বিদেশী কসমেটিকস আমদানিতে গত অর্থবছরে সরকার শুল্ক বাড়িয়েছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

যেকোনো বিদেশী কসমেটিকস পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়লে সেটি দেশীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের জন্য ইতিবাচক। এ ধরনের উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই, কিন্তু এর প্রভাব নির্ভর করে ক্যাটাগরির ম্যানুফ্যাকচারারদের এর সক্ষমতা এবং এ শুল্ক বাস্তবায়নের ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা কারসাজির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয় এবং স্বল্পমূল্যে পণ্য বাজারজাত করে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারায়, ঠিক তেমনই আমদানি পর্যায়ে শুল্ক বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। আমাদের অনুরোধ থাকবে এবং সরকার এ ব্যাপারে দৃষ্টি দেবে, যেন লোকাল ম্যানুফ্যাকচারাররা উৎসাহিত হয় এবং জনগণ সুলভমূল্যে সঠিক পণ্যটি পায়।

বিদেশী কসমেটিকসের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করায় দেশে উৎপাদন কি সহজ হলো?

যদি এ শুল্ক বাস্তবায়ন করা হয় এবং কারসাজির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয়া থামানো যায়, তাহলে দেশীয় কোম্পানির জন্য উৎপাদন আরো সহজ হবে।

বাংলাদেশে কসমেটিকসের বাজার কত বড়? দেশে কত শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে?

বর্তমানে বাংলাদেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের বাজারের মূল্য আনুমানিক ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট মার্কেটের প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের বাজারের প্রায় ৭০% দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে, যার মধ্যে বাংলাদেশী মালিকানাধীন ব্র্যান্ডগুলোর শেয়ার গত কয়েক বছরে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।

এবারের বাজেটে এ খাতের উন্নয়নে কী ধরনের নীতি সহায়তা চান আপনারা?

বাংলাদেশের ৯৯% মানুষ প্রতিনিয়ত সাবান ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে, সাধারণ মানুষের একমাত্র প্রসাধনী সাবান। একটি সাবানের মূল উপাদান হচ্ছে নুডলস এবং সাবান উৎপাদনের সিংহভাগ খরচ হয় নুডলসে। কিন্তু নুডলস আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে ২৫% কাস্টমস ডিউটি আরোপ করা আছে, যেটি কমালে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ সাবান সুলভে ব্যবহার করতে পারবে। তাই আমরা সুপারিশ করি, নুডলসের ওপর থেকে আমদানি পর্যায় কাস্টম ডিউটি কমিয়ে ৫% এর ঘরে নিয়ে আসা।

দেশীয় বেশকিছু উৎপাদনকারীরা এরোসল জাতীয় পণ্য (যেমন বডি স্প্রে, এয়ার ফ্রেশনার, সেভিং ফোম) ইত্যাদি পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন শিল্প কারখানায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। তাতে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু বিদেশী সমজাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির সময় শুল্ক ফাঁকি ও নানা কারসাজির কারণে এগুলোর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, যার ফলে বাজারে নকল ও নিম্নমানের পণ্যের প্রবেশ সহজ হয়। অন্যদিকে দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ১৫% সম্পূরক শুল্কসহ অন্যান্য কর আরোপিত হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় ও অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষাপটে দেশে উৎপাদিত এরোসল জাতীয় পণ্যের (যেমন বডি স্প্রে, এয়ার ফ্রেশনার, সেভিং ফোম) উৎপাদন পর্যায় বিদ্যমান ১৫% সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য আমাদের প্রস্তাবনা থাকল।

দেশে কিছু মানহীন কসমেটিকস উৎপাদন হয়। বিভিন্ন বড় ব্র্যান্ডের নামে নকল পণ্যও উৎপাদন হয়। এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম এ খাতের জন্য কতটা ক্ষতিকর? এটি বন্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ আপনারা চান?

নকল ও মানহীন কসমেটিকস এ শিল্পের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে একদিকে ভোক্তার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে আস্থা হারায় আসল ব্র্যান্ডগুলো, যারা আন্তর্জাতিক মান মেনে পণ্য তৈরি করে, ব্র্যান্ড বিল্ডিংয়ের জন্য বিনিয়োগ করে এবং দেশের সব রেগুলেটরি গাইডলাইন মেনে চলে। সবচেয়ে বড় কথা, এসব কার্যক্রম দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগের আগ্রহকে নিরুৎসাহিত করে।

আমরা চাই সরকার এ বিষয়ে আরো জোরালো নজরদারি, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং দ্রুত বিচার কার্যক্রম চালু করুক। পাশাপাশি ব্র্যান্ড রেজিস্ট্রেশন, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইটের সঠিক বাস্তবায়ন করে ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করে। তাতে ভোক্তারা যেমন নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারবেন দেশীয় মানসম্পন্ন পণ্য, তেমন দেশীয় উৎপাদনকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।

কসমেটিকস পণ্যের মোড়কের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই প্লাস্টিকের। এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়া এর রিসাইকেলিং বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ কতটা জরুরি এবং সেটির জন্য ব্যাবসায়ীরা কতটা উদ্যোগী?

সব সময়ই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কসমেটিকস পণ্যের মোড়ক হিসেবে বেশকিছু ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ব্যবহার হলেও আমরা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করি যেন প্রত্যেকটি প্যাকেজিং রিসাইকেল করা যায়।

মেরিল স্কয়ার টয়লেট্রিজের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড এবং এর ৯০ শতাংশেরও বেশি প্যাকেজিং রিসাইকেল করা যায়। খুব দ্রুত আমরা শতভাগ রিসাইকেলেবল প্যাকেজিং নিশ্চিতকরণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, রিসাইকেলযোগ্য এবং বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়ানো উচিত। এরই মধ্যেই আমরা পরিবেশবান্ধব পেপার প্যাক, জুট ব্যাগ এবং বায়ো ডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং ব্যবহার শুরু করেছি এবং বাংলাদেশের একমাত্র বায়ো ডিগ্রেডেবল স্যানিটারি ন্যাপকিন সেনোরা বায়ো বাজারজাতকরণ করেছি।

সর্বোপরি দেশের কসমেটিকসের চাহিদা মেটাতে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের কাছে কী ধরনের নীতি সহায়তা চান?

  • নকল ও অনিয়ন্ত্রিত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ
  • নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলোকে সহজীকরণ ও সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজ করা
  • দেশীয় উৎপাদকদের নতুন ক্যাটাগরিতে প্রবেশে উৎসাহ প্রদান এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ স্থাপনে সহায়তা করা
  • স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা
  • প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে শুল্কহার হ্রাস করা।