দেশের আবাসন খাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কেমন? আইপিডিসির কী কী প্রডাক্ট আছে এ খাতে?
বাড়ি মানে কেবল একটি ঠিকানা নয়, এটি জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। সহজ, ঝামেলামুক্ত ও দ্রুততম সময়ে আইপিডিসি হোম ঋণ ও ‘ভালো-বাসা’ গৃহঋণের মাধ্যমে আইপিডিসি গ্রাহকদের নিজ বাড়ির স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করছে; হোক তা শহরের উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট অথবা মফস্বলের ছোট্ট ঘর। উচ্চ অর্থায়ন সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি, দেশব্যাপী বিস্তৃত ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক, দ্রুত ঋণ অনুমোদন ইত্যাদি সেবার মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। প্রত্যেকটি প্রপার্টির লিগ্যাল ভেটিং প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করে থাকি। আমাদের নিজস্ব লিগ্যাল টিম প্রস্তাবিত মর্টগেজ প্রপার্টির মালিকানা-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই ও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে রক্ষিত দলিলপত্রের সঙ্গে ক্রস ম্যাচ করার পর আমরা তা ক্রয়ের পরামর্শ দিই। পাশাপাশি আমাদের অভিজ্ঞ টেকনিক্যাল টিম প্রপার্টির ভ্যালুয়েশন ও কনস্ট্রাকশন কোয়ালিটি নিয়েও যথাযথ তথ্য দিয়ে থাকে। ফলে গ্রাহকরা সম্পত্তির মালিকানা ও সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
হোম ইকুইটি এবং অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ঋণ টেকওভারের ক্ষেত্রেও আমরা সেবা দিই; তাও সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক সুদহারে। যদিও ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, তবু আমরা গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করছি। সুদহার কিংবা প্রক্রিয়াকরণ ফি—উভয় ক্ষেত্রেই আমরা গ্রাহকদের সেবা ও পরামর্শ দিই। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আমরা কাস্টমাইজড বা ‘নিড বেজড’ সেবা দিয়ে থাকি। এর আওতায় গ্রাহকরা প্রপার্টি ভ্যালুর ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।
ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণ আবেদনের প্রক্রিয়া কী এবং কতদিনের মধ্যে গ্রাহকরা তা পাবেন?
অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আইপিডিসির হোম ঋণ প্রক্রিয়া সহজ, ঝামেলামুক্ত, দ্রুততর ও গ্রাহকবান্ধব। নিয়মিত লোনের কিস্তি পরিশোধ করার আর্থিক অবস্থা থাকলে যেকোনো গ্রাহক হোম লোনের জন্য আবেদন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি, আয়ের বিবরণী ও প্রমাণপত্র এবং প্রস্তাবিত সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কিত দলিলপত্র হাতে পেলেই আমাদের ক্রেডিট ডিপার্টমেন্ট কাজ শুরু করে। এরপর সব ধাপ যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়, তাহলে খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্রাহকরা তাদের ঋণ বুঝে নিতে পারবেন। সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদি এ ঋণের সুবিধাদি গ্রাহকের বয়স বিবেচনা, গ্রাহকের পেশা ও ঋণ উদ্দেশ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। বাংলদেশের অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের সুদহারও পরিবর্তনশীল। ঋণ বিতরণের ন্যূনতম ছয়টি কিস্তি পার হওয়ার পর থেকে ছয় মাস অন্তর সুদহার পরিবর্তন করা যায়। এক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি।
ফ্ল্যাট কেনায় আইপিডিসি কত টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে কেউ অগ্রাধিকার পান কিনা?
বাংলাদেশের এনবিএফআই খাতে গৃহ ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণে কোনো রেগুলেটরি বাধ্যবাধকতা আপাতত নেই। বর্তমানে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আভিজাতিক ও হাই-ভ্যালু অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট নির্মাণ করছে। সবদিক বিবেচনা করে আমরা সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়ে থাকি। বিশেষত ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, প্রবাসী বাংলাদেশী সবাই গৃহঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। ঋণ দেয়ার জন্য গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দিই। তাই আমাদের পোর্টফোলিওতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার গ্রাহকের উপস্থিতি রয়েছে।
বিশ্বেব্যাংকের তুলনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসন বা আবাসন ঋণ প্রডাক্ট বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি বিপরীত কেন?
বিশ্বব্যাপী ব্যাংকের তুলনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসন বা গৃহঋণ প্রডাক্ট বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে চিত্র ভিন্ন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে এনবিএফআইয়ের তুলনায় খরচ অনেক কম হয়। এনবিএফআইয়ের তুলনায় ব্যাংকে সুদহার, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফিসহ অন্যান্য ফি কম। কারণ ব্যাংকের তুলনায় এনবিএফআইয়ের তহবিল সংগ্রহ ব্যয় কিছুটা বেশি। এছাড়া দেশব্যাপী ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে গ্রাহকরা গৃহঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে এনবিএফআইয়ের চেয়ে ব্যাংককে বেশি পছন্দ করেন। এর পরও নিরাপদ জামানত থাকায় ইন্ডাস্ট্রিব্যাপী সব ব্যাংক ও এনবিএফআই গৃহ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
আবাসন খাতে আইপিডিসির খেলাপি হারের পরিস্থিতি কী?
ইন্ডাস্ট্রিতে হোম লোনের খেলাপি হার সবচেয়ে কম। আইপিডিসিতেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। তবে ২০২০ ও ২০২১ সালে পরপর দুই বছর করোনা মহামারী এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদির মাঝেও আবাসন খাতে আমাদের খেলাপি হার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ও সহনীয় পর্যায়ে আছে। আর ঋণ পরিসীমাসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত আবাসন অর্থায়ন খাতের কাঠামোগত বিস্তারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফলে ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি হোম লোনের সক্ষমতা বাড়বে এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উদীয়মান নগরায়ণভিত্তিক চাহিদা অরো কার্যকরভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এ নীতিগত পরিবর্তন হাউজিং ফাইন্যান্স মার্কেটকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে, যেখানে ব্যাংক ও এনবিএফআই নিজেদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং পণ্যের বিশেষায়ণের মাধ্যমে নতুন ভূমিকা নির্ধারণের সুযোগ পাবে।
আবাসন খাতে ঋণ সম্প্রসারণে কোনো নীতিগত প্রতিবন্ধকতা আছে কি? এ খাতের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়?
বাংলাদেশে হোম ঋণ ব্যবসার প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে পলিসি ব্যারিয়ার একটি বাধা। প্রস্তাবিত বন্ধকি সম্পত্তির মালিকানা অধিকার নিশ্চিত করা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে একটি জটিল প্রক্রিয়া। তার ওপর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভবন পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের দুর্দশায় ইন্ধন জোগায়। অর্থদাতাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বন্ধকি সম্পত্তি এরই মধ্যে অন্য কোথাও বন্ধকি করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। পরিশেষে খেলাপি গ্রাহকদের মামলা-মোকদ্দমার প্রক্রিয়ার আইনি কাঠামো এত দীর্ঘ যে উভয় পক্ষই ক্লান্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তবে হোম ঋণ ইন্ডাস্ট্রির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য উচ্চ সুদহার সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বাধা। একটি আদর্শ পরিস্থিতিতে সুদহার ৬-৮ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত, যেখানে বাংলাদেশে এটি গড়ে ১২-১৫ শতাংশ। এ চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকার, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার, অর্থদাতাসহ সব স্টেকহোল্ডারকে সরকারি নীতিসহায়তার নেতৃত্বে একটি যৌথ ও সহযোগিতামূলক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে এবং অবশ্যই তা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হবে।










