২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক জটিল ও চ্যালেঞ্জিং বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, কর্মসংস্থান ঘাটতি, অন্যদিকে কর কাঠামোর জটিলতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন অনেকটাই সংকটময়। এমন বাস্তবতায় সরকার একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে, যার কিছু ইতিবাচক বার্তা দিলেও বহু উদ্যোগই সাধারণ মানুষের কাছে চাপে রূপ নিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির বর্তমান হার মার্চ ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় সামান্য বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে নামলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য এটি এখনো অসহনীয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলেছে। চাল, ডাল, তেল, মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে লাগাম না থাকায় অনেক পরিবার দৈনন্দিন খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও তা কাঙ্ক্ষিত নিরাপদ সীমার নিচেই রয়ে গেছে। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও রফতানির অস্থিরতার কারণে এ রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পোশাক খাতে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের রফতানি আয় এবং গার্মেন্টস খাতে নিয়োজিত ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলেছে।

কর্মসংস্থানের চিত্রটিও আশাব্যঞ্জক নয়। রক্ষণশীল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ২৬ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে বেকার। বিশেষ করে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ কোনো কাজ, পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নয়। তরুণদের মধ্যে এ কর্মহীনতা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।

অর্থনীতিতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাবে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের মতো উদ্যোগ নিয়েছে, তবু বাস্তবতা বলছে এখনো বিনিয়োগ পরিবেশে ভরসা ফেরেনি।

বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় ৪৯ হাজার কোটি টাকা কমিয়েছে এবং বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে এতে সামাজিক খাত, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সংকোচন হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকার ভ্যাট ও কর নীতিতে কঠোরতা এনেছে। জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৪৩টি পণ্যে ভ্যাট ৫ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ওষুধ, মোবাইল সিম, ইন্টারনেট, খাবার, হোটেল ও সেলুন সেবা। এছাড়া আরো ১০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় ভ্যাট ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীদেরও ভ্যাটের আওতায় আনার লক্ষ্যে বার্ষিক টার্নওভার সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে পারলেও এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পণ্যের দাম কমছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাট একটি ‘রিগ্রেসিভ কর’ পদ্ধতি, যা ধনী ও দরিদ্র উভয়ের কাছ থেকেই একই হারে আদায় করা হয়। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ওপর এ করের প্রভাব বেশি।

বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। কর কাঠামো এখনো পরোক্ষ কর নির্ভর (ভ্যাট, শুল্ক), ফলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে এ কর দিতে হয়। এছাড়া কর প্রদানের জটিলতা, হয়রানি, ঘুস ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষকে কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করছে।

সরকার কর সংস্কারে ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে এবং কর ফাঁকি রোধে অনলাইন প্লাটফর্ম চালু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এ প্রযুক্তি আসলেই কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ এতে কতটা উপকৃত হচ্ছে?

সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও আছে। যেমন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ, যেখানে ৬০ লাখ বয়স্ক, ৩২ লাখ প্রতিবন্ধী ও প্রায় ২৮ লাখ বিধবা নারীকে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্টের মতে, বরাদ্দ যথেষ্ট না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, নগদ সহায়তা, বাজার হাব প্রতিষ্ঠা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।

তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্টার্টআপ ফান্ড দ্বিগুণ করা এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর সুপারিশ উঠেছে। নারীদের জন্য নারীর অংশগ্রহণে জেন্ডার বাজেট, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষণ ও গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি একটি দীর্ঘদিনের দাবি, যা বাস্তবায়নে এখনো ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা, বিশেষ বরাদ্দ এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের জন্য সরাসরি বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি উঠেছে। এসব দাবি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বাজেট হতে পারে সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক।

অবশেষে, বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া সহজ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। বাজেট ডকুমেন্ট সহজ, সংক্ষিপ্ত ও বোধগম্য করতে হবে, যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে তার কর কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে উন্নয়ন হচ্ছে।

সরকার যদি দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স নীতিতে দমন করে, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলেই বর্তমান সংকট সামলে একটি স্থিতিশীল ও মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।