খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, বাংলাদেশকে এতদিন যারা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে চিহ্নিত করতেই ভালোবাসতেন সেই আত্মবিশ্বাসী ভাষ্যকাররা নিশ্চয়ই আশা করতে পারেননি, দেশটি সেই ঝুড়ি থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবে ও সামনের দিকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে দৌড়াতে শুরু করবে। বাংলাদেশের উন্নতির এ গতির মধ্যেও সে তার সহানুভূতি ও সহমর্মিতার বৈশিষ্ট্য ভুলে যায়নি। এ ছোট্ট লেখায় আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব বাংলাদেশে কী হচ্ছে ও কেন ঘটছে। এটি বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, মাত্র কয়েক দশক আগেও যে দেশটি অতিদরিদ্র ছিল এবং এখনো দারিদ্র্য থেকে মুক্ত নয়, সে দেশটি অসাধারণভাবে উন্নতির সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে। কেবল স্বাস্থ্য খাতই নয়, সাধারণভাবে সামাজিক অনেক খাতে বাংলাদেশ দক্ষতার সঙ্গে রূপান্তর ঘটাতে পেরেছে।

বাংলাদেশের নিজের ভবিষ্যতের জন্যও এ শিক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দ্য ল্যানসেট বাংলাদেশ টিমের কাজগুলো খুব দরকারি হবে তাদের জন্য, যারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের এ সাফল্য থেকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জন্য শেখার অনেক কিছু রয়েছে, বিশেষ করে যেসব দেশ পরিকল্পিত দারিদ্র্যের ভুক্তভোগী—বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বিশেষ সহায়ক বার্তা গ্রহণ করতে পারে। তাই বলে বাংলাদেশের জন্য বাকি পৃথিবীর দেশের ‘কী করতে হবে’— এ উপদেশ প্রচার সমীচীন হবে না। কারণ সেটি ভালো আদবকেতার মধ্যে পড়বে না। বিশেষত ঝুড়ি থেকে নামার পরপরই যদি সবকিছুকে অবজ্ঞার চোখে দেখতে শুরু করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠ রয়েছে।

সহজ ভাষায় লেখা ল্যানসেটের গবেষণাপত্রগুলো খুবই উপকারী রচনা, যেগুলোতে বাংলাদেশের এ উত্তরণের প্রধান পথপরিক্রমাগুলো কী ছিল তা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সারসংক্ষেপ নিয়ে মুশতাক চৌধুরী ও তার সহকর্মীদের প্রবন্ধে তা তুলে ধরায় আমি এখন আর সে কাজ করছি না। এর পরিবর্তে বাংলাদেশের গৃহীত অল্প কিছু আকর্ষণীয় নীতিকৌশলের ব্যাখ্যায় আমি মনোনিবেশ করব, যেগুলো দেশটির স্বাস্থ্য খাতের দ্রুত রূপান্তরে মোক্ষম ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের পরিবর্তনের একটি অভিমুখ হলো দেশটি নারী-পুরুষের অসমতা হ্রাসে খুব জোর দিয়েছে ও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গে এ কাজটি নানাভাবে সম্পর্কিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে নারীমুক্তির প্রগতিশীল দাবিটি গভীরভাবে যুক্ত—যে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দেশের জনগণ একাত্তর সালে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এ বিষয়টি আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যার জন্য এর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ধরনের জটিল বিষয়কে খোলাসা করতে হবে—যদি আমরা নারীমুক্তির বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ঠিক কীভাবে যুক্ত তা পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। আলোচনাটি এগিয়ে নিতে হলে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলার সংস্কৃতিতে নারীমুক্তির উপাদান বরাবরই ছিল—বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা অঞ্চলে আত্মপ্রকাশ লাভ করা বিভিন্ন রূপী বিপ্লবী আন্দোলনের উত্থানের অভিজ্ঞতা এ অঞ্চলের মানুষকে লিঙ্গ সমতার দাবি ও অঙ্গীকারের দিকে ঝুঁকতে এবং তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু নারীদের প্রতি সমমর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গিটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এমনভাবেই সম্পৃক্ত ছিল, যা মেয়েদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। পূর্ব বাংলায় নারীদের প্রতি এ অগ্রসর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিটির প্রতিফলন ঘটে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে নারীর ক্ষমতায়নে একটি কার্যকর নীতিকৌশল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন সহজতর হয়।

নারী-পুরুষের সমতা অভিমুখী এ পরিবর্তনের ব্যাখ্যা কিছু না কিছু মাত্রায় অনুমানমূলক হলেও এর পরিণতিটি কিন্তু বেশ পরিষ্কার। বিশেষ করে বাংলাদেশে স্কুলগুলোতে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারের বিষয়ে খুব জোর দেয়া হয়। পৃথিবীর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হাতেগোনা অল্প কয়েকটি দেশগুলোর একটি, যেখানে স্কুলে মেয়েদের ভর্তির হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বিশেষত স্কুলের শিক্ষকতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনায় নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপাত পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি, যা সবচেয়ে অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশগুলোও করতে পারেনি—এমনকি আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের এ অর্জন ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশে নারীরা বিপুল সংখ্যায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (আরএমজি সেক্টরে) অধিকাংশ কর্মীই নারী। এ শিল্পে নারীরা খুব সহজেই কাজে ঢুকতে পারছে। যদিও আরএমজি খাতের কর্মীদের কর্মস্থলে জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নটি একটি বড় ক্ষতচিহ্ন হয়ে রয়েছে। এ জরুরি ঘাটতির দিকটি অনেক দেরিতে স্বীকার করা হয়েছে এবং তা পূরণের উদ্যোগগুলোও তেমন শক্তিশালী ও যথেষ্ট নয়।

নারীরা বাংলাদেশের শক্তিশালী এনজিওগুলোরও বিশেষ মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। এ তালিকায় ব্র্যাক ও গ্রামীণের মতো বড় এনজিওগুলো যেমন রয়েছে, তেমনি ছোট বেসরকারি সংস্থাগুলোও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে সম্মিলিত প্রভাবের ফলে নারীর করণ-সক্ষমতা বিকশিত হয়েছে। মেয়েদের সক্ষমতার এ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেশের পক্ষে নতুন এক বিশ্ববীক্ষা নির্মাণ করেছে, যা আগামীর উন্নততর বাংলাদেশ নির্মাণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাধারণ অঙ্গীকার ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব নারী অনগ্রসর অবস্থায় রয়েছে—এমনকি সেখানে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুও অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় যেন সেসব সমস্যা দেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায়।

অনগ্রসর নারীদের সমস্যাগুলো দূর করা ও নারীর করণ-সক্ষমতা কাজে লাগানো—এ দুয়ের মিলিত ফল হলো বাংলাদেশের নিজস্ব অর্জন। কিন্তু নারীদের এ সক্ষমতার বিকাশের ফলে শুধু নারীরাই উপকৃত হয়েছেন তা নয়, বরং দেশের নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সব মানুষের স্বাধীনতা ও সক্ষমতার পরিধি বাড়াতে বড় ধরনের অবদান রেখেছে। সামাজিক ও আর্থিক পরিসরে নারীশক্তির সক্রিয় ভূমিকার দুয়ার খুলে দেয়ার ফলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতায় অত্যন্ত ইতিবাচক রূপান্তর ঘটেছে। পার্থক্যটি স্পষ্ট করতে বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারতের কথা বলা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রসরমাণতা বোঝা যেতে পারে ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে। বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্জনগুলো সম্ভব হওয়ার প্রধান কারণ হলো নারীর করণভবন (এজেন্সি) ক্ষমতাকে বৃহৎ পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগের সৃষ্টি। মেরি উলস্টোনক্রাফটের ১৭৯২ সালের ‘আ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব উইম্যান’ তত্ত্বায়নে নারীর সক্ষমতার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মেরি উলস্টোনক্রাফটের মূল কথা ছিল মানুষের সক্ষমতার (স্বাধীনতার) দাবি ধোপে টিকবে না, যদি তা আলাদা করে কিছু বিশেষ লোকের সক্ষমতার গুরুত্ব স্বীকার করে, কিন্তু অন্যদের সেই প্রশ্রয়ধন্য গোষ্ঠীতে স্থান না দেয়। আমরা পুরুষের অধিকারের পক্ষে ততক্ষণ দাবি তুলতে পারব না, যতক্ষণ নারীর অধিকার নিয়েও আমরা সমান আগ্রহ দেখাতে না পারি। কিছু লোক খুব প্রাসঙ্গিক আর অন্যরা নগণ্য এমন পরিপ্রেক্ষিতে উলস্টোনক্রাফটের মর্মবাণীটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণী, ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও গোষ্ঠীভিত্তিক বৈষম্য এবং বিভাজনের দৃষ্টান্ত বোঝার ক্ষেত্রে তার যুক্তিগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। আমরা দেখেছি, সামাজিক শৃঙ্খলাগুলো নারীকে বন্দি করে রাখতে চায় এবং নারীর অগ্রযাত্রায় পদে পদে এই শৃঙ্খল ও বাধাগুলোকে সরিয়ে ফেলা নিশ্চিতভাবেই দেশের সব মানুষের, সব লৈঙ্গিক পরিচিতি এবং যেকোনো বয়সের মানুষের প্রগতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পের দ্বিতীয় আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো স্বাস্থ্যসেবার সরকারি ও বেসরকারি খাতের সবাই পরস্পরের সহযোগিতার পাশাপাশি বহুস্তর পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবার সামাজিক উন্নতির গতিকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হওয়া। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য খাতে জরুরি ভিত্তিতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে—একই রকমভাবে এনজিও ও বেসরকারি সংস্থা থেকেও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যেগুলো সরকারি প্রচেষ্টার নানা দিকের শূন্যতাগুলো পূরণে জোরালো সম্পূরক ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন সৈয়দ মাসুদ আহমেদ ও তার সহকর্মীরা। তাদের গবেষণায় তারা বলছেন, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে যে বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে তার ফলে দেশটির সমগ্র স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও এ খাতের রূপান্তরের গতিকে ত্বরান্বিত করতে পেরেছে। স্বাস্থ্য খাতে বহুস্তর পদ্ধতি হলো এ খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ধরনের অংশীদার, বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি এবং নানাদিকের ব্যবস্থাপক ও প্রশাসনের সঙ্গে সবাইকে যুক্ত করে স্বাস্থ্যসেবা রূপান্তরের গতি বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে নানা ধরনের তথ্যভাণ্ডারের আন্তঃসংযুক্তি, বিভিন্ন গবেষণার ফলকে সহযোগিতার ভিত্তিতে সবার জন্য কাজে লাগাতে সহভাগ করে নেয়া, নির্দিষ্ট কেস স্টাডির ভিত্তিতে নতুন উদ্ভাবনগুলোর পারস্পরিক বিনিময়, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার কাজে অভিজ্ঞদের গভীরতর জ্ঞানকে নতুন প্রজন্মের গবেষকদের সঙ্গে আদান-প্রদান—এ সবকিছুই বহুস্তর পদ্ধতির ভিত্তি রচনা করে। স্বাস্থ্য খাতের এ প্লুরালিজম বা বহুস্তর পদ্ধতির যদিও অনেক ইতিবাচক ফল রয়েছে—বিশেষ করে পরিবর্তনে উদ্যমী করে তোলা ও উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেয়া—তা সত্ত্বেও এ পদ্ধতিটির সীমাবদ্ধতা হলো স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও প্রবিধানগুলোর হীনবলতার মতো সমস্যাগুলো সে কাটিয়ে উঠতে পারে না। অধিকন্তু এসব সমস্যা থাকার ফলে বিভিন্ন ওষুধের অতিব্যবহার ও অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা থাকলেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, সংশ্লিষ্ট নানা ধারা-উপধারার সংমিশ্রণে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে, সময়ের সঙ্গে সেটির নিরীক্ষা করতে হবে। কারণ, স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক অগ্রগতির সাফল্যের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অদক্ষতা ও বৈষম্য সহাবস্থান করছে। ফলে স্বাস্থ্য খাত রূপান্তরের সুবিধাগুলো সবার সঙ্গে সহভাগ করে নেয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না। এ ধরনের মূল্যায়ন সাপেক্ষ বিষয়গুলোর আসলে শেষ কথা বলে কিছু নেই, বরং এসব মূল্যায়নের যথার্থতা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উন্মুক্ত ও যৌক্তিক নিরীক্ষার প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও অতিসত্বর দৃঢ়তার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশ তার নিজের মতো করে খুব দ্রুততার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে ‘ধীরে চলা’র উপদেশ দিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বানানো যাবে না। ধীরে চলার পরামর্শ বাংলাদেশকে প্রায়ই শুনতে হয়। উপদেশ বিতরণকারীরা সবকিছুতে মতাদর্শিক ‘শুদ্ধতা’ খোঁজেন ও সব উদ্যোগ এ আদর্শের ভিত্তিতেই গ্রহণ করতে বলেন। এই শুভাকাঙ্ক্ষীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একদল সবকিছুকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে বলেন না হলে অন্য দল সবকিছুকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সরকারি কর্মসূচির আওতায় আনতে বলেন। বাংলাদেশ তার অভিজ্ঞতা থেকে যে প্রয়োগবাদী রূপরেখা খুঁজে পেয়েছে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিল সমীকরণের ভেতর দিয়ে অবগাহন করানোর ফলে লক্ষ করার মতো কতগুলো সাফল্য সে পেয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এ প্রক্রিয়া বেশ সমীহ জাগানিয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে যাতে সমগ্র দুনিয়াই বিস্মিত হয়েছে।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে জনগণের মাঝে ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাসেবা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সমাজভিত্তিক (কমিউনিটি-বেজড) কার্যকর পন্থা গ্রহণ করেছে। সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে গবেষণা করেছেন শামস আল আরেফিন ও তার সহলেখকরা। গবেষণায় তারা দেখাচ্ছেন সমাজভিত্তিক পন্থাটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপক ছড়িয়ে দেয়ার অনেক সুবিধা রয়েছে। সেগুলো হলো এটি শুধু সামাজিক সহযোগিতার বিষয়ে আগাম ধারণা দেয়ার মধ্যেই সীমিত থাকে না বরং স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগগুলোকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কাজটিকেও সহজতর করতে পেরেছে। এমনকি এসব নতুন উদ্যোগের প্রভাব কতখানি কার্যকর তার মূল্যায়নও এর ফলে করা সম্ভব হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিতরণে যে নতুন উদ্ভাবনী পন্থাগুলো গবেষকরা দেখিয়েছেন সেগুলোর কারণে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ উপকৃত হয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে অংশত এ কারণে, সামাজিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্যগুলো অংশগ্রহণমূলক। গণগবেষণার পদ্ধতিটি অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবার উদ্ভাবনগুলোর সুবিধা পৌঁছে দেয়া সহজতর হয়েছে। এই উদ্ভাবনগুলোর আসল অবদান সমতাভিত্তিক সমাজ পরিগঠনে কতটুকু ভূমিকা রাখছে তার ওপর গবেষণা করেছেন অ্যালাইন অ্যাডামস ও তার সহকর্মীরা।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে। সেটি হলো বাংলাদেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছে। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, বন্যা ও খরার মতো অনেক ধরনের প্রাকৃতিক বিপদ সামলাতে বাংলাদেশ আগের চেয়ে বহুগুণে সক্ষমতা অর্জন করেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো দেশের প্রগতিকে পেছন থেকে টেনে ধরত। রিচার্ড ক্যাশ ও তার সহকর্মীরা তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক শক্তি দেশটিকে দুর্যোগপ্রবণ ভূখণ্ডে পরিণত করে। ফলে বাংলাদেশ গভীরভাবে শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বশে আনতে দেশটি বেশ সফলতা অর্জন করে ও সাধ্যের মধ্যে সেসব বিপদের প্রভাবকে কমাতেও পেরেছে। অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমস্যা প্রায় নির্মূল করতে পারলেও আগামীর দিনগুলোতে জলবায়ু নিরাপত্তার চাহিদা বেড়ে যাবে, বিশেষ করে জলবাযু পরিবর্তনের হুমকি ও এর কঠিনতর অভিঘাতের মাত্রা বাড়ার সমূহ বিপত্সংকুল অবস্থা দেশটিকে মোকাবেলা করতে হবে।

আমার এ ছোট্ট লেখাটিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ও অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রের ক্রমবর্ধমান উন্নতির যাত্রাপথের কতগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হলো। ল্যানসেটের এ সিরিজ গবেষণাপত্র থেকে বাংলাদেশের উন্নতির আরো অনেক বৈশিষ্ট্য অন্বেষণ করা যায়। ল্যানসেটের অনুসন্ধান-সমষ্টির এটিও একটি উদ্দেশ্য যে নতুনভাবে নীতি ও কর্মপ্রণালি নির্ধারণে দিকনির্দেশনামূলক প্রস্তাব দেয়া। বাংলাদেশের অর্জনগুলোকে ল্যানসেট তার সিরিজ গবেষণায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের এমন অর্জনের পরও বলতে হবে, আগামীর পথে বাংলাদেশকে বহুদূর যেতে হবে—এখনো পথের অনেকটাই বাকি। ল্যানসেটের গবেষণাগুলো প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এ দীর্ঘ যাত্রায় কীভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের পদক্ষেপগুলো নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সূচনাটি ছিল অত্যন্ত চমত্কার। কিন্তু এটিও মনে রাখতে হবে, পথটি কোনোভাবেই কণ্টকবিহীন নয়। আগামী দিনের বাংলাদেশের সামনে যেসব সমস্যা আসবে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং সেগুলোকে মোকাবেলা করেই এগোতে হবে। বাংলাদেশের প্রশংসনীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে একই বৃন্তের দুটি সমস্যা এড়িয়ে যেতে সে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ জড়তা ও কল্পনাশক্তিহীনতার জোড় সমস্যার বিপদ এড়াতে পেরেছে। আগামী দিনের উত্কর্ষের বাংলাদেশ আমাদের কাছ থেকে অনেক বেশি সৎ গুণাবলি দাবি করে।

  

অমর্ত্য সেন: নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ, বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট ইউনিভার্সিটি অধ্যাপক

দ্য ল্যানসেট ম্যাগাজিন থেকে ভাষান্তর আহমেদ জাভেদ: দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি