কারণ হেপাটাইটিস এমন একটি রোগ, যা বছরের পর বছর শরীরে নীরবে বাসা বাঁধলেও অনেক সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। আর যখন উপসর্গ দেখা দেয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই লিভারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতি বছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে। অথচ সময়মতো শনাক্তকরণ, হেপাটাইটিস বি-এর টিকা (যেখানে প্রযোজ্য) এবং আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশেও লিভার রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক। হেপাটাইটিস বি ও সি-এর পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এ সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।
লিভার আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদন, পুষ্টি উপাদান সংরক্ষণ, রক্ত থেকে ক্ষতিকর উপাদান অপসারণ, প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করাসহ শত শত গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ একটি অঙ্গ সম্পন্ন করে। অথচ লিভারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এটি দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে পারে। তাই হেপাটাইটিস কিংবা ফ্যাটি লিভারকে যথার্থই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
একজন হেপাটোলজিস্ট হিসেবে প্রায়ই এমন রোগীর মুখোমুখি হই, যাদের লিভারের রোগ ধরা পড়ে তখনই, যখন সিরোসিস বা অন্যান্য জটিলতা এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। অথচ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে এদের অনেকের ক্ষেত্রেই গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই আমি সবসময় বলি—লক্ষণ নয়, ঝুঁকি থাকলেই পরীক্ষা করুন।
বর্তমানে লিভারের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে ফাইব্রোস্ক্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এটি আল্ট্রাসাউন্ডের মতোই ব্যথাহীন, নিরাপদ এবং মাত্র কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করা যায়। এ পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারে চর্বির পরিমাণ এবং লিভারের শক্ত হওয়ার মাত্রা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করা সহজ হয়। যদিও বিশেষ পরিস্থিতিতে এখনো লিভার বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় ও ফলোআপে ফাইব্রোস্ক্যান অত্যন্ত কার্যকর।
যাদের ফ্যাটি লিভার রয়েছে, হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসের সংক্রমণ আছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, পরিবারে লিভার রোগের ইতিহাস রয়েছে অথবা দীর্ঘদিন লিভারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ সেবন করতে হয়—তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত লিভার পরীক্ষা করা উচিত।
সম্প্রতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের অকালমৃত্যু লিভারের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি হেপাটাইটিস এ সংক্রমণের পর তীব্র লিভার বিকলতায় আক্রান্ত হন এবং আগে থেকেই তার ফ্যাটি লিভার ছিল। যদিও প্রতিটি রোগীর পরিস্থিতি ভিন্ন এবং এমন জটিলতার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে, ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ফ্যাটি লিভারকে কখনই অবহেলা করা উচিত নয়।
সুখবর হলো অধিকাংশ লিভার রোগই প্রতিরোধযোগ্য, আর অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা, হেপাটাইটিস বি-এর টিকা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—লিভারের রোগের লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা নয়; সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের লিভারকে সুরক্ষিত রাখা। কারণ একটি সুস্থ লিভারই সুস্থ জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।









