স্বাধীনতা-উত্তর
বাংলাদেশে যেসব
বিষয়ে পরম
অগ্রগতি হয়েছে
তার মধ্যে
অন্যতম আমাদের
শিক্ষার অগ্রগতি।
শিক্ষার মান
নিয়ে বিবিধ
প্রশ্ন থাকতে
পারে, কিন্তু
শিক্ষার সম্প্রসারণ
নিয়ে কোনো
প্রশ্ন থাকার
কথা নয়।
তার পরও
বিশাল অর্জনের
মধ্যে কিছু
কিছু ক্ষেত্রে
অবহেলা কিংবা
উপেক্ষা রয়ে
গেছে। সেই
উপেক্ষিত অঞ্চলগুলো
কিংবা জনপদের
মধ্যে চরাঞ্চল
তথা চরের
শিক্ষা ব্যবস্থার
খুবই নাজুক
অবস্থা।
নদীবিধৌত
বাংলাদেশে অনেক
বড় বড়
নদী জালের
মতো ছড়িয়ে
আছে। এসব
নদ-নদীতে
আছে অগণিত
চর। এ
চরগুলো দুই
প্রকার। এক
প্রকার চর
আছে যেগুলো
সমতলের সাথে
যুক্ত আর
এক প্রকার
চর আছে
যেগুলো দ্বীপচর।
এ দ্বীপচরের
চারদিকে বর্ষায়
পানি থাকে।
কোনো কোনো
দ্বীপচর সারা
বছর পানিবেষ্টিত
থাকে। এসব
চরের সাথে
সমতলের যোগাযোগ
সবসময়ই দুর্গম।
নদ-নদীগুলোতে
অনেক বড়
বড় চর
রয়েছে যেগুলোর
একেকটিতে হাজার
হাজার পরিবার
বাস করে।
আবার অনেক
ছোট ছোট
চরও রয়েছে।
এসব চরে
পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
নেই। ফলে
এসব এলাকায়
বাল্যবিবাহের প্রকোপ
ভয়াবহ। তিস্তা
নদীর চরের
একজন ব্যক্তি
আমাকে বলেছেন,
চরে এমন
একজন মেয়েকেও
পাওয়া যাবে
না যার
বিয়ে ১৮-এর
ওপরে হয়েছে।
এর প্রধানতম
কারণই হচ্ছে
সেখানে লেখাপড়ার
সুযোগ কম।
কোনো কোনো
চরে প্রাথমিক
বিদ্যালয় আছে।
সেখানে প্রাথমিক
স্তর পর্যন্তই
ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া
করে। এরপর
পার্শ্ববর্তী কোনো
চরে নিম্ন
মাধ্যমিক বিদ্যালয়
থাকলে সেখানে
অষ্টম শ্রেণী
পর্যন্ত লেখাপড়া
করে শিক্ষার্থীরা।
এরপর খুব
কমসংখ্যক শিক্ষার্থী
দূরবর্তী কোনো
বিদ্যালয় খুঁজে
নেয়। যেসব
চরে মাধ্যমিক
বিদ্যালয় আছে
সেখানে এসএসসি
পর্যন্ত লেখাপড়া
করে শিক্ষার্থীরা।
উচ্চ মাধ্যমিক
প্রতিষ্ঠান বড়
বড় চরগুলোতেও
নেই। ফলে
অদম্য ইচ্ছাশক্তি
নিয়ে নামমাত্র
কিছু শিক্ষার্থী
তাদের লেখাপড়ার
প্রয়োজনে বিভিন্ন
এলাকায় গিয়ে
থেকে কিংবা
প্রতিদিন অমানুষিক
কষ্ট করে
নিজেদের লেখাপড়া
চালিয়ে নেয়।
চরের
মানুষের জীবন
তুমুল সংগ্রামের।
কতবার বাড়ি
ভেঙে যায়
আর কতবার
ডুবে যায়
তার কোনো
শেষ নেই।
নিজেদের জীবন
গুছিয়ে নেয়ার
মতো সামর্থ্য
তাদের নেই
বললেইে চলে।
দিন আনে
দিন খায়
চরের মানুষ।
এ শ্রেণীর
মানুষই চরে
বেশি। ফলে
মেয়েদের ক্ষেত্রে
বাবা-মায়েরা
চিন্তা করে
যত তাড়াতাড়ি
বিয়ে দেয়া
যায় ততই
মঙ্গল। মেয়ে
বেশি লেখাপড়া
করলে বেশি
শিক্ষিত বর
চরাঞ্চলে পাওয়া
যায় না
বলে তারা
ছোট অবস্থায়
মেয়েদের বিয়ে
দেয়। আরো
একটি বাস্তবতা
চরাঞ্চলে বিদ্যমান।
সেটি হলো
মেয়ে বড়
হলে ছেলে
কম পাওয়া
যায়, তখন
বিয়েতে যৌতুক
দিতে হয়
অনেক বেশি।
এ কারণেও
মেয়েদের বিয়ে
খুব কম
বয়সেই দেয়া
হয়। যদি
চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকত
তাহলে কম
বয়সে মেয়েদের
বিয়ে দেয়ার
প্রবণতা থাকত
না। তখন
চরের মেয়েরাও
অনায়াসে উচ্চশিক্ষা
গ্রহণ করতে
পারত। অন্যদিকে
চরাঞ্চলে গরিব
মানুষের সংখ্যা
বেশি হওয়ায়
ছেলেরা একটু
বড় হলেই
তাদের দিয়ে
টাকা উপার্জন
শুরু করা
হয়। লেখাপড়া
করে কবে
চাকরি হবে
সে অপেক্ষায়
না থেকে
ছেলেরা উপার্জনের
কাজে নেমে
পড়ে। অনেকেই
পোশাক কারখানায়
চলে যায়
চাকরি করার
জন্য।
আমাদের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে
উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে।
কখনো কখনো
স্থানীয় সুধীজন
উদ্যোগ নিয়ে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
করেছেন, পরে
সেগুলো সরকারি
অনুদান লাভ
করেছে। পরবর্তী
সময়ে অনেক
প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ
হয়েছে। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে অনেকেই
লেখাপড়া করেছে,
কিন্তু চাকরি
হচ্ছে না,
তখন তারা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন
করে সেগুলোর
শিক্ষকতা, প্রধান
শিক্ষক কিংবা
অধ্যক্ষ হয়েছেন।
যে বাস্তবতায়
সারা দেশের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত
হয়েছে সে
রকম কারণ
চরে কদাচিৎ
ঘটেছে। ফলে
চরাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
সংখ্যাই কম।
সেখানে এমন
বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি
নেই যারা
শিক্ষার জন্য
নিবেদিত হতে
পারেন। আবার
সেখানে উচ্চশিক্ষা
গ্রহণ করা
মানুষ খুব
কম। ফলে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন
করে চাকরি
করতে চাওয়া
মানুষেরও অভাব।
এসব কারণ
বিবেচনায় নিলে
চরাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
গড়ে না
ওঠার কারণ
সম্পর্কে অবগত
হওয়া যায়।
বড়
চরগুলোর চেয়ে
ছোট চরগুলোর
অবস্থা আরো
ভয়াবহ। বড়
চরগুলোতে বিদ্যালয়,
মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
কম হলেও
কিছু আছে।
কিন্তু ছোট
চরগুলোতে তাও
নেই। আমাদের
দেশে চরের
সংখ্যা কত
এর কোনো
পরিসংখ্যান নেই।
তবে শুধু
কুড়িগ্রাম জেলায়
চরের সংখ্যা
পাঁচ শতাধিক।
১৯৪২ সালের
সিএস নকশায়
নদীর একটি
মানচিত্রে ব্রহ্মপুত্র
নদীতে শত
চরের পরিসংখ্যান
পাওয়া যায়।
একটি ছোট
জেলাতেই পাঁচ
শতাধিক চর।
এর মধ্যে
অনেক ছোট
ছোট চর
আছে, যেগুলোতে
কয়েকটি পরিবারের
বাস আছে।
এসব পরিবারের
জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
কোনো ব্যবস্থাই
নেই। বড়
বড় নদীর
অনেক চরে
জনবসতি গড়ে
উঠছে ধীরে
ধীরে। যেমন
ধরা যাক
এখন যে
চর জেগে
উঠছে সেগুলোতে
ধীরে ধীরে
জনগণ বসতি
গড়ছে। প্রথমে
দু-একটি
পরিবার থাকে।
তারপর অনেকেই
নতুন চরে
বসতি গড়ে।
এভাবে একটি
চরে অনেক
মানুষের বাস
শুরু হয়।
এসব চরে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে
উঠছে না।
আমাদের
দেশে সমতলে
অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
স্থাপন করার
পরও সবাই
শিক্ষা গ্রহণে
উত্সুক ছিল
না। বাড়ির
পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
হওয়া সত্ত্বেও
অনেকেই বিদ্যালয়মুখী
হতে নিরুৎসাহিত
ছিল। সরকার
বিভিন্ন সময়ে
বিভিন্ন উদ্যোগ
গ্রহণ করে,
কখনো প্রণোদনা
দিয়ে সবার
প্রাথমিক শিক্ষা
নিশ্চিত করেছে।
শিক্ষা যেখানে
সহজে পাওয়া
যায় সেখানেই
এত চেষ্টা
করতে হয়েছে
সরকারকে। সরকার
অনেকটাই সফলও
হয়েছে। কিন্তু
যেখানে অভাবে
মানুষ নাকাল,
যেখানে তিনবেলা
খাওয়ার নিশ্চয়তা
এখনো হয়নি,
এমন করুণ
বাস্তবতায় সবাইকে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী করা
কঠিন। তার
ওপর যদি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না
থাকে কিংবা
অনেক দূরে
থাকে তাহলে
সেখানে শিশুদের
প্রতিষ্ঠানমুখী করা
অসম্ভব। বাস্তবতা
কখনো কখনো
এমন যে
কয়েকটি চর
অতিক্রম করে
গিয়ে একটি
প্রতিষ্ঠান পাওয়া
যায়। এমন
প্রতিকূল বাস্তবতায়
চরাঞ্চলের শিক্ষা
বব্যস্থা যে
অত্যন্ত নাজুক
সে কথা
বলার অপেক্ষা
রাখে না।
আমাদের
দেশে যেসব
চর রয়েছে
সেগুলোর জন্য
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে
সরকারের বিশেষ
উদ্যোগ গ্রহণ
করা অত্যন্ত
জরুরি। বর্ষা
মৌসুমে যখন
চারদিকে পানি
থৈ থৈ
করে এমন
সময়ে যাতে
শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে
স্কুলে যেতে
পারে সেজন্য
বিশেষ নৌকা
চালু করা
জরুরি। অন্যান্য
এলাকায় শিক্ষার্থীর
সংখ্যা বিবেচনা
করে যেভাবে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা
হয় সেই
সংখ্যার কথা
বিবেচনা করে
চরাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
স্থাপন না
করে সেই
নীতি শিথিল
করে চরাঞ্চলে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন
করতে হবে।
এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
যারা পড়াবেন
তাদের অনুকূল
পাঠদানের ব্যবস্থা
করতে হবে।
ক্ষেত্রবিশেষে অনুদানও
দিতে হবে।
চরাঞ্চলের
লাখ লাখ
মানুষকে অন্ধকারে
রেখে জাতীয়
উন্নয়ন আশানুরূপ
হবে না।
দেশের সব
শিশুর সমান
অধিকার আছে
শিক্ষাগ্রহণের। জন্ম
নিয়তি নির্ধারিত
হলেও রাষ্ট্রের
দায়িত্ব সবার
সমান অধিকার
নিশ্চিত করা।
বর্তমান সরকার
সবার জন্য
শিক্ষা কার্যক্রমকে
যেভাবে এগিয়ে
নিচ্ছে আমরা
আশা করি
চরাঞ্চলের শিশু-কিশোরদের
জন্যও সরকার
বিশেষ ব্যবস্থা
গ্রহণ করার
মাধ্যমে সেই
কার্যক্রমকে পূর্ণতা
দেবে। নয়তো
দেশের অনেক
মানুষ শিক্ষাবঞ্চিত
থাকবে। সবাই
শিক্ষিত হলে
যে সমাজ
ব্যবস্থা গড়ে
উঠবে আংশিক
জনপদকে শিক্ষার
বাইরে রাখলে
সেই সমাজ
বিনির্মাণ হবে
না। সামগ্রিকভাবে
একটি সুন্দর
সমাজ গড়ার
জন্যও সবার
জন্য নিশ্চিত
হোক শিক্ষার
সমান সুযোগ।
প্রাথমিক পাঠ
থেকে উচ্চশিক্ষা
পর্যন্ত সর্বত্রই
এর প্রতিফলন
দেখতে চাই।
তুহিন ওয়াদুদ: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক





