গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে আপনাদের ব্যাংকের অর্থায়ন কত? এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা কী?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘সাসটেইনেবিলিটি রেটিংয়ে দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের একটি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভ করেছে এনসিসি ব্যাংক পিএলসি। গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা এবং এ খাতগুলোয় অর্থায়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের ফলে ব্যাংকটি এ স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
এনসিসি ব্যাংক ২০২৫ সালে সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স খাতে ১৭,০০৫ দশমিক ৩৩ কোটি টাকা (যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ১৭৮ দশমিক ৫১ শতাংশ) এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৭,৪১৩ দশমিক ১৫ কোটি টাকা (যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৭৩ দশমিক ১৯ শতাংশ) ঋণ/বিনিয়োগ বিতরণ করেছে। আর্থিক খাতে সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি সত্ত্বেও ব্যাংকটি ২০২৫ সালে গ্রিন ফাইন্যান্স খাতে ৬৬৯ দশমিক ১৯ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ৪২৫ কোটি টাকারও বেশি অর্থায়ন করেছে।
ভবিষ্যতে এনসিসি ব্যাংকের লক্ষ্য হলো গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বহুমুখী পণ্যভিত্তিক অর্থায়ন এবং খাতগুলোয় ঋণ বিতরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। এ লক্ষ্যে ব্যাংকটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্প চিহ্নিতকরণ, শাখা পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উপযুক্ত অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা ও ঋণের মান ধরে রাখতে আপনাদের ব্যাংক কতটা প্রস্তুত?
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্যাংক খাতে ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে, ব্যবসার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই এনসিসি ব্যাংক জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নকে দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় এনসিসি ব্যাংক জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টগুলো বাস্তবায়ন, বাংলাদেশ সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা পরিপালনে সচেষ্ট রয়েছে। ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় গ্রাহকের ব্যবসার ধরন, প্রকল্পের অবস্থান, পরিবেশগত প্রভাব, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি এবং ঝুঁকি প্রশমনের ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। পাশাপাশি ঋণ/বিনিয়োগ বিতরণের সময় গ্রাহকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, নগদ প্রবাহ ও ঋণ/বিনিয়োগ পরিশোধের সক্ষমতাও পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এনসিসি ব্যাংক জলবায়ু সম্পর্কিত ঝুঁকি ও সুযোগ মূল্যায়ন এবং গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ পরিমাপ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করছে যার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন, নিঃসরণ হ্রাসে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এনসিসি ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ঋণ/বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জলবায়ু ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট তথ্যের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি জলবায়ু ঝুঁকির সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে এবং ঋণমান রক্ষায় আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে গ্রাহকদের কী ধরনের ঋণসুবিধা দিচ্ছেন?
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে এনসিসি ব্যাংক বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব স্থাপনাসহ অন্যান্য খাত।
ব্যাংকটি নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় যোগ্য গ্রাহক ও প্রকল্পের জন্যও রেয়াতি হারে ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করছে। এনসিসি ব্যাংক এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক পরিচালিত নতুন চারটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ সব পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় যোগ্য গ্রাহকদের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সবুজ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় দেশব্যাপী ১৭ জন গ্রাহকের অনুকূলে মোট ৮০ দশমিক শূন্য ৮ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান করেছে।

ছবি: এনসিসি ব্যাংক
এনসিসি ব্যাংক মনে করে, গ্রিন ফাইন্যান্সের মূল উদ্দেশ্য শুধু পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ/বিনিয়োগ বিতরণ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে গ্রাহকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা, পরিচালন ব্যয় হ্রাস করা, জ্বালানির অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো। উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন বা জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে তার জ্বালানি ব্যয় কমে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও হ্রাস পায়।
গ্রিন ফাইন্যান্সের প্রসারে ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন?
গ্রিন ফাইন্যান্সের প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এনসিসি ব্যাংক পিএলসি এসব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছে এবং এগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে সাসটেইনেবল ও গ্রিন ফাইন্যান্স কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন-সংক্রান্ত নীতিমালা এবং বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ব্যাংকটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন সম্প্রসারণে কাজ করছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা যোগ্য গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বন্ধ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গ্রামীণ ও স্থানীয় শিল্প খাত, রফতানি বহুমুখীকরণ খাত, গ্রিন ফ্যাক্টরি বিল্ডিং ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, এনসিসি ব্যাংক তা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এনসিসি ব্যাংক মনে করে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং আর্থিক খাতের কার্যকর অংশগ্রহণের সমন্বয়ে গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সের পরিধি আরো প্রসারিত হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে আপনাদের ব্যাংকের পরিকল্পনা কী?
আগামী পাঁচ বছরে এনসিসি ব্যাংক এমন অর্থায়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে চায়, যা একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখবে। এনসিসি ব্যাংক মনে করে, টেকসই ব্যাংকিং মানে শুধু পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন নয়; বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, সম্পদসাশ্রয়ী ও জলবায়ু সহনশীল করে তোলা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব শিল্প এবং শিল্প-কারখানার পরিবেশগত মান উন্নয়নকল্পে এনসিসি ব্যাংক বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি সক্ষমতা উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখাসহ উৎপাদনশীল খাতগুলোতে দায়িত্বশীল অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর আরো গুরুত্ব প্রদান করবে। এছাড়া ব্যাংকটি ঋণগ্রহীতাদের পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আরো জোরদার করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
ব্যাংকটি ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, নিজস্ব কার্যক্রমে কাগজের ব্যবহার কমানো, বাংলা কিউআর প্রসারের মাধ্যমে ক্যাশলেস সোসাইটি গঠন, জ্বালানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং পরিবেশগত প্রভাব পরিমাপের মতো বিদ্যমান উদ্যোগগুলোকে আরো বেগবান করবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, টেকসই অর্থায়ন ভবিষ্যতের কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; এটি দায়িত্বশীল ব্যাংকিং ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। এনসিসি ব্যাংক পিএলসি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সমুন্নত রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবিলিটি রেটিংয়ে তার অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।










