আবাসন খাতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত আপনারা কতজন গ্রাহককে ঋণ দিয়েছেন?

ডিবিএইচ ফাইন্যান্স, যা আগে ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স নামে পরিচিত ছিল, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত হলেও তা শুরু থেকেই মূলত গৃহঋণ দিয়ে আসছে। দেশের মানুষের আবাসন চাহিদা মেটাতে ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স গত প্রায় ২৮ বছরে ৬৩ হাজারের বেশি পরিবারকে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ দিয়েছে।

আপনারা কয় ধরনের আবাসন ঋণ দিয়ে থাকেন?

গ্রাহকদের যেকোনো রকম আবাসন চাহিদা পূরণ করতে ডিবিএইচ অর্থায়ন করে থাকে। ডিবিএইচের ঋণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অ্যাপার্টমেন্ট লোন, বাড়ি নির্মাণ লোন, গ্রুপ কনস্ট্রাকশন লোন, সেমি-পাকা লোন ইত্যাদি। এছাড়া সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য ডিবিএইচের আছে অ্যাফোর্ডেবল হোম লোন। ডিবিএইচ প্রচলিত হোম লোনের পাশাপাশি শরিয়াহ প্রতিপালন করে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্স করে থাকে। অর্থাৎ, ডিবিএইচ সব ধরনের গ্রাহকদের কথা চিন্তা করে তার সেবা প্রদান করে। গ্রাহক তার পছন্দ অনুযায়ী, যেকোনো আবাসন প্রয়োজনে ডিবিএইচ থেকে অর্থায়ন পেতে পারে।

আবেদন করার কতদিনের মধ্যে ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের গ্রাহকরা ঋণ পেয়ে থাকেন?

ডিবিএইচ যেহেতু মূলত হোম লোন দিয়ে থাকে, তাই এর খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো সম্পর্কে ডিবিএইচ অবগত। এ কারণে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স থেকে ঋণ প্রাপ্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সম্ভব হয়ে থাকে। তবে ঋণ অনুমোদনের সময় নির্ভর করে ঋণের ধরন, সম্পত্তির মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব ঠিকভাবে জমা দেয়া হয়েছে কিনা তার ওপর। এক্ষেত্রে হোম লোনের ধরন ও গ্রাহকের পেশা অনুযায়ী সর্বনিম্ন পাঁচ-সাত কর্মদিবসের মধ্যেই অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়। তবে যদি দলিলপত্র আইনগত যাচাই-বাছাই করতে বেশি সময় লাগে, সেক্ষেত্রে সময়সীমা একটু বাড়তেও পারে। ডিবিএইচ সম্পূর্ণ তৈরি বাড়ির পাশাপাশি নির্মাণাধীন বাড়ির ক্ষেত্রেও ঋণ প্রদান করে থাকে এবং ঋণ বিতরণের সময় বিবেচনা করা হয় যেন ঋণের টাকার সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়িটির নির্মাণ শেষ হয়।

সুদের হার বাজারদরের সঙ্গে ওঠানামা করায় গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনাদের ব্যাখ্যা কী?

হোম লোন যেহেতু একটি দীর্ঘমেয়াদি লোন এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেহেতু স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর নির্ভরশীল, তাই গৃহঋণের সুদের হার পরিবর্তনশীল। মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী তা ওঠানামা করে। দীর্ঘমেয়াদে একজন গ্রাহক সুদের হারের বাড়া ও কমা দুই পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যে গ্রাহকরা ২০১৯ সালে ১২-১৩ শতাংশ হারে ঋণ গ্রহণ করেন, ২০২১ সালে তাদের সুদের হার কমে ৮-৯ শতাংশে নেমে আসে। আবার ২০২৩-২৪ সালে তাদের সুদের হার বেড়ে ১২-১৩ শতাংশ হয়। অর্থাৎ, মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার কারণে সুদের হার বাড়তে-কমতে পারে। সুদের হার বেড়ে গেলে অবশ্যই গ্রাহকরা অস্বচ্ছন্দ বোধ করেন। মাসিক আয় না বাড়লে বাড়তি সুদের হার তার ওপর চাপ তৈরি করে। কিন্তু ডিবিএইচ এ পরিস্থিতিতে গ্রাহক চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মের মধ্যে থেকে ঋণের মেয়াদ কিছুটা বৃদ্ধি করতে পারে, যাতে গ্রাহক স্বচ্ছন্দে ঋণের কিস্তি প্রদান করতে পারেন।

ফ্ল্যাট কেনার জন্য ডিবিএইচ ফাইন্যান্স কত টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে? ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স?

ডিবিএইচ সাধারণভাবে ফ্ল্যাট মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়, তবে ঋণের পরিমাণ মূলত গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। তাই নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার না দিয়ে ডিবিএইচ বিবেচনা করে গ্রাহক যে ঋণটি চাচ্ছেন, তা তিনি তার আয় থেকে স্বচ্ছন্দে শোধ করতে পারবেন কিনা।

আবাসন ঋণের পরিধি বা বিস্তার বাড়াতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি?

আবাসন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বেশকিছু জটিলতা আছে, যা গৃহঋণের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। প্রথমত, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কোনো তহবিল নেই যার ভিত্তিতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান গৃহঋণ দিতে পারে। তাদেরকে স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর ভরসা করে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ প্রদান করতে হয়, যা একটি আর্থিক ঝুঁকির কারণ। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে যেকোনো ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের অনুপাত অত্যন্ত বেশি। আমাদের বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে খেলাপি ঋণের আদায়ের গতি খুবই মন্থর ও দীর্ঘসূত্রতায় আবদ্ধ। এছাড়া আমাদের দেশে জমি নিবন্ধন ও জরিপের রেকর্ড জটিল ও অনেকাংশে ত্রুটিপূর্ণ। এর সুবিধা নিয়ে অনেক ধরনের মিথ্যা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়, যার জন্য অনেক সময় ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অযাচিত সমস্যার সম্মুখীন হয়। এছাড়া আমাদের দেশে সম্পত্তির নিবন্ধন ব্যয় অত্যন্ত বেশি। এসব কারণে গৃহায়ণ ও গৃহঋণের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও প্রত্যাশিত গতি আসছে না।