বাজেটে কাচ শিল্পের উৎপাদকদের কী কী প্রত্যাশা রয়েছে?

আমাদের চাওয়াটা খুবই সামান্য। বাংলাদেশে বিক্রি করলেই আমাদের উৎপাদিত সব পণ্য বিক্রি হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। আমরা রফতানির লক্ষ্য নিয়েই ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছি। যাতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করতে পারি। ফলে দেশের শতভাগ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমরা এখন রফতানির পথ আরো সহজ হওয়ার প্রত্যাশা করছি। সেক্ষেত্রে এবারের বাজেটে আমাদের চাওয়া যেসব ইন্ডাস্ট্রির ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে গ্লাস ইন্ডাস্ট্রি কাজ করে, সেসব ইন্ডাস্ট্রিতে যেন আমাদের দেশীয় গ্লাস ব্যবহার করা হয়, সে রকম কোনো নীতিমালা তৈরি করা। যাতে সেসব ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমরাও গ্রো করতে পারি। এছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে আমাদের পুরোপুরি ট্যাক্স দিতে হয়। সেখানে আমাদের কিছুটা ছাড় দেয়া যেতে পারে।

দেশে কাচ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারটা কেমন?

আমাদের দেশে এখন সব কোম্পানি মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিদিন দুই হাজার টন। বছরে যা সাত লাখ টনের কাছাকাছি। ফলে স্থানীয় চাহিদার শতভাগ জোগান দেয়ার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করার মতো উৎপাদন সক্ষমতাও আমাদের তৈরি হয়েছে। এ খাতে সরাসরি জড়িত প্রায় ১২ হাজার মানুষ। এছাড়া এ খাতের প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে বালি। এ বালি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৬০ হাজার মানুষ। সব কোম্পানি মিলিয়ে হিসাব করলে কাচ শিল্পে বিনিয়োগ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

দেশে উৎপাদন হয় এমন অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে গ্লাসের প্রয়োজন পড়ে। অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে এটি কতটুকু সক্ষম?

আমরা যে কাচ উৎপাদন করি সেটি আর্কিটেকচারাল গ্লাস। এটি প্রধানত কনস্ট্রাকশনের কাজে বেশি ব্যবহার হয়। তাছাড়া ফার্নিচার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও ইলেকট্রনিকসে কাচের বেশ ব্যবহার রয়েছে। আর্কিটেকচারাল গ্লাসের বাইরে রেফ্রিজারেটর এবং অন্য হোম অ্যাপ্লায়েন্সের জন্য গ্লাস ইন্ডাস্ট্রি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে কাজ করে। এখানে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা এখনো পুরোপুরি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই না সক্ষমতা থাকার পরও। কারণ ওই ইন্ডাস্ট্রিগুলো সরকারের কাছ থেকে বেশকিছু সুবিধা পায়। এর মধ্যে রেফ্রিজারেটরে বা ফ্রিজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে ডিউটি ছাড় রয়েছে। এতে দেশীয় কাচ শিল্পের চেয়ে বিদেশী গ্লাস কোম্পানিগুলো বেশি সুবিধা পাচ্ছে। অথচ স্থানীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক মানের কাচ তৈরি করছেন। তারা কোয়ালিটি ও কোয়ান্টিটি চাহিদামতো সরবরাহে সক্ষম। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এটা শুধু গ্লাস ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা না, এতে সরকারও বড় ধরনের আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া দেশের ডলারও ব্যয় হচ্ছে। ফলে এখানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

এ খাতে অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখেন কিনা।

আসলে জ্বালানি সমস্যা এখানে প্রকট। এটা শুধু কাচ শিল্পে না, অন্য অনেক শিল্পেরই সমস্যা। আমরা গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। অথচ চাহিদা মোতাবেক গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অন্য ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় কাচের ক্ষেত্রে এটি আরো বড় সমস্যা। কারণ গ্লাস কারখানা একবার চালু করলে টানা ১২ বছর বন্ধ করা যায় না। অল্প কিছু সময়ের জন্যও বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ফলে সংকটের সময় বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা রাখতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এ কারণে বাজার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিমশিম খেতে হয়।

আকিজবশির গ্রুপ কত ধরনের গ্লাস তৈরি করে?

আমরা প্রথমে নিয়ে আসি ক্লিয়ার গ্লাস। এরই মধ্যে বাজারে ৭০০ পিপিএমের ক্লিয়ার গ্লাস নিয়ে এসেছি। এরপর রিফ্লেক্টিভ কালার গ্লাস লঞ্চ করেছি। তারপর মিরর গ্লাস নিয়ে আসি। আইজিইউ গ্লাস বা ডাবল গ্লেজড গ্লাস, লো-ই গ্লাস ও টেম্পার্ড গ্লাস বাজারে নিয়ে আসব কিছুদিনের মধ্যে। অর্থাৎ বাজারে যত ধরনের গ্লাসের চাহিদা আছে সবই আমরা পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসব। আশা করি, এ বছরের শেষ নাগাদই এটি বাস্তবায়ন হবে।

কাঁচামাল আমদানি এবং কাচ রফতানির ক্ষেত্রে কোন কোন দেশ সোর্সিং ও রফতানি গন্তব্য হিসেবে সুবিধাজনক?

আসলে কাচের প্রধান কাঁচামাল বালি। এটি দেশেই পাওয়া যায়। এছাড়া আরো ৮-১০ রকমের কাঁচামাল প্রয়োজন পড়ে। সেটি বিভিন্ন দেশ থেকে আনতে হয়। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে চায়না বড় একটি গন্তব্য। এছাড়া রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও ইউরোপের কিছু দেশ। এর বাইরে অনেক মেশিনারিজের প্রয়োজন পড়ে। আকিজবশির মেশিনের জন্য ইউরোপকেই প্রাধান্য দেয়। এখন পর্যন্ত সেখান থেকেই সব মেশিন আনা হয়েছে। রফতানির ক্ষেত্রে আমরা এশিয়ার দেশগুলোকেই এখন পর্যন্ত গন্তব্য হিসেবে নিয়েছি। বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাচ রফতানি নিয়ে কাজ করছি। তাদের চাহিদা মোতাবেক উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। এ বছরের শেষের দিকে একটা ভালো ফল পাওয়া যাবে আশা করছি।