সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও দাম একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর সমাধান কী হতে পারে?

নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রমোট করতে হলে আমাদের সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে। এখানে মূলত তিনটি উপায়ে কাজ করা যায়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে টেন্ডারের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ; সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে (রুফটপ) সোলার প্যানেল বসানো, যাতে প্রতিষ্ঠান নিজেই উপকৃত হয়। এক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ‘নেট মিটারিং’ নীতিমালার আওতায় সোলার স্থাপন করা।

বর্তমানে সাধারণ ক্যাপটিভ পাওয়ারে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ খরচ গড়ে ১৫ টাকার মতো পড়ে। এ বিদ্যুৎ যদি ৮-৯ টাকায় উৎপাদন করা যায়, তবেই কেবল তা সরকার ও জনগণের জন্য লাভজনক হবে। সমস্যা হলো সোলার প্যানেলের প্রাথমিক বিনিয়োগ পে-ব্যাক বা ব্যয় উঠে আসতে প্রায় ১০-১২ বছর সময় লেগে যায়। এরপর উৎপাদন কিছুটা কমলেও প্রজেক্টটি পরবর্তী ২০ বছর পর্যন্ত লাভজনক থাকে। এক্ষেত্রে সরকার প্রণোদনা দিতে পারে। যারা বড় বড় দালানকোঠা বানিয়েছেন, তাদের উৎসাহিত করতে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে সরকার যেমন আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেয়, ঠিক তেমনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তাদেরও যদি দেড়-দুই শতাংশ প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়া হয়, তবে এ খাতটি দ্রুত বিকশিত হবে। সাধারণ মানুষ ও উদ্যোক্তারা যখন দেখবে এতে অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ কমছে, তখন তারা ব্যাপকভাবে এতে আগ্রহী হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সরকারকে জ্বালানির পেছনে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়, তা অনেকটাই কমে আসবে।

সাসটেইনেবল ব্যাংকিং ও গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে পূবালী ব্যাংকের বিনিয়োগ কেমন?

সাসটেইনেবল ব্যাংকিংয়ের আওতায় আমাদের বেশ কয়েকটি মূল খাতে কাজ করতে হয়, যার মধ্যে পরিবেশ রক্ষা অন্যতম। আন্তর্জাতিক ফান্ডের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট (বিআইআই) পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম ৫০ মিলিয়ন ডলারের জলবায়ু অর্থায়ন করেছিল। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে ১০০ মিলিয়ন ডলারের দেশের প্রথম সাত বছর মেয়াদি গ্রিন বন্ড ইস্যু নিয়ে কাজ চলছে। এছাড়া আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজের এলসি খোলার ক্ষেত্রে ‘ইউপাস এলসি’র মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে চার বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার ব্যবস্থা করেছি। পাশাপাশি ইন্টারকো সোলার ও ডাইনামিক সোলারের মতো দেশের বড় বড় রুফটপ সোলার প্রজেক্টগুলোতে পূবালী ব্যাংক সরাসরি অর্থায়ন, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং ও সিন্ডিকেশন করেছে। আমাদের মোট বিনিয়োগ বা ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ টেকসই অর্থায়নের আওতায় পড়ে।

আমাদের উদ্যোক্তাদের একটা ইতিবাচক মানসিকতা আছে। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্লাটিনাম লিড সার্টিফায়েড অর্গানাইজেশনের দিক দিয়ে আমাদের অবস্থান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষে। আমরা ৩৫-৩৬ নম্বর অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কেন এত প্লাটিনাম সার্টিফিকেশন? কারণ আমাদের উদ্যোক্তাদের মানসিকতা এমন যে তারা বিশ্বের সেরা যন্ত্রটাই আনতে চান। আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা যখন টেক্সটাইল বা রড শিল্পে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করেন, তখন তারা ইউরোপ বা জার্মানির সেরা ও অন্তত ২০ শতাংশ বেশি এনার্জি এফিশিয়েন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। ফলে এ বিনিয়োগগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই টেকসই অর্থায়নের আওতায় চলে আসে। আর নির্দিষ্টভাবে ‘গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ে’র কথা বললে তা মোট বিনিয়োগের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ।

পরিবেশ-সংক্রান্ত ইস্যুর কারণে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। একই বিষয়ে কমপ্লায়েন্সের জন্য আমাদের গার্মেন্টসেরও অনেক বিনিয়োগ করতে হয়েছে। শিল্পায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যকার জটিলতায় ব্যাংক খাত ও সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

এটি মূলত একটি ‘ট্রেড-অফ’। শিল্পায়নের প্রয়োজনে কখন পরিবেশে কিছুটা ছাড় দিতে হবে এবং পরিবেশ রক্ষায় কখন শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সরকারের। প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সময় ইংল্যান্ডের টেমস নদী মারাত্মক দূষিত হয়েছিল, কারণ তখন তারা শিল্পায়নকে প্রাধান্য দিয়েছিল। কিন্তু আজ ছাড়পত্র ছাড়া সেখানে কিছুই করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা নদী যদি সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে বা নিউইয়র্কের নদীর মতো পরিচ্ছন্ন হতো, তবে পর্যটন ও বিনোদন খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় হতো। অনিয়ন্ত্রিত যেসব ছোট ছোট শিল্প নদী দূষণ করছে, তাদের কর বা রাজস্বের চেয়ে এ নদীর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। এর সমাধানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) অত্যন্ত জরুরি। সরকার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে শিল্প-কারখানার বর্জ্য অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট সেন্ট্রাল লাইন বা পাইপলাইন নির্মাণ করতে পারে এবং তার খরচ পরিবেশ কর হিসেবে কারখানার ওপর ধার্য করতে পারে।

ব্যাংক ও অন্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিএসআর ফান্ড থেকে নদীর তীরবর্তী আধা কিলোমিটার বা নির্দিষ্ট অংশ সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে পারে। যেমন পূবালী ব্যাংক সম্প্রতি বরিশাল মেডিকেল কলেজের সামনের একটি পরিত্যক্ত ও নোংরা জায়গায় সিএসআর ফান্ড থেকে ফোয়ারা, হাঁটার রাস্তা ও গাছ লাগিয়ে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। ৫০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান যদি আধা কিলোমিটার করে দায়িত্ব নেয়, তবে ২৫ কিলোমিটার নদীকূল সহজেই পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে।

এক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

কেবল করপোরেট বা সরকার নয়, স্থানীয় অধিবাসীদেরও যুক্ত করা যাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরার নতুন গড়ে ওঠা সেক্টরগুলোতে অনেক বিত্তশালী বাসিন্দা থাকেন। স্থানীয় ওয়েলফেয়ার সংগঠনগুলোকে যদি নির্দিষ্ট এলাকা বা রাস্তা সাজানো ও পরিবেশবান্ধব করার দায়িত্ব দেয়া হয় এবং সেখানে স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের সৌজন্য নামফলক ঝুলিয়ে দেয়া হয়, তবে তারা নিজেদের উদ্যোগেই কাজগুলো সুন্দরভাবে করবে। কাউকে বাধ্য না করে রিকগনিশন বা সামাজিক স্বীকৃতি দিলেই মানুষ এগিয়ে আসবে।

দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই এখন বড় বিষয়। সম্প্রতি আমরা পূবালী ব্যাংকের আমানত ১ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার একটি ক্যাম্পেইন চালিয়েছিলাম। ক্যাম্পেইন শেষে দেখা গেছে, আমাদের আমানত ১ লাখ ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ অল্প সময়েই প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। এ বছর এরই মধ্যে আমাদের আমানত ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে, যা বছর শেষে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে বলে আশা করছি। যেখানে অনেক ব্যাংকের মোট আমানতই ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারছে না, সেখানে রিটেইল গ্রাহকদের থেকে পূবালী ব্যাংকের এ আমানত বৃদ্ধি আমাদের ওপর জনগণের গভীর আস্থার প্রমাণ দেয়।

আর সার্বিকভাবে চিন্তা করলে সামষ্টিক অর্থনীতির সংস্কার রাতারাতি দৃশ্যমান হয় না। নীতি পরিবর্তন করলেই পরদিন ফল পাওয়া যাবে না, সময় লাগবে। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন বা আমেরিকা-ইসরায়েল ইস্যুতে এক ধরনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলছে, যা আমাদের ভোগ্যপণ্য, সার ও জ্বালানি আমদানিতে প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক এ‌ সংকটগুলো আমাদের একক নিয়ন্ত্রণে নেই। এ বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে যদি আমরা সূচকের সামান্য উন্নতিও দেখি, তা অনেক বড় বিষয়। তবে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাত ও অর্থনৈতিক সংস্কারের যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হচ্ছে, তার ধারা ইতিবাচকই বলা যায়। এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি অবশ্যই স্থিতিশীল রূপ নেবে।

Climate Change and Realignment of Economy-Pubali Bank-P7 online