ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স কোন কোন ক্ষেত্রে ঋণ প্রদান করে, এখন পর্যন্ত কতজন গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে?

দেশের স্বনামধন্য তিনটি ব্যাংক, সাতটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও পাঁচটি স্থানীয় করপোরেট গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসি। গৃহঋণের পাশাপাশি ন্যাশনাল হাউজিং লিজ ফাইন্যান্স ও গাড়ি কেনার জন্যও ঋণ দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৫ সাল ১০ হাজারের অধিক গ্রাহককে বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা দিয়েছে ন্যাশনাল হাউজিং। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের গৃহঋণ স্কিম চালু করেছি আমরা। মূলত ফ্ল্যাট ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও সংস্কারের পাশাপাশি কমার্শিয়াল স্পেস ক্রয় ও প্রবাসীদের জন্যও ঋণ সুবিধা রয়েছে আমাদের। বর্তমানে কয়েকজন মিলে যৌথ উদ্যোগে জায়গা ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়। তাদের চাহিদা বিবেচনায় ন্যাশনাল হাউজিংয়ের রয়েছে গ্রুপ হোম লোন সুবিধা। এছাড়া অনুমোদিত হাউজিং প্লট কেনার জন্যও ন্যাশনাল হাউজিং ঋণ দিয়ে থাকে।

সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগ থাকে। ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স কীভাবে সুদহার নির্ধারণ করে?

ন্যাশনাল হাউজিং সবসময়ই বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে থাকে। প্রতিযোগিতমূলকভাবে সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত থাকে। বর্তমানে আমাদের গৃহ ঋণের সুদের হার স্কিমভেদে ১৩ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। গ্রাহকের বিনিয়োগের ধরন ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য, গ্রহীতার বয়স বিবেচনায় ঋণের মেয়াদ ৫-২৫ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণত বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তনশীল সুদহারের ভিত্তিতেই ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে। মূলত তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বাজারের সুদহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে বাজারে সুদহার বাড়লে ঋণের সুদহারে তার প্রভাব পড়ে। তবে আমরা সবসময় গ্রাহকদের মাসিক কিস্তিকে তাদের সামর্থ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করি। আর সুদহারের নিম্নগতি দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের সুদহার কমিয়ে মাসিক কিস্তি সমন্বয় করা হয়।

কোন শ্রেণীর গ্রাহকদের ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন? আবেদনের কতদিনের মধ্যে অর্থছাড় হয়?

ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য বিবেচনায় ক্রয়মূল্যের ৭০ ভাগ পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়। যেসব গ্রাহক নিজে থাকার জন্য প্রথম কোনো ফ্ল্যাট ক্রয় করেন, তারাই আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পান। এ ধরনের গ্রাহকরা তাদের সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু বিনিয়োগ করে একটি ফ্ল্যাট কেনেন নিজে থাকার আশায়। আমরা তাদের স্বপ্নকে সর্বোচ্চ সহজভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও এরা সবচেয়ে বেশি সজাগ থাকে। আর ঋণ আবেদনের ৭-১৫ দিনের মধ্যে গ্রাহক ঋণ অনুমোদনপত্র হাতে পেয়ে থাকেন। অনুমোদনের শর্ত পূরণের দুই-তিন কার্যদিবসের মধ্যেই ঋণ বিতরণ করা হয়। এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিনিধিরাই তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেন। মূলত আমাদের নিজস্ব প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধান এবং অভিজ্ঞ আইন বিভাগের সহায়তায় যাচাই-বাছাই অভ্যন্তরীণভাবেই দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। ফলে আমাদের ঋণ অনুমোদনের সময় কম লাগে। এতে গ্রাহকরাও সন্তুষ্ট হন।

দেশের বড় একটি অংশের মানুষের নিজস্ব আবাসন নেই। এ খাতের ঋণ সম্প্রসারণে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়?

আবাসন ঋণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তারল্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া তহবিলের উচ্চ ব্যয়, দীর্ঘ পুনরুদ্ধার সময় এবং কিছু নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এ খাতে সতর্ক থাকে। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করে, যা অনেক প্রতিষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করে। খাতটি বিশেষায়িত হওয়ায় ঋণ প্রদানে বিশেষায়িত কাঠামো প্রয়োজন হয়। সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানে তারল্য ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি সুসংগঠিত অর্থ বাজারের মাধ্যমে গৃহঋণের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে এ খাতে অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আবাসন চাহিদা মেটানো সম্ভব।

দেশে সাশ্রয়ী ও ছোট আকারের আবাসন প্রকল্পের চাহিদা থাকলেও এক্ষেত্রে আবাসন কোম্পানিগুলো খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। এর কারণ কী?

ছোট আকারের ফ্ল্যাটের ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো এদিকে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারছে না। এর কারণ হলো ছোট ফ্ল্যাট তৈরিতে প্রতি বর্গফুটের মূল্য তুলনামূলক বেশি পড়ে। আর যে শ্রেণীর গ্রাহক এ ধরনের ফ্ল্যাট কিনতে চায়, তা তাদের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপে যদি কম মূল্যে জমি বরাদ্দ বা সহজ শর্তে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান এবং নিবন্ধন খরচে সমন্বয়ের মতো বিভিন্ন ধরনের প্রনোদনা দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে সব প্রতিষ্ঠানই ছোট আকারের আবাসন প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসবে।

আবাসন ঋণের বিস্তৃতি বাড়াতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা?

দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্রুত বিকাশ ঘটছে। ফলে আবাসন ঋণের চাহিদাও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাহিদা পূরণে আবাসন ঋণের বিস্তৃতি সেভাবে সম্প্রসারিত করা সম্ভব হচ্ছে না। জমির উচ্চমূল্য, নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বৃদ্ধি, নকশা অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধনের অস্বাভাবিক মূল্য এ খাতের বিকাশে অন্যতম প্রতিকূলতা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবং সরকারের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।