মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ববাজার ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার যে সংকট তৈরি করে, তার ফলে দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি ও পরিবহন সংকট বিশ্বকে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে তা আরো প্রকট রূপ নেয়। এ পরিস্থিতি না কাটতেই চলতি বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ বা হরমুজ সংকট আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।
পরিবর্তিত এ বৈশ্বিক জ্বালানি বাস্তবতায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়লা সেক্টর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা, আমদানিনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগ, কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং উন্নত প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারও কয়লা খাতের টেকসই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্ব দেয়া উচিত। পাশাপাশি পরিবেশগত মান কঠোরভাবে অনুসরণ করে আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পায়রা ও রামপালসহ বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কয়লা সরবরাহ চুক্তি করা প্রয়োজন। দরকার কয়লা খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে লজিস্টিক ব্যয় কমানো।
মধ্যমেয়াদে দেশের সম্ভাব্য কয়লা সম্পদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন করা দরকার। পরিচ্ছন্ন কয়লা প্রযুক্তি, উচ্চ দক্ষতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
দরকার আমদানিনির্ভরতা কমাতে পরিবেশসম্মত উপায়ে বড়পুকুরিয়াসহ দেশীয় সব কয়লা খনির উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন খনি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা বাড়াতে পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উন্নত ও অধিক দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা।
দীর্ঘমেয়াদে কয়লাকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং জ্বালানি দক্ষতার সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজের মতো প্রযুক্তি, পরিবেশ পুনর্বাসন এবং টেকসই খনি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। স্পষ্ট করে বলা যায়, জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেয়া ও ধাপে ধাপে কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করাই হবে মূল লক্ষ্য।
সার্বিকভাবে বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট প্রমাণ করেছে যে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাৎক্ষণিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে টেকসই রূপান্তরই বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম কৌশল।
সাফওয়ান সোবহান: চেয়ারম্যান, সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল










