গৃহ ঋণ বাজারে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক কোন কোন সেগমেন্টকে গুরুত্ব দিয়ে প্রডাক্ট সাজিয়েছে? এক্ষেত্রে সুদহার নির্ধারণে কী কৌশল অনুসরণ করছে?
গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত করতে গৃহ ঋণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক বেশ কয়েকটি প্রডাক্ট সাজিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ও পুরনো ফ্ল্যাট বা বাড়ি ক্রয় বা নির্মাণ, বিদ্যমান ফ্ল্যাট বা বাড়ি সম্প্রসারণ, সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ, সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ এবং অন্য কোনো ব্যাংক থেকে নেয়া গৃহায়ন ঋণ আমাদের ব্যাংকে স্থানান্তর বা টেকওভার সুবিধা। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক গৃহায়ন বিনিয়োগে বার্ষিক সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা নির্ধারণ করেছে। তবে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সামগ্রিক ব্যাংকিং সম্পর্ক বিবেচনায় ক্ষেত্রবিশেষে ১০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফায়ও গৃহায়ন বিনিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
ঋণ আবেদন থেকে অর্থছাড় পর্যন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত করার ক্ষেত্রে কী সীমাবদ্ধতা আছে?
প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেয়া হলে আমাদের ব্যাংকে গড়ে সাত কার্যদিবসের মধ্যেই গৃহায়ন বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। জমির দলিল, নকশা, অনুমোদন এবং অন্যান্য যাচাই-বাছাই দ্রুত শেষ করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে দুই-একদিনের মধ্যেও ঋণ অনুমোদন দেয়া সম্ভব হয়। দ্রুত সেবা দেয়ার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি, কারণ আবাসন খাতে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘমেয়াদি গৃহায়ন বিনিয়োগে মুনাফার হার কীভাবে সমন্বয় করে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক?
সাধারণভাবে গৃহায়ন বিনিয়োগের মেয়াদ সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় গ্রাহকের মাসিক কিস্তির চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এক্ষেত্রে মুনাফার হার ভাসমান থকে। অর্থাৎ বাজার পরিস্থিতি ও নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মুনাফার হার সময়ের সঙ্গে সমন্বয় হতে পারে। তবে মুনাফার হার পরিবর্তন কখনো একমুখী হয় না। বাজার পরিস্থিতির কারণে কখনো ব্যাংক ও কখনো গ্রাহক—উভয়েই সুবিধাভোগী হয়।
উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঋণের সীমা ও গ্রাহক নির্বাচনে ব্যাংক কী ধরনের বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলার অনুযায়ী গৃহায়ন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের শ্রেণীকৃত বিনিয়োগের অবস্থার ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সুবিধা দেয়া হয়েছে। আমরা সেই নীতিমালার আলোকেই গৃহায়ন বিনিয়োগ প্রদান করছি। তবে গ্রাহক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা কোনো নির্দিষ্ট পেশাকে অগ্রাধিকার দিই না। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো পেশার মানুষ—যে কেউ যদি নিয়মিত আয় ও বিনিয়োগ পরিশোধে সক্ষম হন, তাহলে তিনি আমাদের গৃহায়ন বিনিয়োগের জন্য বিবেচিত হবেন। মূল বিষয় হলো গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য।
তুলনামূলক নিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও গৃহায়ন বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর পোর্টফোলিওতে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে? এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?
এটা সত্য যে পর্যাপ্ত জামানত থাকার কারণে গৃহায়ন বিনিয়োগ অন্যান্য অনেক বিনিয়োগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। তবে এ বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় আগে ব্যাংকগুলো এ ধরনের বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দেয়াকে অনেক ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করত। তবে পরিস্থিতি এখন বদলাচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো গৃহায়ন বিনিয়োগে অনেক বেশি উৎসাহী। কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য বিনিয়োগের তুলনায় কম মুনাফা হলেও ব্যাংকগুলো গৃহায়ন খাতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কারণ এটি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ও নিরাপদ খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গৃহায়ন বিনিয়োগে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি পরিস্থিতি কেমন?
আমাদের গৃহায়ন বিনিয়োগে খেলাপির হার খুবই কম, যা ৩ শতাংশের নিচে। সাধারণভাবে যেসব বিনিয়োগ শুধু বাড়িভাড়ার আয়ের ওপর নির্ভর করে দেয়া হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে কিছু গ্রাহক খেলাপিতে পড়েন। মূলত পর্যাপ্ত ভাড়াটিয়া না পাওয়ার কারণে তাদের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে সমস্যা হয়। তবে এ ধরনের গ্রাহকের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
গৃহঋণ বাজারকে উৎসাহিত করতে বিদ্যমান নীতিমালা কি যথেষ্ট, নাকি আরো পদক্ষেপ নেয়ার দরকার আছে?
গৃহায়ন বিনিয়োগ আরো সম্প্রসারণের জন্য কিছু নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বিশেষ তহবিল গঠন করে গৃহায়ন খাতে প্রণোদনা দেয়, তাহলে ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সহজ হবে। পাশাপাশি দলিল রেজিস্ট্রেশন, স্ট্যাম্প ডিউটি ও অন্যান্য ফি যদি আরো কমানো যায়, তাহলে গ্রাহকের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। এছাড়া নির্মাণসামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো যদি নির্মাণ উপকরণের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখে, তাহলে এ খাত আরো দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
আবাসন ও ব্যাংক খাতের সমন্বয় বাড়াতে ডেভেলপারদের কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন?
আবাসন কোম্পানিগুলো যদি নির্মাণের ক্ষেত্রে গুণগত মান বজায় রাখে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় রেখে ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণ করে, তাহলে গৃহায়ন বিনিয়োগের বাজার আরো বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বা বাড়ি গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো হস্তান্তর ও মানসম্পন্ন নির্মাণের মাধ্যমে যদি ডেভেলপাররা গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে ব্যাংক ও গ্রাহক—উভয়ের মধ্যেই গৃহায়ন বিনিয়োগের আগ্রহ আরো বাড়বে।










