বছরের পর বছর ধরে এ বিষয়ে আলোচনা, সমীক্ষা ও নীতিগত পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্তের চেয়ে কাগজপত্রই বেশি ঘুরেছে। সে দীর্ঘসূত্রতার মূল্য এখন দেশকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কয়লা আমদানির মাধ্যমে দিতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো বাংলাদেশের মাটির নিচে শত শত বছরের জ্বালানির মজুদ থাকার পরও প্রতি বছর প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা আমদানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার এবং সমুদ্র পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এ বাস্তবতায় শুধু বিদেশী বাজারের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আমার দৃষ্টিতে সরকার একদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, অন্যদিকে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। পরিকল্পিতভাবে দেশীয় কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহার করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, জ্বালানির সরবরাহ আরো নির্ভরযোগ্য হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
আমার মতে, এখন ইনশোর ও অফশোর, উভয় ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বিষয়ে দ্রুত এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমার অধিকার নিশ্চিত করেছে প্রায় দেড় দশক আগে। কিন্তু এত বছর পরও সমুদ্র অঞ্চলের সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নে অগ্রগতি নেই। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো একই সময়ে সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও ব্যবহারে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
ভারত নিজস্ব কয়লা সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের শক্ত ভিত গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত দেশগুলোও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা, ভূমির সীমাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। সে সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত বানিয়ে বছরের পর বছর সিদ্ধান্তহীনতায় থাকার সুযোগ আর নেই।
বিশ্ব ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে এবং বাংলাদেশও সে পথেই অগ্রসর হচ্ছে। তবে দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমছে, এলএনজি আমদানি বাড়ছে এবং বিদ্যুতের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি দেশীয় কয়লাসহ নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ।
মোস্তফা কামাল: চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)










