অংশগ্রহণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা উচিত। নিবন্ধিত স্থানীয় ঠিকাদারদের জন্য নির্মাণ যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানিতে শুল্ক হ্রাস বা সম্পূর্ণ মওকুফ করা যেতে পারে। মেগা প্রকল্প অথবা স্থানীয় অংশগ্রহণ-অগ্রাধিকারযুক্ত যৌথ উদ্যোগের জন্য কর রেয়াত অথবা ট্যাক্স ইনসেনটিভ চালু করা যেতে পারে। এছাড়া উপকরণ ক্রয়ের জন্য আগাম অর্থপ্রদান, ইন্টারিম পেমেন্ট সার্টিফিকেটের ন্যূনতম সীমা কমানো ও পেমেন্ট সাইকেল সংক্ষিপ্ত করার মাধ্যমে ক্যাশ ফ্লো সচল রাখা উচিত।

প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও গুণমান নিয়ন্ত্রণে প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, বিদেশ সফর, অনসাইট এক্সপোজার এবং দেশী-বিদেশী অংশীদারত্বের মাধ্যমে হ্যান্ডস-অন ট্রেনিং চালু করা যেতে পারে।

এছাড়া বিদেশী ঠিকাদারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ক্রয়নীতিতে সংস্কার প্রয়োজন। বড় প্রকল্পগুলোকে ছোট, পরিচালনাযোগ্য প্যাকেজে ভাগ করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো, টেন্ডার নীতিমালায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত এবং পিপিআর ২০০৮-এর ধারা ৮৩(২), (৩), ও (৪) অনুযায়ী “ডোমেস্টিক প্রাইস প্রেফারেন্স ক্লজ”পুনর্বহাল করা ভালো ফল আনতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের মধ্যে টেকসই যৌথ উদ্যোগ গঠনে সরকারি প্রণোদনা দেয়া উচিত, যাতে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা স্থানান্তর সম্ভব করা হয়।

আসন্ন বাজেটে আমাদের প্রত্যাশা, নির্মাণ যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানিতে শুল্ক ছাড় অথবা ব্যবস্থা পূর্ণ মওকুফ করা হবে। জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প বা যৌথ উদ্যোগে নিয়োজিত স্থানীয় কোম্পানির জন্য কর-প্রণোদনা প্রদান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নির্মাণ খাতে সুদের হার হ্রাসে একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ প্রদান করা হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের অবদান কী?

৭০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে আব্দুল মোনেম লিমিটেড (এএমএল) বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অনিবার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঐতিহাসিক খুলনা–মোংলা সড়ক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালনা সেতু ও ঢাকা মেট্রোরেলে নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্প পর্যন্ত বিস্তৃত। ঢাকা-দাউদকান্দি চার লেন, সাসেক ১ ও ২, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, ঢাকা-রংপুর, খুলনা-মোংলা মহাসড়ক, মধুমতি (কালনা) সেতু, কালশী ফ্লাইওভার, বনানী ফ্লাইওভার, পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ রোড প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে এএমএল। এছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ে ও এজিএল কাজ, সিলেট, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন, কক্সবাজার এয়ারবেস প্রকল্পও এএমএল বাস্তবায়ন করেছে। এগুলো ছাড়াও এএমএলের বাস্তবায়িত প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট, যমুনা ব্রিজ টোল অপারেশন, সেনানিবাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো।

এসব কাজ দেশের অঞ্চলভিত্তিক সংযোগ, বাণিজ্য প্রবাহ এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

এএমএল নির্মাণ খাত ছাড়াও আর কোথায় কাজ করছে?

দেশের প্রথম প্রাইভেট ইকোনমিক জোনগুলোর একটি আব্দুল মোনেম ইকোনমিক জোন। এটি বিএইচএলের মতো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করেছে। এফএমসিজি খাতে এএমএল কোকা-কোলার স্থানীয় অপারেশনের দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া ‘ইগলু’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রধান আইসক্রিম ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদক এএমএল। এছাড়া অটো ব্রিকস, রেডিমিক্স কংক্রিট, বিটুমিন, চিনি পরিশোধন ও ফার্মাসিউটিক্যালের মতো শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনেও এএমএল সক্রিয়।

এ বহুমাত্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে আব্দুল মোনেম লিমিটেড শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।