প্লাস্টিক খাতের বাজার এখন কত? এ খাতের কোম্পানিগুলো কেমন চলছে?
অভ্যন্তরীণভাবে বর্তমানে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। এ খাত সরকারের কোষাগারে প্রতি বছর আনুমানিক প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ রাজস্ব দিয়ে থাকে। প্লাস্টিক সেক্টরের রফতানির পরিমাণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের মতো। রফতানি প্রতি বছর বাড়ছে। বর্তমানে সরাসরি ও প্রচ্ছন্ন রফতানিতে দেশের প্লাস্টিক শিল্প খাতের অবস্থান ষষ্ঠ। অন্যদিকে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে ছয় হাজার প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। এ খাতের ওপর প্রায় ১২ লাখের বেশি মানুষ নির্ভরশীল। প্লাস্টিক পণ্য ১২৬টি দেশের বাজারে রফতানি হয়ে আসছে। প্লাস্টিক খাতের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে।
এছাড়া বর্তমানে গার্মেন্টস, খাদ্য, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে প্লাস্টিক শিল্প ব্যাপক অবদান রাখছে ও রফতানি হচ্ছে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের শুধু তৈরি পোশাক ও নিট শিল্পই নয়, ফ্রোজেন ফিশ, জুট টোইয়ান, ফার্মাসিউটিক্যালস আইটেম রফতানিসহ বিভিন্ন রফতানিকারক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক র্যাপিং বা মোড়কের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
সুনির্দিষ্টভাবে এবারের বাজেটে প্লাস্টিক খাতের প্রত্যাশা কী?
আগামী বাজেটে (২০২৫-২৬) বিপিজিএমইএ থেকে অন্তর্ভুক্তির জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব এফবিসিসিআই ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আমদানীকৃত যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, উপকরণ ইত্যাদির ওপর থেকে আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ বহাল রেখে মূসক, সম্পূরক শুল্ক, আরডি অব্যাহতির সুবিধা সংবলিত এসআরও নং-১২০-আইন/২০২১/০৯/কাস্টমস তাং ২৪/৫/২০২১ইং এ বিপিজিএমইএকে অন্তর্ভুক্তকরণের কথা।
প্লাস্টিক শিল্পের মৌলিক কাঁচামালের আমদানি শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ নির্ধারিত আছে। প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমদানি শুল্ক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানের বেলায় ফিলার মাস্টার ব্যাচের আমদানি শুল্ক অন্যান্য শিল্পের মৌলিক কাঁচামালের মতো ৫ শতাংশ ধার্য করা যেতে পারে।
প্লাস্টিক খেলনা আইটেমের ট্যারিফ মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া গড় মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় বর্তমান করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এ বিবেচনায় আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বর্তমান ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকায় নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিকের শিল্পগুলো দ্বারা দেশে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর থেকে অগ্রিম কর ৩ শতাংশ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি। দেশে উৎপাদিত পণ্য কোনো লিমিটেড কোম্পানিতে সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর কর্তন আগের মতো ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছি।
এছাড়া প্লাস্টিক খাতকে কর অবকাশ সুবিধার আওতায় আনা, দেশীয় প্লাস্টিক খেলনা এবং প্লাস্টিক ক্রোকারিজ পণ্যের ওপর ১৫% ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানীকৃত তৈরি প্লাস্টিক পণ্যে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ ও রেগুলেটরি ডিউটি বাড়িয়ে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং কার্যক্রমে নিম্ন আয়ের মানুষ জড়িত থাকায় এ খাতে আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাবও উল্লেখ করা হয়েছে বাজেট প্রত্যাশায়।
বাংলাদেশের প্লাস্টিক খাতের সম্ভাবনা কেমন? আর সম্ভাবনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ কী?
বিশ্ববাজারে টেক্সটাইল ও অ্যাপারেলসের পাশাপাশি প্লাস্টিক খাত একটি বৃহৎ ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে, যার গ্লোবাল মার্কেট সাইজ প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশ এখনো মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ অবদান রাখছে। লক্ষ্য রয়েছে এ অংশীদারত্ব ৩ শতাংশে উন্নীত করার।
দেশে প্লাস্টিক শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে—বিশেষত প্যাকেজিং, ওভেন ব্যাগ, খেলনা, ক্রোকারিজ, ফার্নিচারসহ অন্যান্য সাব-সেক্টরে। প্লাস্টিক খেলনা ও ওভেন ব্যাগে এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রফতানি শুরু হয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে ৭০টি ওভেন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যাতে এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সরকার আগে রফতানিতে ১০ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ দিলেও বর্তমানে তা ৬ শতাংশ হওয়ায় রফতানির গতি কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্লাস্টিক শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ যেমন- কাঁচামালে উচ্চ ব্যয় ও আমদানিনির্ভরতা, জ্বালানি খরচ, দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তির ঘাটতি, পরিবেশগত ও নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা এবং ব্র্যান্ডিং ও রফতানি সীমাবদ্ধতা। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উৎসাহিত করতে বাজেটে কী ধরনের দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করেন?
দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোর্স সেপারেশন ব্যবস্থার প্রয়োজন। এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে রিসাইক্লিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। প্লাস্টিক পচনশীল নয়, তাই এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রিসাইক্লিংকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনকে বাস্তবভিত্তিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চলতি বাজেটে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভ্যাট কমানোর দাবি জানিয়েছিল রফতানিকারক সংগঠন বিপিজিএমইএ। এ প্রস্তাবের বিষয়ে কী হলো? পূরণ হয়েছে কি?
প্লাস্টিক শিল্প-কারখানায় নিজস্ব পর্যায়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সুবিধা রয়েছে। অনেক করপোরেট শিল্প প্রতিষ্ঠান অব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য সংগ্রহের জন্য নিজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে এবং সেসব প্রতিষ্ঠানে অব্যবস্থাপিত প্লাস্টিক রিসাইক্লিং হচ্ছে প্রায় ৫০ শতাংশ। বিপিজিএমইএর সুপারিশে সরকার রিসাইক্লিং খাতে ইনসেনটিভস প্রদান করছে এবং প্লাস্টিক বর্জ্য হতে রিসাইক্লিং পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে রিসাইক্লিং দানা থেকে উৎপাদিত পণ্যের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রচেষ্টা চলছে। বিপিজিএমইএর চলতি প্রস্তাবিত বাজেটে (২৫-২৬) এ প্রস্তাব সংযোজিত রয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তথা পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে আশা করছি চূড়ান্ত বাজেটে এ প্রস্তাব সংযোজিত হবে।
পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের দিকে শিল্পের অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে আপনার মতামত কী?
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লাস্টিক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারলে বিশ্ববাজারের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে আরএফএল ও বেঙ্গলের মতো বড় প্রতিষ্ঠান রিসাইকেল প্লান্ট চালু করছে, এটা ইতিবাচক। তবে ফেলে দেয়া বা বাসায় অব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করে রি-সাইকেল প্লান্টে নিয়ে আসা একটা বড় সমস্যা। এর জন্য একটা কার্যকর ইকোসিস্টেম চালু করতে হবে। ব্যবসায়ী ও সরকার মিলে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ ফেলে দেয়া প্লাস্টিক পণ্য সঠিকভবে সংগ্রহ করতে না পারলে রি-সাইকেল প্লান্টগুলো কাজে আসবে না। উন্নত অনেক দেশে ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্লাস্টিক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
গুণগত মানে উন্নত পণ্য উৎপাদন করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য ও এবং নতুন বাজার খোঁজা প্রয়োজন। আর প্রয়োজন সব ইন্ডাস্ট্রিকে কমপ্লায়েন্স হিসেবে গড়ে তোলা।
রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশী প্লাস্টিক পণ্যের প্রধান বাজার কোন কোন দেশ এবং কীভাবে আমরা রফতানি আরো বৃদ্ধি করতে পারি?
প্লাস্টিক পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশসহ সমগ্র ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন চীন, ভারত, নেপালসহ ১২৬টি দেশে রফতানি হয়ে আসছে। প্লাস্টিক পণ্যের রফতানি বাড়াতে ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ)। এজন্য শুধু পণ্যমেলা নয়, এর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া যোগ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোতে রফতানির জন্য আবেদন করা। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা প্লাস্টিক শিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে একটি অন্যতম রফতানি খাতে পরিণত হচ্ছে। যে কারণে রফতানি বাজার সম্প্রসারণে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বিপিজিএমইএকে।
দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক দেশগুলোর মধ্যে ভারতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক রফতানি হয়। কিন্তু নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ততটা বাড়েনি প্লাস্টিক পণ্য রফতানি। এ দেশগুলোতে রফতানি বাড়াতে চেষ্টা চালাচ্ছে এ সংগঠন। বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য বিদেশে রফতানি হয় বা রফতানি তালিকায় যেসব পণ্য প্রথম দিকে রয়েছে তার মধ্যে ১২তম পণ্য হচ্ছে প্লাস্টিক।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে প্লাস্টিক শিল্প কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের) আর্থিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বিআইপিইটি) স্থায়ী ক্যাম্পাস এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই এ স্থায়ী ক্যাম্পাসে ভর্তি ও প্রশিক্ষণ শুরু হতে যাচ্ছে।
বিপিজিএমইএর পল্টন অফিসে সাময়িকভাবে বিপেট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল এবং এরই মধ্যে বিভিন্ন প্লাস্টিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তিন হাজার জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। এক্ষেত্রে একক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে এ খাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।










