রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসার কাজে ক্ষেত্রগুলোতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখছেন কিনা?
সবকিছু যে একেবারে পাল্টে গেছে বা আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে, সেটা তো বলা যাবে না। তবে কিছু কিছু জায়গায় গতিশীলতা এসেছে ও উন্নতি হয়েছে। যেমন অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটরের স্বীকৃতি। দ্বিতীয়ত, দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের কাজটা অনেক কঠিন হলেও তারা সবার কথা শুনছে। ব্যাংকের সমস্যা এখনো সমাধান না হলেও মানুষের আস্থা ফিরে আসছে। আবার রেমিট্যান্সও বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি হলেও ধীরে ধীরে কমে আসছে। সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি দেখছি আমরা।
বাজটের বিষয়েও এনবিআরের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা হয়েছে। আমাদের দেশে পরোক্ষ কর অনেক বেশি। পরোক্ষ কর কমানোর বিষয়ে এনবিআরের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা চেষ্টাও করছে। একক মূসক হারে আসতে হবে। কাস্টমসকে কীভাবে কাজ সহজ ও দ্রুত করা যায়, সেগুলো নিয়েও আমরা আলোচনা করেছি। আরেকটা হচ্ছে ডিজিটালাইজেশন। কত দ্রুত আমরা করতে পারি। এ বিষয়েও আমরা কথা বলেছি। আমাদের আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী বাজেটে এসব কিছুর প্রতিফলন দেখব।
বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় সম্পর্কে বলুন, বিশেষ করে আসন্ন বাজেটে কিছু করণীয় আছে?
বিদেশী বিনিয়োগ আমাদের এখানে লম্বা সময়ের চ্যালেঞ্জ। বহুদিন ধরেই আমরা মোটাদাগে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছি না। এজন্য অনেক কিছু প্রয়োজন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা যে, আমাদের নীতি লম্বা সময় ধরে একই থাকবে। আজ একটা কথা বলে আগামীকাল আরেকটা পলিসি তৈরি করার আমাদের যথেষ্ট দুর্নাম আছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরে কর কাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা মাঝপথে অনেক নীতি পরিবর্তন হতে দেখেছি।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে, কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কিন্তু সারপ্রাইজড হতে চায় না। হঠাৎ কর বাড়িয়ে দেয়া হলে সব ব্যবসায়ীই ক্ষতির মুখে পড়েন। আমি আশা করি এ বিষয়গুলো যথেষ্ট উন্নত হবে এবং তা প্রয়োজনীয়। আমরা যত বেশি স্বচ্ছতা নিয়ে আসব, ততই আস্থা বাড়বে।
আমাদের অর্ধ ট্রিলিয়নের একটা অর্থনীতি, প্রায় ২০০ মিলিয়ন লোক আছে। এখানে কর্মক্ষম শ্রমিক আছে। তাহলে বিনিয়োগ না আসার তো কারণ নেই। কিন্তু আমাদের কতগুলো বিপত্তির কারণে বিনিয়োগ আসছে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিষয়গুলোকে কীভাবে আরো সহজ করা যায়। সরকার চেষ্টা করছে। কিহাক সাংকে স্বীকৃতি দেয়া বড় উদাহরণ। দেরিতে হলেও তা হয়েছে। এ গল্পগুলোকে আমরা যতবেশি ছড়িয়ে দিতে পারব, ততই আমাদের বিনিয়োগ আসবে।
সম্প্রতি বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনের কার্যকারিত সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
একটা বিনিয়োগ সম্মেলন তো সবকিছু পাল্টে দিতে পারে না। আমার ধারণা, এটা সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটা পদক্ষেপ। সম্মেলনে আমরা স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যথেষ্ট আগ্রহ দেখেছি। এখন যেটা করা দরকার, তা হলো এ আগ্রহটাকে পরিচর্যা করা। প্রধান উপদেষ্টা যেভাবে বলেন যে, বাংলাদেশ এখন ব্যবসার জন্য প্রস্তুত। এ বিষয়টা খুব সফলতার সঙ্গে করা হয়েছে। এখন পরিবেশটাকে সেভাবে তৈরি করতে হবে।
রাজনৈতিক সরকার ছাড়া বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর পুরোপুরি আস্থা ফিরে পাবে কি?
এ চিন্তা তো সবারই থাকবে। কিন্তু মূলকথা হলো বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, আমাদের কিন্তু বিনিয়োগ ছাড়া চলবে না। এ বিষয়টা সবাইকে বোঝাতে হবে। আমাদের টাকা আসবে রফতানি কিংবা রেমিট্যান্স থেকে। আমাদের এ বিষয়গুলোর বৈচিত্র্যায়ণ করতে হবে। আরেকটা বিষয় যেটা দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের এখানে আর অনুদান আসবে না। সেটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু পরবর্তী স্তরে যাওয়ার জন্য আমাদের বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। যেসব দেশ মধ্যম আয়ের স্তর থেকে বেরিয়েছে, সেখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও উদ্যোগ। রাজনৈতিকভাবে যে-ই আসুক, তাদেরও সেই আস্থাটা দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগের মাধ্যমেই আমাদের দেশের প্রবৃদ্ধি আসবে।
আসন্ন বাজেটে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
শিল্পের জন্য আমরা কার্যকর করহারের কথা বলে আসছি। আমরা হয়তো করহার কমাচ্ছি, কিন্তু অনেক কিছু ‘ডিজঅ্যালাউন্স’ (অনুমোদন বাতিল) হয়ে যায়। আমি আশা করছি এ ব্যাপারে একটা নির্দেশনা আসবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, আমরা কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত তৈরি পণ্যের মতো কর নির্ধারণ করে রাখি। এগুলো ঠিকঠাক করা জরুরি।
রাজস্ব আহরণে দক্ষতার ঘাটতি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
দুটো বিষয়। একটা হচ্ছে জানার সীমাবদ্ধতা। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সবারই কর আহরণের একটা টার্গেট থাকে। তখন দেখা যায় যে, এইচএস কোড এমনভাবে বসানো হয় যাতে বেশি কর আসে। এগুলোর মাধ্যমে আমরা ইনএফিসিয়েন্সি তৈরি করছি। দিনশেষে আমাদের রাজস্বও আনতে হবে আবার পরিবেশকে ব্যবসাবান্ধবও করতে হবে। কর ফাঁকি দেয়ার বিভিন্ন ফাঁকফোকর আছে। সেগুলো নিয়ে কাজ করলেও আমাদের করের আওতা বাড়বে।
নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এ দুটি বিষয় বিবেচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তনের দাবি বহুদিনের। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে আপনার মতামত কী?
এটা তো বহুদিনের দাবি। আইএমএফ ও চেম্বারগুলোরও এ সুপারিশ ছিল। আগেও দেখেছি যে, এ জিনিসটার অপব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যেটা হবে যে, নীতি ও বাস্তবায়ন যার যার নিজের স্থানে থাকবে। এটা খুবই ভালো একটা সমাধান। আশা করি ভবিষ্যতে এটার পরিবর্তন হবে না।
বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে উপযুক্ত মানবসম্পদের ঘাটতিও একটা বড় বাধা। এক্ষেত্রে বাজেটে করণীয় কিছু আছে?
দক্ষতা উন্নয়ন আমাদের বড় সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় সে পরিমাণ দক্ষ মানবসম্পদ আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি। দক্ষতা উন্নয়নকে বিনিয়োগের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই আমাদের বাজেটে বড় একটা সুযোগ আছে সেখানে বিনিয়োগ নিয়ে আসা ও উন্নয়ন করার। কিছু হয়তো এসেছে। কিন্তু আমাদের আরো বড় আকারে বিনিয়োগ দরকার।
বাজেটকে কেন্দ্র করে আর কোনো প্রত্যাশা রয়েছে যেটা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলতে চান?
আমার মতে এনবিআরের ডিজিটাইলাইজেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরো জিনিসটা একসঙ্গে না হলেও একটা অংশ যদি আমরা ডিজিটাইলাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসতে পারি, সেটা একটা বড় পরিবর্তন হবে। এ সরকারের জন্য এটা করাটাও অনেক সহজ হবে। অন্তত মূসকটাকেও যদি আমরা ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসতে পারি, এর মাধ্যমেও আমাদের অনেক বড় একটা কাজ হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের করণীয় প্রসঙ্গে কোনো পরামর্শ?
নতুন ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে কোথায় উচ্চ ট্যারিফ বসছে, আমাদের সেগুলো দেখতে হবে। যখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশে চলে যাব, তখন ওই উচ্চ ট্যারিফে ব্যবসা করতে পারব না। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঠিক বা বেঠিকভাব খেলা খুবই কঠিন। কাল কী হবে, আজ তা জানি না। সেজন্য আমাদের প্রত্যেকটা দেশকে আলাদা করে ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা চিন্তা করতে হবে। বৈশ্বিক বিভিন্ন রীতিনীতি তো এখন আর আগের মতো থাকছে না। সেজন্য আমাদের দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এবং যত দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।










