কভিড-১৯ বিশ্বমারী বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে সংক্রামক রোগ শনাক্ত, প্রতিরোধ ও মোকাবেলার সক্ষমতা সন্ধানের প্রশ্নটি একেবারে সামনে এনেছে। সংক্রামক ব্যাধি সরাসরি বিশ্বমারী বা প্যানডেমিকে পরিণত হয় না। প্রথমে তা প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেক আকারে আত্মপ্রকাশ করে। সংক্রামক ব্যাধি পূর্বপরিচিত হতে পারে, আবার অজানাও হতে পারে। প্রাদুর্ভাব যদি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর সংখ্যা ও হার যদি অন্য সময়ের তুলনায় তাত্পর্যপূর্ণভাবে বেশি হয় তাহলে তাকে মহামারী বা এপিডেমিক বলা যেতে পারে। আর মহামারী যদি একাধিক মহাদেশে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অঞ্চল বা রিজিয়ন) বিস্তৃত হয় তবে তাকে বিশ্বমহামারী বা প্যানডেমিক বলা যেতে পারে। মহামারী পরিস্থিতি ঘোষণা করার এখতিয়ার দেশীয় কর্তৃপক্ষের, আর বিশ্বমারী ঘোষণা করার এখতিয়ার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। তবে এর আগের ধাপে কোনো অসুস্থতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার হুমকি সৃষ্টি করলে তাকে ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি’ (পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন) বলে ঘোষণা করা হয়। যেমন মার্স-করোনা কিংবা ইবোলা রোগ দুটি জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিক জরুরি পরিস্থিতি বলা হয়েছে, কিন্তু প্যানডেমিক বলা হয়নি। কিন্তু কভিড-১৯ অতিদ্রুত এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (থাইল্যান্ড) হয়ে ইউরো অঞ্চলে (ইতালি) ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে প্যানডেমিক বা বিশ্বমারী ঘোষণা করে।

২০২০ সালে যখন কভিড-১৯ বিশ্বমারী শুরু হয় (তখন এর নাম ছিল নভেল বা নতুন করোনাভাইরাস), তখন খোঁজ পড়ে এ ধরনের বিশ্বমারী ঠেকাতে আমাদের দেশ কতটুকু প্রস্তুত? গোটা বিশ্বই বা কতটুকু প্রস্তুত? বিশ্বমারী মোকাবেলায় একটি দেশের কতটুকু প্রস্তুতি রয়েছে সেটা পরিমাপের জন্য ১০ জানুয়ারি ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি পর্যালোচনা মানদণ্ড প্রকাশ করে। এরপর ২৭-০৫-২০২০ তারিখে অনুরূপ আরেকটি নির্দেশনা প্রকাশিত হয়। নির্দেশনাগুলো অনেকটা নিম্নরূপ:

এক. রোগ শনাক্তকরণের জন্য ল্যাবরেটরির সক্ষমতা; রোগী খুঁজে বের করার জন্য সার্ভিলেন্স ও ঝুঁকি পরিমাপের সক্ষমতা; রোগী শনাক্ত হলে তার রোগতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা করার জন্য র্যাপিড রেসপন্স টিমের উপস্থিতি। (দুই) পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য নেতৃত্ব ও সমন্বয়; মানুষকে ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো; আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ ব্যবস্থাপনা; রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা; সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম; সামগ্রী সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা।

এক নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত কাজগুলোর জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা ২০০৭ সাল থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ২০০৭ সালে এ দেশে মুরগির খামারে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। তখন থেকেই মহামারী মোকাবেলার প্রস্তুতি নেয়া হয়। তবে কভিড-১৯-এর মতো এত ব্যাপক আকারের মহামারী মোকাবেলার মতো খুবই অপর্যাপ্ত জনবল, সামগ্রী ও সম্পদ বিদ্যমান ছিল। কর্তৃপক্ষ জনবল ও সম্পদের ঘাটতি পূরণ না করে নিজেরাই এসব কাজের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয় এবং ঠিকাদারদের মাধ্যমে অপেশাদার মানুষ ও সংস্থা দিয়ে সে কাজগুলো করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে, অব্যবস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

দুই নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত কাজগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ—বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরে করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। কিন্তু এখানেও জনবল, সামগ্রী ও সম্পদের বিরাট ঘাটতি ছিল। সে ঘাটতি অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে পূরণ করা হয়। নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে আইইডিসিআর ও পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব ও সমন্বয় ক্রমান্বয়ে দেশের প্রচলিত প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যস্ত হয়। প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামোয় নেতৃত্ব ও সমন্বয় ন্যস্ত হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতি আসে, তবে রোগতাত্ত্বিক ও জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানের প্রাধান্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেছনে চলে যায়।

মানুষকে ঝুঁকি সম্পর্কে জানানোর বিষয়ে গণমাধ্যম খুবই প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ঝুঁকি জানানো কার্যক্রমের সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।

রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রথম দিকে খুবই সমস্যাক্রান্ত ছিল। এখন সেটা অনেকটা কাটিয়ে ওঠা গেছে। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে এখনো অনেক কিছু করতে হবে। সামগ্রী সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় মারাত্মক দুর্বলতা ছিল। এখন সেটা সংশোধন করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে।

কভিড-১৯ বিশ্বমারী প্রস্তুতি ও মোকাবেলায় বাংলাদেশের পরিকল্পনা

কভিড-১৯ বিশ্বমারী নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে ২০২০-এর এপ্রিল-মে মাসে প্রস্তুতি ও মোকাবেলা পরিকল্পনা (বিপিআরপি) প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তা হালনাগাদ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এর উদ্দেশ্য, মহামারীর বিভিন্ন পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা, কাজের ক্ষেত্র, অগ্রাধিকার ক্ষেত্র প্রভৃতি। এ বছর পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্তম্ভগুলো অনুসরণ করে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা অনুসরণ করে সরকার দেড় বছর ধরে কভিড-১৯ বিশ্বমারী ব্যবস্থাপনা করে আসছে।

স্তম্ভগুলো হলো (এক) সমন্বয় ও নেতৃত্ব: স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি ও কারিগরি পরামর্শক কমিটি; স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহাপরিচালকের নেতৃত্বে বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি রয়েছে। বিশ্বমারী বাংলাদেশে গণসংক্রমণ পর্যায়ে প্রবেশ করার পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সরাসরি নেতৃত্ব প্রদান করছে এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাস্তবায়নে নেতৃত্ব প্রদান করছে। দুই. নজরদারি ও ল্যাবেরটরি: কভিড-১৯ নজরদারি ব্যবস্থা পরিচালনা ও শনাক্তের জন্য আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরিগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আইইডিসিআরের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নজরদারি ব্যবস্থার সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন। আগে থেকেই চালু থাকা ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারি ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। উল্লেখ্য, রোগের প্রাদুর্ভাব, মহামারী ও বিশ্বমারী শনাক্ত, প্রতিরোধ ও মোকাবেলার জন্য নজরদারি ও দ্রুত মোকাবেলার জন্য সরকারিভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আইইডিসিআর। তিন. রোগীর সংস্পর্শের ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও গণসংক্রমণ নিবারণ: সংস্পর্শ শনাক্ত করার জন্য আইইডিসিআর ন্যাশনাল র্যাপিড রেসপন্স টিমের (আরআরটি) মাধ্যমে, জেলায় সিভিল সার্জন জেলা আরআরটির মাধ্যমে, উপজেলায় ইউএইচএফপিও উপজেলা আরআরটির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে। সংস্পর্শিত ব্যক্তিদের সঙ্গনিরোধ করে রাখার (কোয়ারেন্টিন) কাজটি স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে যৌথভাবে জনপ্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ করে। চার. আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ ও সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টিন): আকাশ, নৌ ও স্থলবন্দরে যাত্রী আগমন ও বিদেশগামীদের স্বাস্থ্য নজরদারির দায়িত্ব পালন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনা করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। পাঁচ. সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: হাসপাতাল, স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, লোকালয়, মরদেহ দাফনসহ প্রতিটি স্থানেই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। ছয়. কভিড-১৯-এর চিকিৎসা ও টেলিমেডিসিন: চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দানকারীর জন্য কভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে তা কয়েকবার হালনাগাদ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইইডিসিআর, এমআইএস, স্বাস্থ্য বাতায়ন হটলাইন চালু রেখে অবিরাম স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে আসছে। সাত. কভিড-১৯-এর পাশাপাশি অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিসেবা প্রদান অব্যাহত রাখা: বিশ্বমারীর প্রথম দিকে ও সর্বোচ্চ সংক্রমণকালে অন্যান্য রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হলেও কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ক্রমান্বয়ে তা চালু করেছে। আট. সংগ্রহ, রসদ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা: মহামারীকালে ল্যাবরেটরি রসদ, পিপিই, আইসিইউ সরঞ্জাম, হাই ফ্লো অক্সিজেন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জোগান অব্যাহত রাখা বিরাট চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় মেডিকেল ভাণ্ডার ও হাসপাতালগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য হালনাগাদ করে। নয়. জনগণকে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে মহামারী নিয়ন্ত্রণে তাদের সম্পৃক্ত করে সক্রিয় করা: বিশ্বমারীর শুরুর দিকে আইইডিসিআর প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে হালনাগাদ তথ্য প্রদান করত। পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হতে সংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা করেন এবং বর্তমানে প্রতিদিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য প্রদান অব্যাহত আছে। এখন সপ্তাহে দুদিন অনলাইনে প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মহামারী মোকাবেলায় জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন পর্যায়ের সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ও স্বেচ্ছাসেবক তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মহামারী মোকাবেলায় জনগণকে সম্পৃক্ত করার কাজ অব্যাহত আছে। টিকাদান কর্মসূচিতেও জনসম্পৃক্ততার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। দশ. গবেষণা: কভিড-১৯ বিশ্বমারী পরিস্থিতি অনুধাবন, রোগের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সবলতা ও ঘাটতি পর্যালোচনা, নতুন ওষুধ ও টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা করার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া মহামারী নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর এককভাবে ও যৌথভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা পরিচালনা করছে এবং কয়েকটি গবেষণার অন্তর্বর্তী ফলাফল প্রকাশ করেছে। কভিড-১৯ সম্পর্কিত গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ মঞ্জুরি বিতরণ ও অনুমোদন করছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এগারো. কভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচি: ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। মে-জুলাই সময়ে বিদেশ থেকে টিকা সরবরাহ না থাকায় টিকাদান গতি মন্থর হয়ে পড়লেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আগস্ট থেকে আবার গতি লাভ করেছে। দেশেও টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বারো. কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থান করা মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) মাঝে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলা: জাতীয় পরিকল্পনার সাথে সংগতি রেখে রোহিঙ্গাদের মাঝে কভিড-১৯ বিশ্বমারী প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কাজ চলছে। বিশ্বমারীর শুরু থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝে সংক্রমণ অপেক্ষাকৃত কম থাকলেও দেশব্যাপী দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ বছরের আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝে ব্যাপক টিকাদানের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

উল্লিখিত স্তম্ভগুলোর মধ্যে নজরদারি ও ল্যাবেরটরি, রোগীর সংস্পর্শ ব্যক্তি শনাক্তকরণ ও গণসংক্রমণ নিবারণ, আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ ও সঙ্গনিরোধ—তিনটি স্তম্ভ হচ্ছে বিশ্বমারী নিয়ন্ত্রণের রোগতাত্ত্বিক মোকাবেলার অন্তর্গত। এগুলোর সার্বিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে কভিড-১৯ সংক্রমণ কমানো। এটা করার জন্য রোগতাত্ত্বিক অস্ত্রগুলো কাজে লাগানো, যেমন—রোগীর সংস্পর্শ ব্যক্তি শনাক্তকরণ, নজরদারি, সঙ্গনিরোধ ও পৃথকীকরণ (আইসোলেশন)।

বিশ্বমারী নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যসেবা দানের অন্তর্গত স্তম্ভগুলো হচ্ছে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, কভিড-১৯-এর চিকিৎসা ও টেলিমেডিসিন, টিকা প্রদান, কভিড-১৯ বিশ্বমারী মোকাবেলার পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা, জনসংখ্যা ও পুষ্টিসেবা প্রদান অব্যাহত রাখা। এ তিনটি স্তম্ভের সার্বিক উদ্দেশ্য হচ্ছে কভিড-১৯ ও অন্য রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান অব্যাহত ও নিশ্চিত করা।

উল্লিখিত রোগতাত্ত্বিক মোকাবেলা ও স্বাস্থ্যসেবা দানের কাজগুলোকে সহায়তা করে বাকি স্তম্ভগুলো—সমন্বয় ও নেতৃত্ব; সংগ্রহ, রসদ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা; জনগণকে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তাদের সম্পৃক্ত করে সক্রিয় করা; গবেষণা।

ভবিষ্যৎ বিশ্বমারীর প্রস্তুতি ও মোকাবেলার পরিকল্পনা কী?

এ কথাটা এখন বহুল উচ্চারিত যে কভিড-১৯ বিশ্বমারীই শেষ বিশ্বমারী নয়। ২০০০ সাল থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার নতুন ধরনের ভাইরাস দ্বারা বিশ্বমারী ঘটতে পারে, এ আশঙ্কা থেকে সারা বিশ্বে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কাজ শুরু করে। কারণ ১৯৯৬ সালে চীনে প্রথম হাঁস-মুরগিতে নতুন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এইচ৫এন১ শনাক্ত হয় এবং ১৯৯৭ সালে হংকংয়ে প্রথম মানুষের মধ্যে সেটি শনাক্ত হয়। ২০০৯ সালে আরেকটি নতুন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এইচ১এন১ প্যানডেমিক ০৯ মেক্সিকোয় প্রথম মানুষের শরীরে শনাক্ত হয় এবং তা বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। একে বিশ্বমারী বলে ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যদিও এ বিশ্বমারীতে মৃত্যুর সংখ্যা অন্য সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক ছিল না। এরপর সারা বিশ্বে বিশ্বমারী প্রস্তুতিকাজে এক ধরনের ঢিলেমি পেয়ে বসে। এ কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না করাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান বিশ্বমারী প্রসঙ্গ এক প্রকার ভুলে যেতেই বসে। এ অবস্থায় ২০২০ সালে কভিড-১৯-এর আবির্ভাব অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই ছিল।

এখন বিশ্বের উচ্চ আয়ের দেশগুলো বলছে, বিশ্বমারী প্রস্তুতির জন্য যত টাকা খরচ হতো, তার চেয়ে কয়েক হাজার/লক্ষ গুণ ক্ষতি হয়েছে এ কভিড-১৯ বিশ্বমারীতে। তাই এবার ২০টি উন্ন দেশের গ্রুপ জি২০ কর্তৃক নিয়োজিত একটি স্বাধীন প্যানেল এ বছরের জানুয়ারিতে পেশকৃত তাদের প্রতিবেদনে বলেছে সময় থাকতে অনাগত বিশ্বমারী প্রস্তুতি ও মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ বিনিয়োগ করার জন্য। এ বছরের সেপ্টেম্বরে ওই ২০টি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা ইতালির রোমে মিলিত হয়ে যৌথ ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী সংহতির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বিশ্বমারী মোকাবেলার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন।

বাংলাদেশেও বিশ্বমারী প্রস্তুতি ও মোকাবেলার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি ২০০৫ বিশ্বমারী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সক্ষম করে তোলার জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে এবং নিয়মিত পরিবীক্ষণ করছে। বাংলাদেশও সে যাত্রায় শামিল। বাংলাদেশের সক্ষমতার মূল্যায়ন হয়েছিল সর্বশেষ ২০১৬ সালে। এছাড়া প্রতি বছর বাংলাদেশ স্বমূল্যায়ন করে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য প্রতিরক্ষার জন্য একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করে। পাশাপাশি বিশ্বমারী (জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি) প্রস্তুতি ও মোকাবেলার পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছিল। এর মধ্যেই চলে এল কভিড-১৯ বিশ্বমারী। যতটুকু কাজ এ দেশে এগিয়েছে তার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বমারী মোকাবেলার কাজ চলছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিশ্বমারী বা তার পূর্বরূপ জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলা পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

এ পরিকল্পনায় যেসব উপাদান থাকা দরকার: (১) অর্থসংস্থানের কাঠামো; (২) সংশ্লিষ্ট আইনি কর্তৃপক্ষ; (৩) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকির ক্ষেত্র ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ; (৪) সম্ভাব্য পরিস্থিতির চিত্র ও সম্পদ; (৫) মোকাবেলা কার্যক্রম সক্রিয়করণ; (৬) নেতৃত্বদানকারী ও সহায়ক মন্ত্রণালয়, অংশীদার সংস্থা ও ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকা; (৭) তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তথ্য বিনিময়; (৮) জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা কেন্দ্র; (৯) ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো: গণমাধ্যম ও তথ্য; (১০) পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন; (১১) নির্দিষ্ট বিপদ ও খাতভিত্তিক পরিকল্পনা; (১২) মানসম্মত কার্যপ্রণালি।

এ পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উদ্ভব হলে (যা হঠাৎ করেই ঘটবে) তাকে অবস্থিত সম্পদ দিয়েই কত দ্রুত সামাল দেয়া যায়। দরকার হচ্ছে সঠিক সাংগঠনিক আয়োজন রাখা, কে কোন কাজটি করবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখা, বারবার তা মহড়া দিয়ে প্রস্তুতি পরিকল্পনাকে হালনাগাদ করে রাখা, একটি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলা শেষে তার অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনাকে আরো উন্নত করে তোলা। দরকার এ বিষয়ে জড়িতদের ধারাবাহিকভাবে অবহিত রাখা ও প্রশিক্ষণ চলমান রাখা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

দেশ তথা বিশ্বের অব্যাহত সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা। জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলা তথা শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সম্পদের জোগান ও ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। কভিড-১৯ বিশ্বমারী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশের অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি সবই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি হয় প্রধানত সংক্রামক ব্যাধি থেকেই। তাই প্রতিটি দেশকে সংক্রামক ব্যাধি খুঁজে বের করার জন্য, তার বিস্তার ঠেকানোর জন্য ও তা ছড়িয়ে পড়লে (মহামারী শেষ পর্যন্ত ঠেকানো যায় না, তবে যত বিলম্বিত করা যাবে ততই প্রস্তুতি নেয়া যাবে) মোকাবেলা করে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। মনে রাখা দরকার, এটা কোনো সাময়িক বা আপত্কালীন অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে মোকাবেলা করা যাবে না। এজন্য দরকার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা, যার সাফল্য নির্ভর করে রাষ্ট্রের কল্যাণধর্মী হয়ে ওঠার মাত্রার ওপর। কভিড-১৯ বিশ্বমারী ব্যবস্থাপনায় সেসব দেশই তত বেশি সাফল্য দেখিয়েছে, যাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা যত বেশি কল্যাণধর্মী।

 

ড. মুশতাক হোসেন: রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা