ফজলুর রহমান। স্বনির্মিত সফল শিল্পোদ্যোক্তা। দেশের যে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় উদ্দ্যোক্তা সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় শূন্য থেকে বড় শিল্পগোষ্ঠী গড়েছেন, শিল্পায়নের ভিত তৈরি করে দিয়েছেন তাদের একজন সিটি গ্রুপের প্রয়াত এ চেয়ারম্যান ও বাবস্থাপনা পরিচালক। ১৯৭২ সালে একটি সরিষার তেল প্রস্তুতকারক কোম্পানি হিসেবে সিটি গ্রুপ যাত্রা শুরু করে। তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। বহু মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। দেশের শিল্প-বাণিজ্য, অর্থনীতির বিকাশে তার অবদান অসামান্য। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিক থেকে ছিলেন সাহসী একজন উদ্যোক্তা। উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের কখন কোথায় সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি এসেছে সে সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখতেন। খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে তার হাত ধরেই বাংলাদেশে এসেছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও আধুনিক মেশিনারিজ। পণ্যের মানের ক্ষেত্রে চাইলেই নীতি বিসর্জন দেয়া যায় না বা কম্প্রোমাইজ করা যায় না-এমন ধারণা গড়ে দিয়েছেন কর্মীদের মনোজগতে। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায়ও তিনি অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। সিটি গ্রপের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমানের ব্যবসায়িক দর্শনের এমন অনেক কিছুই উঠে এসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায়-

1

সবসময় বিশ্বাস রাখতেন আধুনিক প্রযুক্তিতে
শেখ বশির উদ্দিন
মাননীয় উপদেষ্টা
বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়

আমাকে উনি অসম্ভব স্নেহ করতেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। অসম্ভব সরল একজন মানুষ। সোজাসাপ্টাভাবে যদি বলেন, সওদা করার জন্য যে বিশ্বাস আর আস্থার দরকার হয় কোনো মানুষের প্রতি, এটা বাংলাদেশে যদি কোনো মানুষের মধ্যে থেকে থাকে, তাহলে তার মধ্যে ছিল। মানুষকে তিনি অসম্ভব আপন করে নিতে পারতেন, ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। এর বিনিময়ে মানুষও তাকে অনেক সম্মান দিয়েছেন। উনার মনটা অনেক বড় ছিল। ব্যবসায়ী হিসেবে এতটুকু বলতে পারি, উনার ৭৫টা প্রতিষ্ঠান উনি তৈরি করেছেন সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তিতে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি শিক্ষিত মানুষ না হলেও বাংলাদেশে তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অনেক আধুনিক। তার প্রতিষ্ঠানের মানুষও উনাকে অসম্ভব সম্মান করতেন।

তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল পিতৃত্বসুলভ। তাকে আমি চাচা বলেই ডাকতাম। বিশ্বাসের জায়গায় আমি তার এবং আমার বাবার (প্রয়াত শেখ আকিজ উদ্দিন) মধ্যে মিল খুঁজে পাই। দুজনের মিলের পাশাপাশি ভিন্ন মৌলিকত্ব ছিল। উনি ভোগ্যপণ্যের ব্যবসাতেই বেশি বিনিয়োগ করেছিলেন। তার মৌলিকত্ব মূলত ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় এককভাবে মনোযোগ ধরে রাখা। মারা যাওয়ার আগের কয়েক বছর ব্যবসায় তিনি বেশকিছু বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছেন। অনেক কিছুই তিনি চালু করেছেন। সবগুলোর সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। বেশ বড় বড় কিছু বিনিয়োগ তিনি করে গেছেন। সবদিক বিবেচনায় উনি খুবই উন্নত স্তরের একজন ব্যবসায়ী ছিলেন।

2

মোস্তফা কামাল
চেয়ারম্যান
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই গেন্ডারিয়ায় সরিষার মিলের মাধ্যমে যে ব্যবসা ফজলুর রহমান শুরু করেছিলেন তখন থেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে তিনি এগিয়েছেন। সংকটের সময়ও দমে না যাওয়া উদ্যোক্তাদের একজন তিনি। একটি শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সারা জীবন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ব্যক্তি হিসেবে অসাধারণ এ মানুষটা আমার আগে ব্যবসা শুরু করলেও একত্রে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি আমরা। একে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করিনি কখনো। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা বিদ্যমান ছিল। প্রযুক্তি আনার ক্ষেত্রে কোনোটা আমরা আগে এনেছি, কোনোটা বা উনি আগে এনেছেন। কারখানার জন্য উপযুক্ত মেশিন নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংকোচহীনভাবে কথা বলে নিতাম দুজন। বিনয়ী ও অমায়িক এ মানুষটি কতটা কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতায় শূন্য থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত করেছিলেন সিটি গ্রুপকে সেটি তাকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন তারাই অনুধাবন করতে পারবেন। তিনি কখনো লোভ করতেন না, কখনো মানুষের অমঙ্গল চাননি। সর্বশেষ একটা কথা বলতে চাই, আমি যতটা কাছ থেকে দেখেছি এটা বলার অবকাশ রাখে না যে প্রয়াত ফজলুর রহমান নিজেই নিজের তুলনা। ওনার সঙ্গে অন্য কারো তুলনা করার মতো কাউকে আমার চোখে পড়ে না। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়েও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান করে গেছেন নিজ হাতে। বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিকাশে একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে তার অবদান সবাই স্মরণ রাখবে। আশা করি সিটি গ্রুপ ফজলুর রহমানের কাজের ধারা অনুসরণ করবে।

3

পবন চৌধুরী
প্রধান উপদেষ্টা
সিটি গ্রুপ

ফজলুর রহমান নামকরা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় আমি আগেই চিনতাম। তবে আমরা যখন ইকোনমিক জোন স্থাপনের উদ্যোগ নেই ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তখন প্রথম সামনাসামনি পরিচয় হয়। এর মাঝে বিশ্বব্যাংক, মেঘনা গ্রুপ, আবদুল মোনেমসহ বেশ কয়েকটি বড় গ্রুপের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম যেন বাংলাদেশে ইকোনমিক জোন করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ফজলুর রহমান সাহেব আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আমাদের দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠায় যারা অগ্রদূত তাদের মাঝে ফজলুর রহমান সাহেব অন্যতম। তার সবচেয়ে ভালো দিক ছিল তিনি ক্লায়েন্টদের সব সময় মানসম্পন্ন পণ্য সময়মতো দেয়ার চেষ্টা করেছেন, দুর্যোগপূর্ণ সময়েও সিটি গ্রুপের সাপ্লাই চেইনে প্রভাব পড়তে দেননি। খাদ্যশস্য ও কাঁচামাল জোগাড় করে কারখানায় প্রসেস করে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া এ বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশে মোটেও সহজ কাজ নয়, যা ফজলুর রহমান সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।

আমি যখন সিটি গ্রুপে যোগদানের প্রস্তাব পাই তখন আমি জানিয়েছিলাম আমি এমন কিছু করতে চাই যা সাধারণত সরকারি চাকরিতে করার সুযোগ পাওয়া যায় না। সিটি গ্রুপের উপদেষ্টা হিসেবে আমি অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করার সুযোগ পাই। চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করে একটি স্কুল ও ব্যবহারের জন্য ৭-৮টি ওয়াশরুম তৈরি করেছে সিটি গ্রুপ। বেশ কয়েকটা প্রাইভেট প্রাইমারি স্কুলেও ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করাসহ স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা করছি আমরা। এ ধরনের কাজে ফজলুর রহমান সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন, যার ফলে মূলত শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ পাল্টে যাচ্ছে। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং আশা করি তার প্রদর্শিত পথ ধরেই সিটি গ্রুপ শুধু ব্যবসায়িক কাজকর্ম নয়, জনকল্যাণমূলক ও সেবামূলক কাজগুলোও ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখবে।

4

আলী রেজা ইফতেখার
এমডি ও সিইও
ইবিএল

আমার ৩৬ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে ফজলুর রহমানের মতো অমায়িক মানুষ দেখিনি। আমার এখনো মনে আছে, আমাকে নৌকার চেয়ারে বসিয়ে উনি ডিঙিতে বসে ওনার ফ্যাক্টরি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এত বড় ব্যবসায়ী হয়েও এত অমায়িক ও ভদ্র মানুষ আগামী ১০০ বছরেও আসবে না। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী পণ্য সুনামের সঙ্গে টিকে থাকবে, এটাই ছিল তার প্রত্যাশা। তার বাসস্থান থেকে সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল মিটফোর্ড আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় দুটিতেই প্রচুর ভিড় থাকায় সময়মতো চিকিৎসা পান না অনেকেই। স্থানীয় গরীব মানুষের সুবিধার্থে নিজের আগের অফিস ভেঙে সেই জায়গায় ব্যাংক থেকে কোনো লোন না নিয়েই পিতার নামে আজগর আলি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেছেন তিনি। হাসপাতালটিতে প্রচুর গরিব মানুষ আসত, যাদের তিনি ফ্রি চিকিৎসাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। যত ছোট বা বড় চিকিৎসাই হোক তার হাসপাতালে আসা রোগীর কাছে টাকা না থাকলেও চিকিৎসা পেতেন। ওনার দুটি অনন্য গুণ ছিল। প্রথমত, উনি ব্যাংকের কোনো প্রকার অর্থ কখনো বকেয়া রাখতেন না। একদিনও দেরি না করে ঋণ ও পাওনা পরিশোধ করে দিতেন। আর দ্বিতীয় বিষয় তিনি পণ্যের মান রক্ষায় কখনো আপস করতেন না। যন্ত্রপাতি, কর্মী ও পণ্যের দিক থেকে সর্বোচ্চ মান রক্ষায় তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী। এখন পর্যন্ত তার সন্তান ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, বাবার মতো তিনিও বিনয়ী। আমি দোয়া করি ওনার সন্তানরা ও প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীরা এ শিল্পের জার্নিটাকে সুন্দরভাবেই এগিয়ে নিয়ে দেশের কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখবেন। বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিকাশে একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে তার অবদান সবাই স্মরণে রাখবে।

5

মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার
পরিচালক
টি কে গ্রুপ

দেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে পর্যায় এসেছে তাতে তার মতো ব্যবসায়ীর অবদানকে গভীরভাবে স্মরণ করতে হবে। উৎপাদন ব্যবস্থায় পণ্যের বিশুদ্ধতা ও গুণগত মান ধরে রাখার বিষয়ে তিনি ছিলেন সচেতন একজন মানুষ। যার কাছ থেকে মিলত উৎসাহ, অনুপ্রেরণা। আমি যখন অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই সবসময় আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। সুন্দর পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ আমার আগে সিনিয়ররাই এ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই নতুনদের স্থান দেয়া কিংবা কাজের পরিবেশ দেয়ার যে মনমানসিকতা ছিল তার, আমি সেটি অনুভব করছি। এ রকম একজন সাহসী ব্যবসায়ী আমার ব্যবসায়িক জীবনেই কম দেখেছি। ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে উদ্যোগ নিতে হয় তার উদাহরণ তৈরি করেছেন প্রয়াত ফজলুর রহমান। সবসময় দেখেছি পণ্য উৎপাদনে টপ কোয়ালিটির মেশিন স্থাপন করতেন। শুধু ব্যবসা নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়েও সচেতন ছিলেন এ শিল্পপতি। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবায় যে উদ্যোগ দেখিয়েছেন সেটাও কজনে পেরেছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার কর্মনিষ্ঠা, একাগ্রতা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। হাজার হাজার কর্মী নিয়ে চলা সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত ফজলুর রহমান ইতিহাসে একটি নাম হয়ে থাকবেন।

6

মোহাম্মদ আমিরুল হক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
প্রিমিয়ার সিমেন্ট

আজ যে ৩০ হাজার বা তারও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হওয়া সিটি গ্রুপ ফজলুর রহমান ভাই প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছেন তার ব্যবসাজীবন কিন্তু শুরু হয়েছিল কৈশোরকালে। তাদের বড় পরিবার। বাবার অসুস্থতার কারণে অল্প বয়সে ব্যবসায় নামতে হয়েছিল তাকে। অনেক কাছ থেকে ফজলুর রহমান ভাইকে দেখার সুযোগ হয়েছে। একের পর এক কারখানা গড়ে তুলেও ক্ষান্ত হননি। বয়সে আমার সিনিয়র এ উদ্যোক্তার সঙ্গে সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত চমৎকার। ওনার বিনয় শিক্ষণীয়, যে কোনো পেশার মানুষকে খুব সম্মান করতেন। এখনকার লোকেরা এতটা পরিশ্রমী না, যতটা উনি ছিলেন। এত বড় ব্যবসা পরিচালনা করেছেন কিন্তু কখনো শুনিনি যে কারো সঙ্গে কোনো কমিটমেন্ট রাখেননি। শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করার মতো না, কিন্তু ব্যবসার বেসিক রুলস জানতেন এবং মানতেন। একদিকে দুর্বল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে এত এতসব নেতিবাচকতার মধ্য দিয়েই ফজলুর ভাই ইন্ডাস্ট্রি করে গেছেন ধারাবাহিকভাবে। এটা বিরল। দেশে এমন অনেকেই আছেন ইন্ডাস্ট্রি করার বেশ সামর্থ্য আছে কিন্তু সাহস নেই কিংবা আগ্রহটুকুও নেই। বেশ কিছুদিন থেকে অসুস্থ ছিলেন কিন্তু কোনো কিছুতে দমে যাননি ফজলুর রহমান। শিল্প স্থাপনের পদক্ষেপ শেষ সময় পর্যন্ত করে গেছেন।

7

মোহাম্মদ ইমরান
পরিচালক (প্ল্যানিং অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট), সিটি গ্রুপ

আমি ২০১১ সালে বুলার বাংলাদেশে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করেছিলাম। সিটি গ্রুপ বুলারের মেশিন আগে থেকেই ব্যবহার করত। সেই সুবাদে দেশে বুলারের অফিস স্থাপনের পর ফজলুর রহমান স্যারের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। ২০১৪-এর শেষদিকে পাঁচ হাজার টন সক্ষমতাবিশিষ্ট বড় একটি সয়াবিন সিড ক্রাশিং প্লান্ট স্থাপন নিয়ে আমাদের প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়, যা শেষ হয় ২০১৬ সালে। এর মাঝে স্যার আমাকে কয়েকবারই অনুরোধ করেছিলেন সিটি গ্রুপে যোগদানের জন্য। স্যার আমাকে তখন এতটাই ভরসা করতেন যে বুলার অফিশিয়ালি ছেড়ে আসার আগেই নতুন সিড ক্রাশিং প্লান্ট বিষয়ে সিটি গ্রুপের হয়ে আমাকেই নেগোসিয়েশন করার দায়িত্ব দেন।

স্যার কখনই চাইতেন না তার মাধ্যমে দেশের বা মানুষের কোনো ক্ষতি হোক। সিড ক্রাশিং প্লান্টটি আমরা মেঘনাঘাটের সিটি ইকোনমিক জোনে বানানোর পরিকল্পনা করছিলাম, কিন্তু সেখানে জায়গা কম থাকায় আমাদের অতিরিক্ত জমি কিনতে হতো। যেই জায়গায় আমরা প্লান্টটি বানাতে চেয়েছিলাম তার পাশে জেলেরা থাকতেন, জায়গাটিকে জেলেপাড়া বলে। তাদেরকে জায়গা ক্রয় করার প্রস্তাব দেয়া হলে তারা খুশিমনেই রাজি হলো। স্যার তখন জানালেন, তিনি জেলেপাড়ার মানুষদের জমি সেখানকার প্রচলিত দামের চেয়ে অন্তত ৩০ গুণ বেশি দামে ক্রয় করবেন যাতে তারা চাইলে ঢাকায়ও জায়গা কিনতে পারবে। খুশিতে সেই মানুষগুলো কান্না করেছিল তখন। প্লান্টের কাজ শুরুর পর একদিন আমরা জায়গাটা ঘুরে দেখতে গেলাম। জায়গার কিছু অংশ ছিল নদীর মাঝে, বাউন্ডারি দেয়াল আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম নদীর পাড় থেকে প্রায় ১০-১২ বারো ফুট দূরে পানিতে ডুবে আছে। তখন স্যার বললেন, আমরা বাউন্ডারি দেয়াল পর্যন্ত যাব না, নদীর পাড় পর্যন্ত থাকব। নদী বড় থাকলে দেশের সুবিধা হবে। এমনই ছিল এ মানুষটার চিন্তাভাবনা।

তিনি কখনো লোভ করতেন না, কখনো মানুষের অমঙ্গল চাইতেন না। আমাদের প্লান্ট যে-ই দেখতে আসতে চাইতেন তিনি কখনো বাধা দিতেন না। প্রতিযোগী কেউ হলেও তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-উদারতা রক্ষায় তিনি সব সময় সচেষ্ট থাকতেন। সিটি গ্রুপের যেকোনো পণ্য তৈরিতেই সবচেয়ে মানসম্পন্ন কাঁচামাল ব্যবহার হতো।

মৃত্যুর আগে ফজলুর রহমান এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে নিজে আর ফ্যাক্টরিতে যেতে পারতেন না। সেক্ষেত্রে আমিই যেতাম এবং এসে স্যারকে আপডেট জানাতাম। তখনো তিনি আমার কাছে শুনে খুব দ্রুত সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি জানাতেন। কাজের বাইরেও পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অনেক আলাপই হতো স্যারের সঙ্গে আমার রাত জেগে। তিনি ছিলেন আমার অভিভাবকের মতো। স্যার চলে যাওয়ায় আমি একজন অভিভাবকের অভাববোধ করি সব সময়।

8

মো. মাহবুবুর রহমান
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
এইচএসবিসি ব্যাংক

আমার সঙ্গে ওনার পরিচয় প্রায় ২৫ বছরের। উনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন—এটা সম্ভব। শুধু কাজ নয়, বাংলাদেশের সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও উনি একই রকম আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ঝড়ঝাপ্টা, প্রতিবন্ধকতা যা-ই আসুক না কেন, সম্ভাবনা দেখতেন তিনি। ফজলুর রহমান অনেক মানুষের সঙ্গে মিশেছেন এবং অনেক বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন।

পারস্পরিক একটি শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক তৈরি করতে যা লাগে—মানুষকে সম্মান দেয়া, সম্মান জানানো, গুণাবলির দিকে খেয়াল করা, এর মাধ্যমে সবার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করার বিষয়টি তিনি জানতেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল। কীভাবে সম্মান দিতে হবে মানুষকে সেটা তিনি জানতেন। এটা শুধু যাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে সে হিসেবে নয়। গেন্ডারিয়া থেকে দেখেছি, শান্তিনগরের বাড়ি থেকে দেখেছি, কারখানার কর্মচারী থেকে শুরু করে এলাকাগত বন্ধু-বান্ধবের ক্ষেত্রেও সেটা দেখেছি...। পুরো ব্যাপারটাকে তিনি অন্তরে ধারণ করতেন। তার প্রতিশ্রুতি, কমিটমেন্ট ও প্রতিশ্রুতি রাখার যে সংকল্প; সেটা যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সে বিষয়ে তিনি খুব সচেতন থাকতেন। আমি একটি কথা দিয়েছি, একটা কথা বলেছি, কথাটা রাখা দরকার—এটাকে উনি খুব গুরুত্ব সহকারে নিতেন। এমন নয় যে দুইটা রাখলাম, তিনটা রাখলাম না। আমি ধারাবাহিকভাবে এ রকম মনোভাব দেখেছি।

পণ্যে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা এবং তা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তিনি মনে করতেন, গুণগত মান বজায় রাখতে পারলে ভোক্তারা মূল্যায়ন করবে। তাই উনার ধারাবাহিকতাটা ছিল খুব স্পষ্ট।

মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন। কর্মই ধর্ম বলে জানতেন। বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সেরাটি তার চাই এবং সে প্রত্যাশা পূরণে নিজে দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন তার সহকর্মীদের নিয়ে। সেটি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার ব্যাপারে সহায়ক ছিল, আবার পণ্যের উৎপাদন খরচ যদি কমানো যায় সেটার দিকেও খেয়াল রাখতেন যাতে ভোক্তারা উপকৃত হন।

9

নাসের এজাজ বিজয়
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ

২০০৮ সালের দিকে জিনিসপত্রের দরপতন হয়। তখন আমি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের কান্ট্রি হেড অব ক্রেডিট হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তখন বাইরে থেকে ফেরত এসেছি। বিশ্লেষণ করে দেখলাম, এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে ব্যবসায়ী ফজলুর রহমানকে কিছুটা চাপের মুখে পড়তে হবে। তাই উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। উনি আমাদের স্যার বলতেন, আমরাও স্যার বলতাম। আমি বললাম—স্যার, আপনার যদি চাপ হয়ে যায় তাহলে চিন্তা করবেন না, আমরা সময় বাড়িয়ে দেব। প্রতি-উত্তরে তিনি বললেন—স্যার, আপনি যে আসছেন এটাই অনেক বেশি। আমি চেষ্টা করব, না করতে।

আমি বসা থাকা অবস্থায় ফজলুর সাহেবকে একজন ফোন দিল। ব্যাংক থেকে সুদ মওকুফের জন্য সাহায্য করতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু ওনার স্পষ্ট জবাব, তিনি পারবেন না। সেই সঙ্গে বললেন—দেখেন, আমি যখন বেশি লাভ করেছি, তখন তো ব্যাংককে আমি বেশি ইন্টারেস্ট দিইনি। এখন যখন লোকসান হচ্ছে, তার দায় ব্যাংকের ওপর চাপাব কেন?

ফজলুর রহমানের দুটি বিষয় ছিল—প্রতিশ্রুতি ও বিনয়। তিনি সবসময় ঋণের টাকা সময়ের আগেই পরিশোধ করতেন। পাঁচ বছর মেয়াদি ঋণ দুই-তিন বছরের মধ্যেই দিয়ে দিতেন। কোনো সময় এ বিষয়ে অহংকার কাজ করেনি। ব্যবসার ভালো-খারাপের সঙ্গে উনার প্রতিশ্রুতি ও বিনয়ের ওঠানামা দেখিনি। এটা সবসময় ফিক্সড থাকত। উনি যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, দীর্ঘ সময় ধরেই করেছেন। সবসময় তিনি ভালো কাজের সঙ্গে থাকতে চাইতেন।

আমি তার বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ও আত্মবিশ্বাসকে গভীরভাবে প্রশংসা করতাম। তিনি স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাগুলো দেখতে পারতেন। সেই কারণে, তিনি সবসময় বিশ্বের সেরা মেশিনারিতে বিনিয়োগ করতেন, যাতে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমানের পণ্য নিশ্চিত করা যায়।

10

শেখ মোহাম্মদ মারুফ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ঢাকা ব্যাংক

আমার সঙ্গে ফজলুর রহমান স্যারের পরিচয় প্রায় ১২-১৩ বছরের। ২০১১ সালে আমি সিটি ব্যাংকে চাকরি করতাম। আমার অফিস সে সময় গেন্ডারিয়ায় ছিল। সেই সূত্রে আমার ওনার সঙ্গে পরিচয়। তখন থেকেই আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হতো। আমার যেটা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে উনি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন, মানুষকে অনেক সম্মান করতেন। বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি প্রত্যকেটা মানুষকে সম্মান করতেন এবং সময় দিতেন—এটা আসলে রিমার্কেবল। এটা সবার মধ্যে দেখা যায় না। শেষের দিকে তিনি যখন অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে হাঁটতেন তখনো তিনি ব্যবসায়িক নানা দিক নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন। সেই মুহূর্তেও তার কাজ করার ব্যাপারে এবং নতুন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে আগ্রহের কমতি ছিল না। এটা অবশ্যই তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে আমি মনে করি এবং এ কারণে এ প্রতিষ্ঠান এত সফল। তিনি কতটা আন্তরিক এবং তিনি এ ব্যবসা কীভাবে শুরু করেছেন তা সবারই জানা। বাংলাদেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি হলো ওনার প্রতিষ্ঠান। উনি যে যে জায়গায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছেন, সেসব জায়গায় বিনিয়োগের কথা আগে কেউ চিন্তাও করেনি। তার প্রতিটা বিনিয়োগই কার্যকর ছিল।

তিনি বুঝতেন সিটি গ্রুপ ও ব্যাংকগুলোর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত। তিনি ব্যাংকের কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কতটা জরুরি সেটা বুঝতেন। ব্যাংকের সঙ্গে তার লেনদেন মসৃণ ছিল। তার প্রধান গুরুত্বের জায়গা ছিল ব্যাংকের দেনা সঠিক সময়ে শোধ করা। আমরা সিটি গ্রুপের সঙ্গে নিশ্চিন্তে ব্যবসা করি। যদি আপনার কোনো ব্যাংকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে এবং ব্যাংক বোঝে যে যেকোনো পরিস্থিতিতে ব্যাংকের সঙ্গে আপনি লেনদেন ঠিক রাখবেন, তাহলে ব্যবসায় বিনিয়োগ ও মূলধনের কোনো অভাব হবে না। ব্যাংক আপনার পাশে থাকবে। এ সম্পর্ক এখনো চলমান রয়েছে। ওনার অতি সাধারণভাবে চলাফেরার বৈশিষ্ট্যটি তার ছেলেমেয়েদের মাঝেও আছে। মানুষকে সম্মান দেয়ার যে ব্যাপারটি সেটিও আছে। এ বিষয়গুলো থাকা জরুরি। এখনো আমরা এ গ্রুপকে সমপরিমাণ সমর্থন দিয়ে আসছি। আমরা আশা রাখি এ প্রতিষ্ঠান আগামীতে নতুন উচ্চতায় যাবে।