যে আর্থিক, সামাজিক ও ব্যবস্থাগত বাধাগুলো একজন মানুষকে পরীক্ষা, চিকিৎসা ও সুস্থতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলার আহ্বান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ আহ্বানের তাৎপর্য অনেক গভীর, কারণ পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ এক বাস্তবতার কথা। জাতীয় হেপাটাইটিস কৌশলপত্র অনুযায়ী, এক কোটিরও বেশি মানুষ এ দেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস বি অথবা সি নিয়ে বেঁচে আছে। সাধারণ জনগোষ্ঠীতে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি-এর প্রকোপ প্রায় ৪ শতাংশ এবং হেপাটাইটিস সি-এর প্রকোপ প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বলে সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। কয়েক বছর আগেও যা যথাক্রমে ৬ ও দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি ধরা হতো। অর্থাৎ প্রকোপ কিছুটা কমলেও আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২২ সালেই হেপাটাইটিস বি-এর কারণে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার এবং হেপাটাইটিস সি-এর কারণে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৩ জন মানুষ এ দুই ভাইরাসের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোতে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি রোগীদের ৮—১২ শতাংশই লিভারের রোগে আক্রান্ত, আর হেপাটাইটিস বি একাই দেশের ৬০ শতাংশ লিভার সিরোসিস ও ৬৫ শতাংশ যকৃৎ ক্যান্সারের জন্য দায়ী। যকৃতের ক্যান্সার আজ ফুসফুস ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের পরই দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্যান্সারে মৃত্যুর কারণ।
২০০৩ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি টিকা যুক্ত হওয়ার পর থেকে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ নাটকীয়ভাবে কমেছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রথম কয়েকটি দেশের একটি হিসেবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি-এর প্রকোপ ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়, আর শিশুদের তিন ডোজ টিকাদানের হার এখন ৯৮ শতাংশ। কিন্তু জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেয়া জরুরি বার্থ-ডোজ টিকার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানই আজও নেই এবং বাড়িতে সন্তান প্রসবকারী মায়েদের একটি বড় অংশ হেপাটাইটিস বি স্ক্রিনিং সম্পর্কে জানেনই না ।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম জেনেরিক সোফোসবুভির তৈরি হয়েছিল এ বাংলাদেশেই, আর ড্যাক্লাটাসভিরের মতো ওষুধের দৈনিক খরচ নেমে আসে ১ ডলারেরও কমে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার ডিএএ ট্যাবলেট বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় এবং সম্প্রতি নির্দিষ্ট রোগীদের জন্য প্রায় ১ লাখ টাকা মূল্যের ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবু বেসরকারি পর্যায়ে পূর্ণ কোর্সের চিকিৎসায় এখনো ৬০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে এবং দেশে কোনো সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা না থাকায় পরীক্ষা ও চিকিৎসার পুরো খরচ রোগীকেই নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
হাসপাতাল ও জনবল সুবিধার দিক থেকেও ঘাটতি স্পষ্ট। সারা দেশে পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সুবিধা নেই, রক্তদাতাদের হেপাটাইটিস সি স্ক্রিনিং এখনো অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল, পিসিআরের ওপর নয়। কোনো জাতীয় হেপাটোলজি ইনস্টিটিউট আজও গড়ে ওঠেনি, মেডিকেল কলেজগুলোতে হেপাটোলজিস্টের পদ সীমিত, আর অনেক প্রশিক্ষিত হেপাটোলজিস্ট কাজ করছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিভাগে। ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার সরকারি চিকিৎসককে ভাইরাল হেপাটাইটিস বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রণীত ও প্রচারিত হয়নি।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কথাও ভুলে গেলে চলবে না—সেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি-এর প্রকোপ প্রায় ৭ শতাংশ এবং হেপাটাইটিস সি-এর প্রকোপ ২২ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় বহু গুণ বেশি। অথচ হেপাটাইটিস কর্মসূচির জন্য কোনো নির্দিষ্ট ও স্থায়ী সরকারি বাজেট খাত আজও নেই; নির্ভর করতে হয় বৈশ্বিক তহবিল বা কয়েকটি হাসপাতালের সীমিত অনুদানের ওপর।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে একটি ধারণা আছে যাকে বলে ডিএএলওয়াই বা সুস্থ জীবনের হারানো বছর। সহজ কথায়, একজন মানুষ যদি অসুখে অকালে মারা যায় অথবা দীর্ঘদিন অসুস্থতা নিয়ে কষ্ট করে বাঁচে, তাহলে তার জীবন থেকে যে সুস্থ ও উৎপাদনশীল বছরগুলো হারিয়ে যায়, সেটাই এক ধরনের লুকানো ক্ষতি, যা শুধু হাসপাতালের বিল দিয়ে বোঝা যায় না। এ মাপকাঠি দিয়েই বিশ্বব্যাপী রোগের প্রকৃত সামাজিক বোঝা হিসাব করা হয়।
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি মিলিয়ে সরকারি হিসাবে বছরে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ মারা যায় আর এদের বেশির ভাগেরই মৃত্যু ঘটে পঞ্চাশের কোটায়, অর্থাৎ জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়ে। যদি ধরে নিই একজন বাংলাদেশী গড়ে ৭৫ বছর বাঁচার কথা, তাহলে ৫০ বছর বয়সে মারা যাওয়া একজন মানুষ হারাচ্ছে প্রায় ২৫ বছরের জীবন। এ হিসাবে শুধু অকালমৃত্যুর কারণেই বাংলাদেশ প্রতি বছর হারাচ্ছে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ।
হেপাটাইটিসের সামাজিক ক্ষতি অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণাপ্রসূত বিষয় রয়ে গেছে হেপাটাইটিস বি বা সি পজিটিভ ব্যক্তির ওপর। যেমন অনেক পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যায়, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় বাদ পড়তে হয়, এমনকি নিজের পরিবারের মধ্যেও একজন রোগীকে আলাদা থালাবাসন ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় —যদিও এ আতঙ্কের বেশির ভাগই ভুল ধারণাপ্রসূত, কারণ সাধারণ সংস্পর্শে এ ভাইরাস ছড়ায় না।
বাংলাদেশে হেপাটাইটিসের প্রকৃত সংক্রমণের হার, রোগীদের বয়সভিত্তিক বণ্টন বা রোগের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে কোনো হালনাগাদ জাতীয় জরিপ নেই। সর্বশেষ স্বাস্থ্য ও অসুস্থতা জরিপটি হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওপরের তথ্যগুলো একটি বাস্তবসম্মত প্রাক্কলিত চিত্র। আর এ অনিশ্চয়তাটাই আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে যে দেশ তার নিজের ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণই সঠিকভাবে জানে না, সেই দেশের পক্ষে পরিকল্পিতভাবে এ ক্ষতি ঠেকানোও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
তাই এ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক দ্বিমুখী। একদিকে ব্যক্তি পর্যায়ে—নিজে পরীক্ষা করানো, পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা, নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলা এবং হেপাটাইটিস নিয়ে চুপ করে না থাকা। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে—পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রোগীর নিজের পকেট থেকে খরচ কমিয়ে আনা, জাতীয় নির্দেশিকা দ্রুত চূড়ান্ত করা, পরীক্ষাগার সক্ষমতা বাড়ানো এবং হেপাটাইটিস কর্মসূচির জন্য স্থায়ী অর্থায়নের উৎস তৈরি করা। বিজ্ঞান আমাদের হাতে হাতিয়ার তুলে দিয়েছে; এখন প্রয়োজন কেবল সাহসী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের অংশগ্রহণ।









