আবাসন খাতে ঢাকা ব্যাংকের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন?
ঢাকা ব্যাংক হোম লোনের আওতায় গ্রাহকদের জন্য মূলত ফ্ল্যাট বা বাড়ি ক্রয়, নিজস্ব জমিতে বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি সংস্কার বা সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান হোম লোন টেকওভার সুবিধা প্রদান করে। সাধারণত সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদি এ ঋণ গ্রাহকের আয়, ক্রেডিট প্রোফাইল ও সম্পত্তির ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে বাজার পরিস্থিতি, লোনের উদ্দেশ্য ও গ্রাহকের প্রোফাইলভেদে ১১-১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদহার নির্ধারণ করা হয়? গ্রাহক ব্যাংকে আবেদন করার পর সাধারণভাবে সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ থাকলে ব্যাংক আবেদনটি যাচাই-বাছাই, ক্রেডিট অনুমোদন, সম্পত্তির আইনগত ও ভ্যালুয়েশন চেক ইত্যাদি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় তিনদিন থেকে দুই সপ্তাহ (সব নথি ঠিকভাবে থাকলে) সময় লাগে।
এ খাতে ট্রাস্ট ব্যাংকের খেলাপির হার কোন পর্যায়ে রয়েছে?
হোম লোনে ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সামগ্রিক ব্যাংক খাতের তুলনায় সাধারণত কম ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে থাকে। কারণ এ ঋণ সম্পত্তি দ্বারা জামানতভিত্তিক হওয়ায় গ্রাহকরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধে সচেতন থাকেন। তবে যেকোনো পেশার গ্রাহকের আয়ের পরিবর্তন বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে আয় করার সক্ষমতা ব্যাহত হলে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে অনিয়মিত আয়ের উৎস থাকা গ্রাহক অথবা যাদের আয় বাজারের ওঠানামার ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে কিস্তি পরিশোধে চাপ সৃষ্টি হলে খেলাপির ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। বিপরীতে স্থায়ী চাকরিজীবী, নিয়মিত বেতনভুক্ত পেশাজীবী, সক্ষম উত্তরাধিকার এবং ভালো ক্রেডিট হিস্ট্রি থাকা গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপির হার খুবই কম। এ কারণেই ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের সময় গ্রাহকের আয়-স্থিতিশীলতা ও পরিশোধ সক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
আবাসন খাতে ঋণখেলাপির হার তুলনামূলক কম। এর পরও দেশের ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ বিতরণে অনুৎসাহী কেন?
পর্যাপ্ত জামানত থাকার কারণে হোম লোন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। তবু বেশ কয়েকটি কারণে দেশের কোনো কোনো ব্যাংক এ ঋণ দিতে পুরোপুরি উৎসাহবোধ করে না। হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়ে, বিশেষ করে যখন আমানত স্বল্পমেয়াদি হয়। পাশাপাশি সুদহার ভাসমান হওয়ায় গ্রাহকের কিস্তি বেড়ে গেলে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ব্যাংকের খেলাপি হার বাড়াতে পারে। সম্পত্তির আইনগত জটিলতা, রেজিস্ট্রেশন ও দলিল যাচাইয়ে দীর্ঘ সময়, ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ধীরগতি হয়। ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগে নির্মাণকালীন ব্যাংক, গ্রাহক ও নির্মাণ কোম্পানি কর্তৃক টিপিএর (ত্রিপক্ষীয় চুক্তি) মাধ্যমে ঋণ বিতরণ না হওয়া এবং বাজারে ফ্ল্যাটের তারল্য তুলনামূলক কম থাকাও ব্যাংকের ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে। এসব কারণেই নিরাপদ জামানত থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো হোম লোনে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নেয়।
আবাসন খাতে ঋণ সম্প্রসারণে মৌলিক বাধাগুলো কোথায়?
হোম লোনের সম্প্রসারণে সরাসরি একক কোনো বাধা নেই। তবে কিছু নীতিগত ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা বাস্তবে এ খাতের বিস্তারে প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদি হোম লোনের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর আমানত বেশির ভাগই স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়, ফলে ব্যাংকগুলো বড় পরিসরে এ ঋণ বাড়াতে সতর্ক থাকে। এছাড়া নির্ধারিত ঋণ ইকুয়িটি রেশিও, প্রভিশনিং ও ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি-সংক্রান্ত নির্দেশনা, সুদহার ভাসমান রাখার বাধ্যবাধকতা এবং খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত কঠোর নীতিও হোম লোন সম্প্রসারণে পরোক্ষ সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। পাশাপাশি ভূমি ও ফ্ল্যাটের আইনগত জটিলতা, রেজিস্ট্রেশন এবং ফোরক্লোজার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও নীতিগত পরিবেশকে বাস্তবে আরো কঠিন করে তোলে। এসব কারণে ব্যাংকগুলো এ খাতে ধীরে ও সতর্কভাবে অগ্রসর হয়।
আবাসন খাতে ঋণ বিতরণ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকায় উন্নীত করায় আবাসন ও ব্যাংক খাতে ইতিবাচক প্রভাবই পড়বে। এ সিদ্ধান্তের কারণে মধ্যম ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পাশাপাশি উচ্চ আয়ের গ্রাহকরাও ব্যাংক ঋণের আওতায় বড় এবং মানসম্মত ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার সুযোগ পাবেন, যা রিয়েল এস্টেট খাতে চাহিদা বাড়াবে। একই সঙ্গে নির্মাণ, সিমেন্ট, রড, টাইলসসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পে গতি আসবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে। তবে এ সুফল পুরোপুরি কার্যকর হবে তখনই, যখন সুদহার স্থিতিশীল থাকবে এবং ব্যাংকগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করে ঋণ বিতরণে আগ্রহী হবে। সামগ্রিকভাবে এটি বাজারে আস্থা ফেরাতে এবং আবাসন খাতকে চাঙ্গা করতে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
আবাসন খাতের সম্প্রসারণে ডেভেলপার কোম্পানিগুলোরও কিছু দুর্বলতার কথা শোনা যায়। ঋণ সম্প্রসারণে তাদের কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণ করতে আবাসন কোম্পানিগুলো কিছু কৌশলগত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। জমি বা ফ্ল্যাটের খতিয়ান, লাইসেন্স, অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত সব নথি প্রস্তুত এবং সঠিক থাকলে ব্যাংক তাড়াতাড়ি ঋণ অনুমোদন দিতে পারে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ দলিলপত্র নিশ্চিত করা দরকার। অনেক সময় উচ্চমূল্যের কথা শোনা যায়। কোম্পানিগুলোর উচিত গ্রাহকবান্ধব প্রডাক্ট ও মূল্যনির্ধারণ করা। ব্যাংকের সঙ্গে করপোরেট লোন এগ্রিমেন্ট বা বিশেষ হোম লোন স্কিম চালু করতে পারে কোম্পানিগুলো। তাহলে গ্রাহকরা সহজে ঋণ পেতে পারবেন। হোম লোন গ্রহণকারীদের জন্য প্রি-পেমেন্ট সুবিধা, কম ডাউন পেমেন্ট বা ইএমআই স্কিম দিতে পারলে ঋণ গ্রহণ আরো সহজ হবে। নির্ভরযোগ্য বাজার মান বজায় রাখা এবং গ্রাহকদের মাঝে শিক্ষামূলক প্রচারণাও এ খাতের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে।










