দেশে ফসেট উৎপাদনের ক্ষেত্রে কী ধরনের সংকট আছে?
অর্থনৈতিক খাতে ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি বাড়ায় কাঁচামাল বাবদ ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং একই সঙ্গে শিল্প খাতের গ্যাস-বিদ্যুৎ বাবদ ব্যয় অনেক বেড়েছে। নিয়মিত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে বর্তমান ব্যয় নির্বাহ করতে না পারায় উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে গিয়েছে। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে ফসেটের দাম বাড়ায় সারা দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পণ্য ক্রয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। এছাড়া ফসেট উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল আমদানি করতে হয়। বিগত বছরের ডলার সংকটের কারণে এসব আমদানি করা ছিল জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে প্রায়ই উৎপাদন জটিলতায় পড়তে হয়েছে। এছাড়া এ শিল্পে দেশীয় কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিকের অনেক অভাব রয়েছে।
বিগত বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে?
সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ফসেট শিল্পের জন্য ৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণের দাবি করেছিলাম। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে ফসেট শিল্প এসএমইর অন্তর্ভুক্ত। এ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী নয়। আমাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু আমাদের শিল্পের মূল কাঁচামাল হিসেবে স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি ব্যবহার করা হয়, তাই শক্তিশালী বৃহদায়তন শিল্পের জন্য নির্ধারিত ভ্যাট হার আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আরোপ করার কারণে তা এ শিল্পের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের বাজেটে ফসেট শিল্পের জন্য আপনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো কী?
এ খাতের সার্বিক বিকাশে সহনীয় ভ্যাট হার চাই, যা ৫ শতাংশের বেশি হতে পারে না। ভ্যাট হার কমলে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট প্রদানে উৎসাহী হবেন এবং এ খাতের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নতুন করে ভ্যাটের আওতায় আসবেন। ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে। ঐতিহাসিকভাবে ফসেট শিল্প ঢাকার ভেতরে যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশে গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এ শিল্পকে বৃহদায়তন রূপ দিতে হলে বড় পরিসরে আধুনিক শিল্প সুবিধাসম্পন্ন জায়গা প্রয়োজন। আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এজন্য হতে পারে আদর্শ স্থান। কিন্তু এখানে যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে তা বড় শিল্প তথা শিল্পগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী। তাই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় ফসেট শিল্পের জন্য বিশেষ সুবিধায় প্লট বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া বিদেশ থেকে সহজেই ফসেট আমদানি করা যায় বলে আমাদের ফসেট মার্কেটের প্রায় ৫০ শতাংশ আমদানিকারকদের দখলে। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বাঁচাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো জরুরি। তাই ফসেট আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্কহার আরো বাড়নো প্রয়োজন।
ফসেট শিল্পের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট কোন নীতি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
ফসেট উৎপাদনে অনেক যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। এর প্রতিটি পার্ট উৎপাদনে এ ইন্ডাস্ট্রিতে ছোট-বড় এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও পরিশ্রমী কর্মী থাকলেও মূলধনের তীব্র সংকট রয়েছে। দেশের প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় লোন সংগ্রহ করা অত্যন্ত জটিল। শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য লোন সংগ্রহ সহজ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে এ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। সরকারি সহায়তায় দক্ষতা উন্নয়নে পর্যাপ্ত কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে দেশীয় শিল্প হিসেবে ফসেট ইন্ডাস্ট্রি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কতটুকু?
দেশের ফসেট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ দেশীয় পণ্য দ্বারা পূরণ হচ্ছে। বাকি ৫০ শতাংশ ফসেট মূলত আমদানি করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী ফসেট পণ্যের সম্ভাবনা কেমন?
ফসেটের আন্তর্জাতিক বাজারে অসংখ্য ব্র্যান্ড রয়েছে। প্রতিটি মার্কেট ভিন্ন ধরনের। আমাদের নিকটবর্তী আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামে ফসেটের বড় বাজার রয়েছে। সেখানে জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। ভারত সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয়ায় সেখানে ফসেটের চাহিদা বেড়েছে। এছাড়া নেপাল, ভুটান ও আফ্রিকার দেশগুলোয় মেড ইন বাংলাদেশ ফসেট রফতানি করা সম্ভব।
দেশে উৎপাদিত ফসেট কতটুকু শাইনি? ফসেট পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া এবং কোয়ালিটি পণ্য সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও বিদেশী ফসেটের তুলনায় দেশীয় ফসেট নিম্নমানের ছিল। বর্তমানে দেশীয় ফসেটের শাইনিং বহুগুণ বেড়েছে। কক্সবাজারসহ কোস্টাল এরিয়ায় আগে দেশীয় ফসেটে দ্রুত মরিচা পড়ে যেত। রাজা ফসেটে মরিচারোধী থ্রি লেয়ার ইলেকট্রোপ্লেটিং থাকায় আমরা নিশ্চিন্তে ১২ বছরের গ্যারান্টি দিচ্ছি। এছাড়া দেশীয় ফসেটে উন্নত মানের কার্ট্রিজ ব্যবহার হচ্ছে। রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের নিজস্ব মোল্ড তৈরির মেশিন থাকায় আধুনিক ডিজাইনের ফসেট আমরা দেশেই উৎপাদন শুরু করেছি।










