দীর্ঘদিন ধরেই আপনাদের দাবি ছিল ভ্যাট ৫ শতাংশ ছাড়ের। সরকার সেটিতে সম্মতি দিয়েছে। এতে ব্যবসার স্মুথনেস বাড়ার কথা। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তা পর্যায়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুপারশপ ব্যবসার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
মূল্যস্ফীতির পেছনে অনেকগুলো ফ্যাক্টর রয়েছে। এর মধ্যে একটি গ্লোবাল ম্যাক্রো ইকোনমিকস। সেটির প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে। আরেকটি হলো আমাদের নিজেদের ইন্টারনাল ফ্যাক্টর। আমাদের ট্রেড ব্যালান্স একসময় নেতিবাচকভাবে ইমপ্যাক্টেড হয়েছিল বলে বিনিময় হার নেমে গিয়েছিল। এগুলোর কারণে মূলত ইনফ্লেশন (মূল্যস্ফীতি) হয়েছিল। মূল্যস্ফীতির গতি আস্তে আস্তে কমছে। ২০২২-২৩ সালে আমাদের বিক্রয় উপাত্ত অনুযায়ী ১৬-১৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ছিল। ২০২৩-২৪ সালে ছিল ৭ শতাংশ। এখন ৩ শতাংশ। তার মানে এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইনফ্লেশন রেট (মূল্যস্ফীতির গতি) ধীরে ধীরে কমে আসছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রাইভেট সেক্টর, অর্থ মন্ত্রণালয় এক সঙ্গে কাজ করেছে।
অন্তর্ভুক্তি (ইনক্লুসিভনেস) ও অর্থবহ সংলাপ বেড়েছে। সরকার, বিশেষত এনবিআর, মাননীয় গভর্নর, মাননীয় বাণিজ্য উপদেষ্টা আমাদের সঙ্গে সংলাপ করেছেন। এর ফল হলো ভ্যাট-নীতির পরিবর্তন। ভোক্তার ওপর এখন সেই বৈষম্যমূলক ৫ শতাংশ ভ্যাট আর নেই।
এ পরিবর্তনের কথা আমি এবং আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বাররা অনেকদিন থেকেই বলে আসছি। এতদিনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সেটি শুনেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক।
মূল্যস্ফীতি কমছে কিন্তু জিডিপি বৃদ্ধির হার ধীর হয়ে গেছে। কভিডের পর থেকে এটি ধীরে ধীরে কমে আসছে। সরকার এখন সুদের হার কমাতে পারে। সেই সঙ্গে নতুন রফতানি সেক্টরের বিকাশ ও চাকরির বাজার তৈরি করা দরকার।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। এরপর ‘সতর্ক আশাবাদ’, তারপর তৈরি হয় ‘হতাশাবাদ’ (প্যাসিমিজম)। এখন আবার নতুন করে অপটিমিজমের (আশাবাদের) দিকে ক্রেতারা যাচ্ছেন।
কারণ মূল্যস্ফীতির গতি একটু কমে এসেছে। একটু একটু ধরে সবকিছুর উন্নতি হচ্ছে। এরপর ভ্যাটের বাধাটা দূর হলো। ফলে বিক্রির হার বেড়েছে। এটিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এ মুহূর্তে আমাদের সেম স্টোর। সেলস গ্রোথ রেট ১১-১৪ শতাংশ। কখনই এই রেট ছিল না। এই রেট ৫-৬ শতাংশ করতেই বেগ পেতে হতো।
শাখা বেড়েছে, বিক্রিও বেড়েছে। নতুন শাখা খোলার বিষয়ে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী?
স্বপ্নর এখন ৬১৩টি স্টোর রয়েছে। আমাদের টার্গেট প্রতি বছর প্রায় ৩০০টি স্টোর করা। সব স্টোর লাভজনক হবে এমনটি কখনেই হয় না। কিছু কিছু স্থানান্তর, আবার কোনোটা বন্ধ করতে হয়। সেই তুলনায় আমাদের ৮০ শতাংশের বেশি স্টোর এক্ষেত্রে সফল। গত এক বছরের হিসাব করলে ৯২ শতাংশের ওপর সফল।
সুপারশপের একটি সুবিধা হলো এর মাধ্যমে সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। স্বপ্নসহ আরো সুপারশপগুলো রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর, এরপর জেলা-উপজেলা এমনকি স্থানীয় পর্যায়েও শাখা চালু করছে। এটার আরো বৃদ্ধির আদৌ প্রয়োজন কিনা। কিংবা এই বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রের বা মানুষের উপকার কী?
মডার্ন বাণিজ্য কেন দরকার? মডার্ন বাণিজ্য সরকারের জন্য রেভিনিউ তৈরি করে। এ খাতে ২৭ বিলিয়নের একটি অপরচুনিটির কথা আমরা বলছি। তাই সুপারশপের বিকাশে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা উচিত। সুপারশপ শিক্ষিত তরুণ, ছাত্রছাত্রী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করছে। চাকরির বাজার তৈরি হচ্ছে। নারীবান্ধব শপিং, নারী বিক্রয়কর্মীর চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্বপ্নর ২০ শতাংশই নারী কর্মী। অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে প্রতিবন্ধী, শারীরিকভাবে অক্ষমসহ সবাইকে যুক্ত করা যাচ্ছে। এছাড়া আমরা সরাসরি উৎপাদক তথা ফার্মারদের থেকে পণ্য নিয়ে থাকি। এতে তারাও মডার্ন বাজারে পণ্য সরবরাহ করছে। এতে কৃষক ও ভোক্তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। সুপারশপের বিকাশ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নির্দেশ করে।
সুপারশপের সংখ্যা বাড়ছে, কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সরাসরি নিলে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা করতে পারে না। সেক্ষেত্রে দামের জায়গাটি মেইনটেইন করা সহজ কিনা।
এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা অনেক সহজ। আপনারা দেখবেন, যখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যায় এবং কিছু পণ্যে ব্যাপক সিন্ডিকেশন হয়, তখন আমরা একটি ভূমিকা নিয়ে থাকি। আমরা সেসব পণ্যের দাম কমিয়ে দিই। আমরা কমিয়ে দিই কারণ আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনি। এমনটি করলে সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগটা কমে আসে। আলু, চাল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যে যখন সিন্ডিকেট বেড়ে যায় তখন স্বপ্ন দাম কমিয়ে দেয়। আমাদের কারণে পুরা ভ্যালু চেইন অনেক সময় দাম কমাতে বাধ্য হয়।
সুপারশপের জন্য আলাদা কোনো নীতিমালা বিশেষ করে এখন যেসব নিয়ম-নীতি রয়েছে সেটি আপগ্রেডেশন প্রয়োজন আছে কিনা।
অবশ্যই আছে। আমার ব্যবসার জন্য ১০-১২টা লাইসেন্স লাগে। প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা করে লাগে এসব লাইসেন্স নবায়নের জন্য। এটি তো একটি সমস্যা। এছাড়া লাইসেন্স পাওয়া যায় না সময়মতো। বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। আমার বিদ্যুতে ২৫ থেকে ৮০ কিলোওয়াট লোড লাগে। কিন্তু এই লোড পেতে সময় লাগে। নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার জন্য যেসব আইন আছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ অনেক ফাঁক আছে। যেমন কোনো পণ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং এন্ডে সমস্যার জন্য রিটেইলারকে শাস্তি পেতে হয় বর্তমান আইনে। রিটেইলার হিসেবে আমি পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি মানছি কিনা, পরিবেশ কেমন, সংরক্ষণের নিয়ম মানছি কিনা সেসবের জন্যই তো আমাকে ধরার কথা। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারের ত্রুটির জন্যও ধরা হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও এমনটি হয় না। এর বাইরে তিন সংস্থা খাদ্যের সেফটি মেইনটেইনের জন্য আইন তৈরি করেছে আর সাত-আটটি সংস্থা বাস্তবায়ন করছে। এগুলোর সমন্বয় করে অবশ্যই একটি নীতিমালার মধ্যে আনা উচিত।
সুপারশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, গত তিন বছরে এ খাতের ব্যবসায় অনেক গতি এসেছে। সেখানে আপনার পর্যবেক্ষণ কী, সুপারশপ ব্যবসার গতি কেমন?
১৫ বছর ধরে আমাদের সিএজিআর (কম্পাউন্ড অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট) ১৫ শতাংশের ওপরে। কিন্তু সাধারণ বাণিজ্যে এটি ৫-৬ শতাংশ হবে। সর্বোচ্চ ৭-৮ শতাংশ হবে। আমরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। ভোক্তাদের মাথাপিছু আয় ও ফুড সেফটির বিষয়ে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সুপারমার্কেটের দিকে ঝুঁকছে।
এ খাতে নতুন বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ কিংবা আর কতটুকু এ খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন?
এ মার্কেটটি কিন্তু বিশাল বড়। এখানে বিভিন্ন ফরম্যাটে মডার্ন ট্রেড আসতে পারে। একেকটা সুপারশপ একেক ফরম্যাটে ব্যবসা করছে। ফরম্যাট অনুযায়ী এখনো অনেক বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এখানে আরো বিনিয়োগ হওয়া উচিত। কেউ এখানে বিনিয়োগ করতে চাইলে ব্যাংকের টাকায় না করে নিজের টাকায় করতে হবে। কারণ ব্যাংকের যে সুদের হার তা এত কম মার্জিনের ব্যবসার জন্য উপযুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, এ ব্যবসায় এলাম আর দুই বছর পর সব খরচ উঠে আসবে এ চিন্তা বাদ দিয়ে আসতে হবে। আমি অন্তত ১০ বছর টিকে থাকব, এ চিন্তা নিয়েই বিনিয়োগ করতে হবে। তবেই টিকে থাকা সম্ভব হবে।
সুপারশপ কোম্পানিগুলো সরাসরি কৃষকের সঙ্গে কাজ করছে। এখানে কাজ করতে গিয়ে সরকারের নীতিমালাগত কোনো সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় কিনা আর সেখানে কোনো সচেতনতার প্রয়োজন আছে কিনা।
আমাদের দেশে ফুড সেফটি বাস্তবায়নে সবার আগে সুপারশপগুলোয় এসে অভিযান চালানো হয়। অথচ ফুড সেফটির জন্য সবার আগে নজর দেয়া দরকার কৃষক যেটি চাষ করছেন সেখানে কীটনাশক থেকে যাচ্ছে কিনা। সেটি জানা খুবই জরুরি। ভূমির জন্য আমরা কী করি? জলবায়ুর জন্য কী করছি? খাদ্য যেটি খাচ্ছি, সেটি আসলে কী খাচ্ছি, কোন পুষ্টিগুণ উৎপন্ন করছি। এগুলো জরুরি। রাস্তার ধারে যে মাছ-মাংস বিক্রি হয় সেগুলো ব্যাকটেরিয়া জন্মায় কিনা এসব সচেতনতা তৈরির কাজ করতে হবে।
বাজেটে ইনস্ট্যান্ট কোনো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন মনে করেন কিনা।
সরকারকে সাধুবাদ জানাই, ১৫ শতাংশ আউটপুট ভ্যাটের আওতায় সবাইকে নিয়ে আসা হয়েছে। যার ফলে ভোক্তার ওপর বাড়তি কোনো চাপ নেই ভ্যাট দেয়ার। কিন্তু এতে আমাদের মার্জিন কমে এসেছে। দুধ, স্যানিটারি ন্যাপকিন, মাঠা, লোকাল চিজ, কেটলি ও ব্লেন্ডারের মতো কিছু পণ্যে ইনপুট পর্যায়ে কোনো ভ্যাট নেই। আমি যদি আউটপুট পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিই, তাহলে এটি বিক্রয়মূল্যের ওপরে ভ্যাট প্রয়োগ হয়ে যাচ্ছে। যেটি ভ্যাট পলিসির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইনপুট ভ্যাট যদি শূন্য শতাংশ থাকে তাহলে আউটপুট ভ্যাটও শূন্য করতে হবে। আমি মনে করি, এ বাজেটের আগে সরকারকে এটি মাথায় নেয়া উচিত। আমাদের ইলেকট্রিক বিলের ভ্যাট রিবেট পেতে হলে নিজের মিটার থাকতে হবে। কিন্তু মিটার তো ভূমির মালিকের কাছে। আমরা স্টোর চালাই, মিটার পাই না। রেন্টের ওপর ভ্যাটে রিবেট পাওয়া উচিত। সরকারকে এগুলো তাৎক্ষণিক করতে হবে। সঠিক ফুড সেফটির জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কিছু করা উচিত। এর বাইরে বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খরচ যাতে হুটহাট বাড়িয়ে দিতে না পারে সেটির দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। এমনটি করতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে, বিদেশেও আমরা দক্ষ লোকবল পাঠাতে পারব।
আপনাদের গ্রাহকদের উদ্দেশে কিছু বলতে চান?
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে আপনাদের ওপর থেকে ৫ শতাংশ ভ্যাটের খড়্গ নামল। অথেনটিক ও নিরাপদ খাদ্য যদি চান তাহলে অবশ্যই সুপারশপে আসেন। আপনাদের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সুপারশপ নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করে থাকে।










