প্রক্রিয়াজাত মাংস খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটুকু? এ খাতের বাজারের আকার এখন কত?
প্রক্রিয়াজত মাংস বলতে আধুনিক সার্টিফায়েড একটি পদ্ধতিকে বোঝানো হয়, যেখানে মাংসের অণুজীব কমিয়ে মাংসকে নিরাপদ করা হয়। মাংসে সাধারণত ৭০ শতাংশ পানি থাকে। এছাড়া এটাতে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে, যা জবাই করার পর বের হয়ে যায়। কিন্তু প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ধরে রাখা হয়। এটা উঠতি তরুণ ও কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। এ খাতকে এভাবে পদ্ধতিগতভাবে কিন্তু দেখা হয় না। এটার বাজার কতটা তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা ছয় হাজার টন উৎপাদন করে থাকি। পশু জবাই থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত যেতে প্রতিটি ধাপে মাংস শূন্য থেকে ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটা সেভাবে মেইনটেইন করা হয় না।
এ খাতের উন্নয়নে সরকারের কাছে নীতি সহায়তা বা বাজেটে প্রত্যাশা কী?
আমরা রফতানিকে মাথায় রেখে ১৫ বছর আগে এটা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন দেশীয় বাজারকে কেন্দ্র করেই আমরা কাজ করছি। আমাদের বাজার সংগঠিত না। সবসময় বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিকভাবে এ খাত থেকে লাভজনক হওয়া কিছুটা কঠিন। তাই আমাদের পরে তেমন বড় কোনো প্রতিষ্ঠান এখানে যুক্ত হয়নি। তাই সরকারের কাজ হবে আমরা যেন ভালো করতে পারি, সেজন্য নীতি সহায়তা দেয়া। যাতে অন্যরাও এ খাতে এগিয়ে আসতে পারে। যেমন ওষুধ কিংবা আইসক্রিম খাতের জন্য কোল্ড চেইন যন্ত্রপাতি আনতে আলাদা এইচএস কোড দিয়ে সুবিধা দেয়া হয়। কোল্ড চেইন আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলেও আমরা সেভাবে সুবিধা পাই না। এটার জন্য আলাদা এইচএস কোড দিয়ে দ্রুত এ সমস্যার সামাধান করা উচিত। দেশের সব মার্কেটের খুচরা মাংস বিক্রেতারাও যেন ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মাংস রেখে বিক্রি করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা উচিত। এজন্য শুল্ক কমিয়ে সুবিধা দেয়া উচিত।
চলতি অর্থবছরে বাজেটে এ খাত উপেক্ষিত রয়েছে। এবারের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশাগুলো কী?
খামারকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করা হলেও এটা কৃষির অংশ। যে কৃষক চাষাবাদ করেন তারাই বাড়িতে গবাদিপশুও পালন করে থাকেন। আমলাতান্ত্রিকভাবে পশুর জন্য হয়তো আলাদা মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। কিন্তু কৃষির জন্য যেসব প্রণোদনা রয়েছে আমাদের জন্যও একই প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। আমাদের করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমানো উচিত। আমাদেরও কৃষির মতো করছাড় দিতে হবে। এতো বেশি কর দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। অর্থায়নের জন্যও সহজ শর্তে কৃষির মতো ঋণের সুবিধা দেয়া উচিত।
দেশে মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে? সেটি নিরসনে করণীয় কী?
কোটি মানুষের শহরে অনেক বেশি পশু জবাই হওয়ার ফলে অনেক ধরনের হেলথ রিস্ক থাকে। জবাই করা পশুর বর্জ্য ড্রেনে ফেললে সেখানে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঢাকা শহরে দেখা যাচ্ছে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুসহ একটার পর একটা জীবানু আসছে। শহরের কেন্দ্রগুলোয় অন্তত আমাদের বৈশ্বিক মান অনুসরণ করতে হবে, ব্যক্তিগত খাতের মাধ্যমে জবাইখানা করতে হবে। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে এসব কাজে আসে না।
মানসম্পন্ন মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে কীভাবে বাংলাদেশ নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে?
এখানে সরকারের করণীয় আছে। ভারত রফতানিতে ভালো করলেও কেন আমরা পারলাম না। এটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলাপ করছি। এটার কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে কমপ্লায়েন্ট হওয়া। তাই আমরা বলেছিলাম অন্তত মাংস প্রক্রিয়াকরণ এলাকাটুকু কমপ্লায়েন্সে নিয়ে আসা, অর্থাৎ ডিজিজ ফ্রি জোন হিসেবে তৈরি করা। এটার কথা সরকার বলে, প্রকল্প নেয়, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারে না। অন্যদিকে ভারত ঠিকই এটা করেছে। তাই তারা মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল রফতানি করলেও আমরা তা পারিনি। এখানে আমাদের গতি নেই। সংকল্পের অভাব রয়েছে।
মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের কী করণীয় আছে?
আমরা অনেক বিনিয়োগ করে অল্প লাভ পাচ্ছি। এটা সমাজের প্রতি আমাদের কন্ট্রিবিউশন। উদাহরণ তৈরি করে যাচ্ছি। তবে এটা কতদিন করতে পারব তা বলতে পারছি না। যত দ্রুত অন্যরা এ খাতে এগিয়ে এসে সহায়তা করতে পারবে তত ভালো হবে। মানুষ সচেতন হয়ে উচ্চ প্রোটিনের মাংস খাওয়ার প্রতি আগ্রহী হলে প্রক্রিয়াজাত মাংসের চাহিদা আরো বাড়বে। এখন চেইন হোটেলগুলোয় আমরা মাংস সরবরাহ করে থাকি। এটা আগে আমদানি করে নিয়ে আসা হতো। স্থানীয়ভাবে এটার বাজার যত বড় হবে তত বেশি কর্মসংস্থান বাড়বে।
মাংসের দাম কমাতে কী করা যায়?
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি কমাতে পারলে হয়তো দাম কিছুটা কমানো যেতে পারে। কিন্তু আরো ভালো করা যাবে যদি গোখাদ্য সাশ্রয়ী করা যায়। আমদানিনির্ভর দানাদার খাবার না দিয়ে উচ্চফলনশীল ঘাস উৎপাদন করা যায়। এখানে সরকার গবেষণায় নজর দিতে পারে, যাতে উচ্চ প্রোটিনের ঘাস দেশে উৎপাদন করা যায়। বীজের মানও উন্নত করতে হবে। কিছুটা সংকরায়ণও প্রয়োজন হবে। আরো বেশি মাংস হয় এমন গরু নিয়ে আসতে হবে।










