দেশের ওষুধ শিল্পের আকার কত? উৎপাদিত ওষুধে চাহিদার কতটা পূরণ হচ্ছে?
বাংলাদেশে বর্তমানে ওষুধ কোম্পানির বাজারের আকার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া লোকাল কিছু মার্কেট আছে, সেগুলো যোগ করলে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার মার্কেট হবে। দাপ্তরিক তথ্য অনুয়ায়ী, দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশই লোকাল প্রতিষ্ঠানগুলো পূরণ করে আসছে। কিছু কিছু ক্যান্সারের ওষুধ এবং লাইভ সেভিং ওষুধ দেশের বাইরে থেকে আমদানি করার প্রয়োজন হয়।
আসন্ন জাতীয় বাজেটে ওষুধ শিল্পের জন্য কী ধরনের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করছেন?
দেশে ওষুধ শিল্প গড়ে উঠেছে সরকারের পলিসি সাপোর্টে। যেমন ৮২ ড্রাগ অ্যাক্ট। এটি দেশের ফার্মা সেক্টরে প্রথম ব্রেক থ্রো। জেনেরিক মেডিসিন তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের পরেই আমরা আছি। আমরা মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকার মতো দেশে ওষুধ রফতানি করে আসছি। বাংলাদেশ হলো এলডিসির লিডার। কারণ আমরা বানাতে পারি। এটির পেছনে ৮২ ড্রাগ অ্যাক্টের ভূমিকা রয়েছে। আরেকটি হলো ১৯৯৩-৯৪-এর প্রাইসিং পলিসি আইন। সরকার যে ধরনের সহযোগিতা করছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে এবং তাদের শিল্পবান্ধব হতে হবে। আমাদের এ খাত কিছু কারণে এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা হলো ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ইউটিলিটি বিল বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ শ্রমিক অসন্তোষ—তাদের ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি। যেটার প্রভাব আমার প্রতিষ্ঠানের আয়েও পড়েছে। এ জায়গাগুলোয় সরকারের একটি পলিসি সাপোর্ট লাগবে। বাইরে থেকে কোম্পানির কিছু আমদানি করতে অনেক নিয়ম মানা লাগে, যা আমাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। সেগুলো নমনীয় করা জরুরি। যেমন নার্কোটিক পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া লাগে। আমরা এজন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চাই। যাতে এক ডেস্ক থেকে সব কাজ হয়ে যায়। সরকারের এ নিয়মগুলো সহজ করে দেয়া হোক বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হোক। এছাড়া পলিসির কন্টিনিউশন থাকা দরকার। দেশের ওষুধ খাত পুরোটাই বেসরকারি। সুযোগ-সুবিধা থাকলে উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে।
আগামী ২০৩৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের সুবিধা পাবে না। এতে ওষুধ শিল্পের ওপর কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং উত্তরণের উপায় হিসেবে এখনই বাজেটে কী থাকা উচিত?
ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যেই আমরা মেধাস্বত্বের সুবিধা হারাব। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেলে এ সুবিধা আর থাকবে না। এরপর সর্বোচ্চ তিন বছর আমরা এ সুবিধা পাব। এর মধ্যে আমরা কিন্তু প্যাটেন্টের প্রডাক্ট আর বানাতে পারব না। ওটা বানাতে গেলে আমার লাইসেন্স কেনা লাগবে। এজন্য আমাদের নেগোসিয়েশন করা লাগবে। ট্রিপস ওয়েভার, যেটি ২০৩২ সাল পর্যন্ত আছে তা যেন কন্টিনিউ করা হয়। আমাদের কিছু প্রডাক্ট অলরেডি পাইপলাইনে আছে যেগুলো প্যাটেন্টেন্ড। আমরা ডিজি ড্রাগসের কাছে পণ্যগুলো রেজিস্ট্রেশন করতে পরি। পেপারওয়ার্কগুলো যদি আমরা সেরে রাখি, তাহলে ২০২৬ সালের নভেম্বরে যখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হবে, তখন রেজিস্ট্রি করা পণ্যগুলোকে তারা আটকাতে পারবে না। সরকারকে এ বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
বছর বছর রফতানির আকার বড় হচ্ছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বছরে রফতানি হয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার ওষুধ। এ আকার বাড়াতে কী ধরনের রফতানিবান্ধব বাজেট প্রয়োজন?
রফতানিতে আমরা চার-পাঁচ বছর ধরে প্রণোদনা পেয়ে আসছি। এটি আগে ১০ শতাংশ ছিল, এখন তা ৮ শতাংশ হয়েছে। এটি তো অনন্তকাল চলবে না। তবে আগামী দুই-তিন বছর এ প্রণোদনার প্রয়োজন রয়েছে। এটির কারণেও রফতানি বাড়ছে। ইউএসএফডি সার্টিফিকেশন থাকলে বিদেশের বায়াররাও আগ্রহী থাকে। এ ধরনের সার্টিফিকেশনের ওপরও সরকার কর আরোপ করতে পারে। সরকার বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ সহায়তার ব্যবস্থাও করতে পারে। এ খাতে ঋণখেলাপির সংখ্যা খুবই কম। ইপিবির মাধ্যমে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। যেমন সিঙ্গেল কান্ট্রি ফেয়ার। রফতানির দিকে আরেকটি দুশ্চিন্তা হলো এলডিসির পরের চ্যালেঞ্জ থেকে আমরা কীভাবে উত্তরণ করব। প্যাটেন্টের প্রডাক্টগুলো আমাদের জন্য লাভজনক। সেগুলোর পরও নজর দেয়া জরুরি।
ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে কোনো উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলো রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? দেশের ওষুধে বৈশ্বিক অ্যাক্রিডিটিশন যেমন এফডিএ, এমএইচআরএর মতো সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ওষুধ শিল্পের সীমাবদ্ধতা কোথায়?
কাঁচামাল আমদানিতে কাস্টমের জটিলতা কমাতে হবে। এখানে দেরি করলে আমাকে ডেমারেজ দিতে হয়। আমরা চীন ও ভারতের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আমরা ডাইভার্সিফিকেশনের চেষ্টা করছি। এখানে সরকারকেও আমাদের হেল্প করতে হবে। যেমন আমরা ইদানীং কোরিয়া ও জাপানের দিকে নজর দিচ্ছি। আমাদের এম্বাসিগুলোর অনেক কমার্শিয়াল উইং আছে, তারা আমাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারে। এখানে নতুন একটি প্র্যাকটিস শুরু হয়েছে, এখন নতুন করে যে অ্যাম্বাসেডররা যাচ্ছেন, তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছেন। এ উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। এতে আমি কোনো জায়গায় সরাসরি উপস্থিত না থেকেও অনেক তথ্য পেতে পারব। তাহলে আমাদের কাঁচামাল আমদানি এবং প্রস্তুত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সহযোগিতা হবে।










