বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ এখন ব্যক্তির নিজস্ব খরচ। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে ২০৩০ সাল নাগাদ এ ব্যয় ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ ব্যয় ছিল ৬৭ শতাংশ আর ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী তা ছিল ৬৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচের আবার ৬৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হয় ওষুধের জন্য। এছাড়া রোগ নির্ণয় পরীক্ষার জন্য ১৫-২০ শতাংশ, হাসপাতালের শয্যা বা কেবিনের ভাড়া বাবদ প্রায় ১০ শতাংশ এবং ডাক্তারের পরামর্শ ফি বাবদ ২-৩ শতাংশ ব্যয় হয়। চলুন, এসব পরিসংখ্যানের আলোকে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ কেন এত বেশি এবং কীভাবে তার লাগাম টেনে ধরা যায়—এ দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।

ব্যাপক অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, বয়স্ক লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি, অসংক্রামক রোগের ব্যাপক বিস্তার, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার ফলে নতুন নতুন সংক্রামক এবং অসংক্রামক রোগের উত্থান ও সেই সঙ্গে নতুন নতুন ওষুধ ও মেডিকেল যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। আর বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্য ব্যয়ের এ ঊর্ধ্বগতি উন্নত দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের কপালেও ভাঁজ পড়তে বাধ্য করেছে। অনেক দেশ নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ সহ্যসীমার মধ্যে রেখেছে, যা আমরা করতে পারছি না।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ কেন এত বেশি তা বিশ্লেষণ করতে প্রথমে স্বাস্থ্য ব্যয়ের উৎসগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক। চিকিৎসা খরচের মূল উৎসগুলো হলো ডাক্তারের পরামর্শ ফি, রোগ নির্ণয় পরীক্ষা বাবদ খরচ, ওষুধ ক্রয়জনিত খরচ, হাসপাতালের শয্যা বা কেবিন ভাড়া ও সার্জারি বাবদ খরচ। সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিলে নিয়ম অনুযায়ী এগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যক্তির নিজস্ব খরচ সংগত কারণেই নিতান্ত মামুলি হওয়ার কথা। কিন্তু আদতে তা নয়। এর কারণ মূলত দুটি—প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবা না পাওয়া। ক্ষেত্রবিশেষে (যেমন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল) ওষুধের মজুদ যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও আধুনিক মেডিকেল স্টোরেজ সুবিধার অভাবে সরকারি হাসপাতালের ডিসপেনসারি থেকে রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ পায় না। ফলে রোগীকে বাধ্য হয়ে নিজস্ব ব্যয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হয়। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতলের ডায়াগনস্টিক সেবার অপ্রতুলতার কারণে বেশির ভাগ ডায়াগনস্টিক সেবার জন্য রোগীকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রের শরণাপন্ন হতে হয়। আর সরকারি হাসপাতালের সহায়ক জনবলের সেবা পেতে কিছু খরচের বিষয় তো আছেই।

অন্যদিকে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবার অপ্রতুলতার কারণে এবং শহর অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উপযুক্ত কাঠামোর অভাবে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখনো প্রথমে ফার্মেসি কিংবা হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল। আর ওষুধ বিক্রি করাই হচ্ছে এসব সেবাদানকারীর প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে অযৌক্তিকভাবে ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ব্যক্তির নিজস্ব খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়ায় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য অনেকে জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়। ফলে ব্যক্তির নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, নিকটবর্তী সরকারি সেবাদান কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অভাবে জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যক্তির পকেট থেকে বেশি খরচ করতে হয়।

সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গুণগত মানের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে দেশের জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে হাজার হাজার বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের হাসপাতালের মোট শয্যা সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এখন বেসরকারি খাতের অধীন, যার বড় একটি অংশ রোগী ভর্তির অভাবে সারা বছর খালি থাকে। তাই খরচ পুষিয়ে উঠতে এ হাসপাতালগুলো বেশি মূল্য ধার্য করে। তাছাড়া একশ্রেণীর বেসরকারি হাসপাতাল দালালনির্ভর। এসব হাসপাতালে রোগীর একটা বড় অংশ দালালের মাধ্যমে আসে। দালাল হিসেবে মূলত কাজ করে হাতুড়ে ডাক্তার, ওষুধের দোকানদার, অ্যাম্বুলেন্সের চালক এবং সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণীর অসাধু কর্মী। আর এ দালালদের পারিতোষিক প্রদানের জন্য এসব হাসপাতল স্বাস্থ্যসেবার উচ্চমূল্য ধার্য করে। আবার কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান ডেলিভারিসহ কিছু অপ্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের চিত্রও পরিলক্ষিত হয়। ফলে রোগীকে অপ্রয়োজনীয় অর্থ গুনতে হয়।

অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেবার মূল্যও অনেক বেশি। এর মূল কারণ অতি মুনাফা অর্জন এবং রেফারেল ফির প্রচলন, যা ক্ষেত্রবিশেষে ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই রেফারেল ফির জন্য অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্টের বহরও রোগীর ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায়। আবার এ রেফারেল ফি প্রচলনের পাশাপাশি রোগীর ব্যক্তিগত হেলথ অ্যাকাউন্ট না থাকায় হাসপাতাল বা ডাক্তার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুনরায় ডায়াগনস্টিক টেস্ট করাতে হয়। আর দেশে তো ভরসা করার মতো মানসম্মত কোনো ডায়াগনস্টিক ল্যাবের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মূল্য আকাশচুম্বী। আর স্বাস্থ্য বীমা বা অন্য কোনো কার্যকর প্রিপেইড ব্যবস্থা না থাকায় পুরোটাই রোগীর নিজস্ব উৎস থেকে বহন করতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক পিএইচডি গবেষণায় দেখা যায় ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া একজন রোগীর যাতায়াতসহ যে পরিমাণ খরচ হয়, তার তুলনায় বাংলাদেশে চিকিৎসা গ্রহণের খরচ বেশি। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী প্রতি বছর এসব দেশে চিকিৎসা করাতে যায়, যার খরচ বছরে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

তবে ওষুধের জন্য অত্যধিক ব্যয়ই স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির নিজস্ব খরচের প্রধান অংশ। ওষুধের অযৌক্তিক ব্যবহার এ ব্যয়ের একটা বড় কারণ। আর এ অযৌক্তিক ব্যবহারের দায় জনগণ, ওষুধের দোকান, হাতুড়ে ডাক্তার, গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঔষধ প্রশাসনসহ পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বর্তায়। বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো প্রেসক্রিপশন ব্যতীত ওষুধ ক্রয় ও বিক্রয় নিষিদ্ধ না হওয়ায় জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মুড়ি-মুড়কির মতো ওষুধ ভক্ষণ করে। জনগণের একটা বড় অংশের কাছে তো চিকিৎসা মানেই কেবল ওষুধ ভক্ষণ করা। আর হাতুড়ে ডাক্তার তো দূরের কথা অনেক সময় গ্র্যাজুয়েট এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনেও অযৌক্তিক ওষুধের উপস্থিতি দেখা যায়। ঔষধ প্রশাসনের অক্ষমতা ও উদাসীনতার কারণে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রাসী বিপণন ব্যবস্থাই মূলত এ অবস্থার জন্য দায়ী। ওষুধ উৎপাদন হলেই ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ বিপণন কর্মীর মাধ্যমে তা বিক্রির জন্য চিকিৎসকদের নানা উপহার বা প্রণোদনা দিতেও পিছপা হয় না। এই ‘সাপ্লাইয়ার ইনডিউসড ডিমান্ড’-এর ফলে যত বেশি ওষুধ উৎপাদন তত বেশি বিক্রি। আর এ আগ্রাসী বিপণনে টিকে থাকতে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমাগত বেশি হারে উপহার বা প্রণোদনা দিতে হয়, যা রীতিমতো দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে। আর এর প্রভাব ওষুধের মূল্যের ওপরও পড়ছে।

অন্যদিকে আগ্রাসী বিপণনের অতি উচ্চ খরচ পুষিয়ে উঠতে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে বেশি বেশি মিশ্রণ ওষুধ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে, যার মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফর্মুলা অনুযায়ী না হয়ে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। উল্লেখ্য, মিশ্রণ ওষুধের মূল্য একই থেরাপিউটিক গ্রুপের অমিশ্রণ ওষুুধের মূল্যের তুলনায় ক্ষেত্রবিশেষ দুই থেকে দশ গুণ বেশি। সরকার যেসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেসব ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহ না থাকায় ক্রমে সেগুলোর উৎপাদন সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মানুষ সুলভ মূল্যের ওষুধপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলেও ওষুধের জন্য খরচ বেশি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তির সামগ্রিক চিকিৎসা খরচের ওপর।

এখন আসা যাক স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ কীভাবে কমানো যায়। আর সরকারেরই বা কী করণীয়। স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ কমানোর প্রধান উপায় হলো সব ধরনের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং হাসপাতাল অধিক কার্যকরভাবে পরিচালনা করা। এক্ষেত্রে প্রথমেই দরকার কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ এবং শহর অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গুণগত মানের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বৈকালিক শিফট চালু করা। তাছাড়া প্রতিটি উপজেলায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার একটা শক্ত কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি জেলা হাসপাতালকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি জেলায় সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবার একটি শক্তিশালী হাব প্রতিষ্ঠা করা। আর প্রতিটি বিভাগে বিশেষায়িত হাসপাতালের শাখা প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি রোগীপ্রতি প্রণোদনার ব্যবস্থা করে ডুয়াল প্র্যাকটিস বা প্রাইভেট প্র্যাকটিস অনুৎসাহিত করা। আর বেসরকারি হাসপাতালকে নিজস্ব জনবল দিয়ে পরিচালিত করতে উৎসাহিত করা।

উল্লেখ্য, দেশে বিদ্যমান নিজস্ব জনবলসংবলিত বেশির ভাগ হাসপাতালের আয় তাদের খরচের তুলনায় কম। তাই যেসব হাসপাতাল নিজস্ব জনবল দিয়ে পরিচালিত হবে, সরকার প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে সরকারি হাসপাতালে যেসব সেবার স্বল্পতা আছে তা সাময়িকভাবে কিনে নিতে পারে। আর এজন্য অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শ্রেণীবিন্যাস করে সেবার মূল্য নির্ধারণ করা এবং নির্ধারিত মূল্যে সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হলে রোগীর বিদেশমুখিতাও কমানো যাবে। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা যাবে। তবে স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়নের গতিপথ সুনির্দিষ্ট করতে হবে। বাংলাদেশে সব মানুষের জন্য কমপ্রিহেনসিভ বেনিফিট প্যাকেজ-সংবলিত স্বাস্থ্য বীমা চালুর প্রধান বাধাগুলো হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যাপকতা, দুর্বল কর-জিডিপি কাঠামো এবং ঢাকা শহর ব্যতীত অন্যান্য বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলা সদরে নিজস্ব জনবলসংবলিত পর্যাপ্ত বেসরকারি হাসপাতাল না থাকা। কিন্তু স্বাস্থ্য বীমা চালু সম্ভব না হলেও মোবাইল ফোনের কলরেটের ওপর চার্জ আরোপের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব মানুষকে বিনা খরচে ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিস, কিডনি ট্রান্সপ্লানটেশন, বাইপাস অপারেশনসহ বেশকিছু ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব।

তাছাড়া সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ক্রয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং হাসপাতালে আধুনিক স্টোরেজ সুবিধা স্থাপন করে উন্নত বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সব ধরনের ওষুধের মূল্য ড্রাগ (কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২-এর আলোকে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফর্মুলার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত। আগ্রাসী বাজারজাতের দুষ্ট চক্র ভাঙার জন্য অতিরিক্ত, অযৌক্তিক ও অনৈতিক মুনাফার সুযোগ নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি স্বচ্ছ, বিজ্ঞানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক মার্কআপ নির্ধারণের কথা বিবেচনা করা। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শপত্র ব্যতীত ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধ ছাড়া সব ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করা। এজন্য মডেল ফার্মেসির প্রচেষ্টা বেগবান করা।

স্বাস্থ্য খাতে যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। আর এটা করতে পারলে সামগ্রিক এসডিজি অর্জনের গতি আরো বেগবান হবে। ফলে বর্তমান অগ্রগতির জন্য যেমন দেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পুরস্কৃত হলো তেমনি চূড়ান্ত বিবেচনায়ও দেশ পুরস্কৃত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়