বাংলাদেশে বর্তমানে গাড়ির বাজারের আকার কেমন?

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাইভেট গাড়ি বা ছোট গাড়ির বাজারের আকার ৩০-৩৫ হাজার। এখানে নতুন ও পুরনো গাড়ি রয়েছে। আগে নতুন গাড়ির পরিমাণ কম ছিল। এখন নতুন গাড়ির পরিমাণ বেড়েছে। অন্যদিকে রিকন্ডিশন্ড বা পুরনো গাড়ির চাহিদা কমছে। এছাড়া বর্তমান বাজারে আমরা কিছুটা প্রাপ্তির সংকটেও ভুগছি। ৩০-৪৫ হাজার গাড়ির মধ্যে অনেকে এখানে অ্যাসেম্বল করতে চায়, অনেকে এখানে ম্যানুফ্যাকচারিং করতে চায়। বর্তমান বাজারে গাড়ির দাম অনেক বেড়ে গিয়েছে। কারণ দুটি—ডলারের মান বৃদ্ধি; অন্যদিকে ডিউটিও বেড়েছে। এভাবে টাকার অংকে গাড়ির দামও অনেক বেড়েছে। যেটা অনেক ক্ষেত্রে সহনীয় না। পাঁচ বছর আগে যে গাড়ির দাম ছিল ২০-২২ লাখ টাকা, এটি এখন ৩২ লাখের ওপরে চলে গিয়েছে। সরকার চাইছে যাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে। এটি করতে হলে গাড়ির বাজার বাড়ানো দরকার। গাড়ির বাজার বাড়াতে আমাদের কিছু কৌশল থাকা উচিত। এজন্য আমাদের কিছু পলিসি সাপোর্ট দরকার। বাংলাদেশে গাড়ি একটু সস্তা করতে পারলে ভোক্তার সংখ্যা বাড়বে। আমাদের দেশে শুল্ক কর অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে তা ৮০০-৯০০ শতাংশও আছে।

৬০ বছর আগে থাইল্যান্ডের অর্থনীতি আমাদের মতো ছিল। এখন থাইল্যান্ড গাড়ি উৎপাদন করছে। সেখানে শুল্ক অনেক কম। সর্বোচ্চ শুল্ক ২০০ শতাংশ। ভারতেও ডিউটি অনেক কম। আমার মনে হয়, বিষয়টি আমাদেরও আমলে নেয়া জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ‘থ্রি জিরো’র কথা বলেছেন—জিরো ইমিশন, জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট, জিরো পভার্টি। এটিকে অনুসরণ করতে হলে আমাদের দেশকে হাইব্রিড গাড়ির দিকে এগোতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমান অন্যান্য দেশের মতো হাইব্রিড গাড়ির দিকে এগোচ্ছে। সরকার কিছু ইনসেনটিভ দিয়েছে। সরকার থেকে আরো কিছু সাহায্য করা হলে মানুষও হাইব্রিডের দিকে এগোবে। ফুয়েল আমদানি কমে যাবে। ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার কমে যাবে। আমাদের পরিকল্পিতভাবে ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে এগোতে হবে। তবে এখানে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

আমাদের ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে। আমাদের পাশে দুটি শক্তিশালী দেশ আছে—ভারত ও চীন। তারা কিন্তু আমাদের তৈরি পণ্য কিনবে না। তাই আমরা কীভাবে বাজারকে আমাদের সুবিধামতো ব্যবহার করব সেই ট্যালেন্ট আমাদের থাকতে হবে।

পার্টস উৎপাদন দিয়ে শুরু করা হোক এবং কোন মডেলের গাড়ি কতগুলো আছে সেটি বুঝে লাইসেন্স দেয়া হোক। এছাড়া ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে করে দিলে গাড়ি ব্যবহারকারী আগামী ১০ বছরে অনেক বেড়ে যাবে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে এর মান ও দাম নিয়ে সরকারের কাছে কোন কোন নীতিসহায়তা প্রত্যাশা করেন?

ট্যাক্স কমিয়ে দিলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দামও কমে যাবে। বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে যে ধরনের অবকাঠামো দরকার বা সাপ্লাই চেইন দরকার সেটি তো নেই। আমি সরকারকে বলব এ খাতে অনেক গবেষণার বিষয় আছে। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশে ব্যাংক, এনবিআর সবাই একসঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে।

আসন্ন বাজেটে সরকারের কাছ থেকে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

এবারের বাজেট আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এ সরকারের সুযোগ আছে কাউকে ‘ফেভার’ না করার। কিছু সংস্কার তারা প্রত্যেক মন্ত্রণালয় থেকে করতে পারে। যেমন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের ফি অনেক বেশি, এটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়। সরকারকে আমরা পরামর্শ দেব, সরকার যেন হাইব্রিড গাড়ি টার্গেট করে। আমরা অনেক কিছু তৈরি করতে সক্ষম, কিন্তু আমাদের ওপর কেউ ভরসা করছে না। আমরা বহু লড়াই করে এ গাড়ি ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছি।

বাংলাদেশে গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি বলে কেউ কেউ মনে করেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

এটি একদমই ভুল ধারণা। আমাদের এখানে প্রাইভেট কারের সংখ্যা কম। পাকিস্তানে এর চেয়ে বেশি। দেশের মানুষকে বেটার লাইফ দিতে হবে। এখানে থাকা যে আরামদায়ক ও নিরাপদ, সে বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং বাসের ডিউটি কমিয়ে দেয়া হোক। গাড়ি উৎপাদন করার ক্ষেত্রে প্রণোদনা বাড়িয়ে দেয়া হোক। হাইওয়েতে অটো চলা নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। সেনাবাহিনীকেও এ খাতে কাজে লাগানো যায়।

দেশে গাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী?

আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো এখানে একটি অটোমোবাইল পলিসি থাকা দরকার ছিল, যা নেই। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু গাড়ি এসে পুরো বাজার সয়লাব করে ফেলেছে। যেমন অটো। আমি এর বিরুদ্ধে না। এটিকে টেকনোলজির মাধ্যমে আরো উন্নত করা যেত। আমাদের আসলে একটি গোছানো পলিসির অভাব, যে পলিসিতে ইন্ডাস্ট্রিগুলো গ্রো করবে। আমাদের কোনো ডেডিকেটেড এজেন্সি নেই। বিআরটিএ হলো রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি। তাদের মূল কাজই হলো রেজিস্ট্রেশন করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ দেয়া। আরেকটি আছে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি। তাদের কাজও সুনির্দিষ্ট নয়। কিন্তু দরকার হলো রাস্তায় সেফটি তৈরি করা, অটোমোবাইল কীভাবে তৈরি করা হয় সে বিষয়ে জোর দেয়া। কিন্তু এসব কিছু এখানে নেই। এমআরটিবিতেও কোনো এক্সপার্ট নেই। এসব জিনিস সংস্কার করা জরুরি। এতে সরকারের ব্যয় একদিকে যেমন কমবে, ইন্ডাস্ট্রিও উন্নত হবে। দেশের প্রতি মানুষের যেমন অনীহা তৈরি হয়েছে সেটিও কেটে যাবে। বেটার লিভের জন্য ট্রান্সপোর্টের জায়গায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রাধান্য দিতে হবে। মেট্রো আরো সাশ্রয়ী করা যেতে পারে। যেখানে বাস তৈরি হয়, সেখানে কোচও তৈরি করা যেতে পারে।