বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ২০২৪-২৫ সালের ক্ষুদ্র সেচ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ডিজেলচালিত এবং প্রায় পাঁচ লাখ বিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, কৃষি সেচেই বছরে প্রায় ১০ লাখ ৫৩ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এ বাস্তবতায় দেশের ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন হেক্টর তিনফসলি জমিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের পরিবর্তে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি। প্রাথমিকভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও এটি ব্যয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি কমবে, সরকারি ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

একটি মানসম্পন্ন সৌর সেচ পাম্প প্রায় ২৫ বছর কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। ফলে কৃষক নিরবচ্ছিন্ন ও কম খরচে সেচ সুবিধা পান, ফসলের উৎপাদন ব্যয় কমে এবং মুনাফা বাড়ে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ কমে, জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে ওঠে এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপও হ্রাস পায়। সেচ মৌসুমের বাইরে সৌরবিদ্যুৎ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত, ক্ষুদ্র শিল্প কিংবা ভবিষ্যতে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভারতের ‘পিএম কুসুম’ কর্মসূচি প্রমাণ করেছে, পরিকল্পিত নীতি, সরকারি প্রণোদনা এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে সৌর সেচ সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশও নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে একটি জাতীয় সৌর সেচ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন অগ্রাধিকারভিত্তিক এলাকা নির্বাচন, কৃষকদের জন্য মূলধনি প্রণোদনা, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা এবং উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী সার্ভিস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের কৃষিকে আরো লাভজনক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করতে এখন সাহসী নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। ডিজেলনির্ভর সেচ থেকে সৌরচালিত সেচে রূপান্তর শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি জাতীয় কৌশল। আজকের এ বিনিয়োগই আগামী দিনের টেকসই কৃষি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।

মো. আবু তাহের: ব্যবস্থাপনা পরিচালক

শেরপা পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড