দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের গতি এখন কেমন?

আমরা যারা কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি করি, তারা সাধারণত ক্রেডিট ব্যবস্থায় কৃষকের কাছে মেশিন সরবরাহ করি। কিন্তু অনেক সময় সঠিকভাবে অর্থ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না, ফলে এ খাতে ব্যবসা করতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আগে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু যন্ত্রাংশে ভর্তুকি ছিল হাওর অঞ্চলে ৭০ ও অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ। তবে গত বোরো মৌসুম থেকে এ ভর্তুকি বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা মেশিন এনে ফেলেছি, কিন্তু বিক্রি করতে পারছি না, ফলে বড় সমস্যার মধ্যে পড়েছি। সরকারি বরাদ্দকৃত ৩ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। শুনেছি এটি এক বছর বাড়তে পারে, তবে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা একটি জটিল পরিস্থিতিতে আছি।

আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কোন পর্যায়ে রয়েছি, আমাদের দেশে ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে কি?

অবশ্যই হবে। এখন আমরা দেখছি ট্রাক্টর চলছে কিন্তু অপারেটর নেই। পাশে বসে রিমোটে নিয়ন্ত্রণ করছে। কম্বাইন হারভেস্টর চলছে। ভবিষ্যতে হয়তো সার ড্রোনের মাধ্যমে দেয়া হবে। কৃষিতে এ মুহূর্তে এআই খুব বেশি ব্যবহার হচ্ছে না, তবে ভবিষ্যতে হবে।

প্রযুক্তি নির্ভর কৃষিতে প্রান্তিক কৃষকরা কতটা খাপ খাওয়াতে পারছেন?

প্রান্তিক কৃষকরা সাধারণত এসব যন্ত্রপাতি কিনে ব্যবহার করেন না। উদ্যোক্তারা আধুনিক যন্ত্র কিনে তা ভাড়ায় কৃষকের জমিতে ব্যবহার করছেন। এতে কৃষকের ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কমছে। ম্যানুয়ালি ফসল কাটার ফলে ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত ফসল নষ্ট হয়, যেখানে হারভেস্টর ব্যবহার করলে তা নেমে আসে মাত্র ১-২ শতাংশে। সময় ও খরচ দুদিক থেকেই প্রযুক্তির ব্যবহার লাভজনক। আজকের দিনে কৃষকরা অনেকটাই টিকে থাকছেন প্রযুক্তির সহায়তায়। পরিসংখ্যান বলছে, কৃষকের গড় বয়স ৫০ বছরের বেশি। আগামী দিনে কৃষি শ্রমিক সংকট বাড়বে, তখন যন্ত্রই হবে একমাত্র ভরসা।

জমিতে অত্যধিক সার-কীটনাশক প্রয়োগের ফলে উৎপাদনশীলতা কমে আসছে, এক্ষেত্রে করণীয় কী?

জমিতে অপ্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক ব্যবহারে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমে আসছে। ভবিষ্যতে এমন একটি সিস্টেম আসবে, যেখানে জমির ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করা যাবে কখন, কী পরিমাণ ও ধরনের সার বা কীটনাশক প্রয়োজন। তখন এসব সমস্যা অনেকটাই দূর হবে।

কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিনিয়ত কমছে, আগামীতে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয় কী?

কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। যান্ত্রিকীকরণই খাদ্যনিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে।

আপনারা বীজ নিয়েও কাজ করেন। উৎপাদন বাড়াতে বীজেরও বড় ভূমিকা আছে।

আমরা মূলত সবজি বীজ নিয়ে কাজ করি। আমাদের নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে এবং সেখানে উৎপাদিত প্রায় ৩৫ ধরনের হাইব্রিড বীজ বর্তমানে বাজারজাত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)হয়েছে, যাতে আমরা নিজস্ব জাতের ধান উৎপাদনে সক্ষম হই।

আসছে বাজেটে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

আমরা যে যন্ত্রপাতি আমদানি করি, সেগুলোর বিক্রির সময় ভ্যাট ও ট্যাক্স দিতে হয়। যদি বিক্রির ওপর এসব কর মওকুফ করা হয়, তবে কৃষকদের কাছে মেশিনের দাম সহনীয় থাকবে। যদিও আমদানির সময় ডিউটি মাত্র ১ শতাংশ, তবু অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি)রয়েছে, যা সরিয়ে দিলে খরচ আরো কমে আসবে।

একদিকে বলা হচ্ছে, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, অন্যদিকে আপনি বলছেন যন্ত্রের বিক্রি কমে যাচ্ছে। বিপরীতমুখী অবস্থা। কীভাবে এ অবস্থার বদল করা যায়?

এর সমাধান হলো আর্থিক সহায়তা। আমরা লোন পাচ্ছি না, আর কৃষকদের যে ঋণ দিচ্ছি, তাদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ আদায় করতে হচ্ছে। এভাবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যকর হবে না। ব্যাংকের একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে কৃষি খাতে আড়াই শতাংশ ঋণ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর বেশির ভাগ অংশ চলে যায় এনজিও খাতে, যেটি কৃষি ঋণ হিসেবেই দেখানো হয়। যদি প্রকৃত কৃষকের জন্য এ ঋণ বরাদ্দ হতো, বিশেষ করে কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য, তাহলে আমরা বর্তমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারতাম। পেঁয়াজ, আলুর ক্ষেত্রে যে রকম কম সুদে ঋণ দেয়া হয়, সে সুবিধা যদি কৃষি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও দেয়া হয়, তাহলে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ অনেক বেশি গতিশীল হবে।