পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোকে আধুনিক ও বাসযোগ্য করতে ‘‌আরবান রিজেনারেশন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। রাজউক পরিকল্পনা করলেও মাঠ পর্যায়ে ডিএসসিসির সম্পৃক্ততা ছাড়া এটি অসম্ভব। ভূমি মালিকদের আস্থায় নিতে এবং এলাকাভিত্তিক রি-ডেভেলপমেন্টে ডিএসসিসি কী ভাবছে?

এটা বাস্তব সত্য যে পুরান ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। যদিও একসময় পুরান ঢাকা ছিল সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যে ভরপুর। তবে এখন সেখানে ঘিঞ্জি বসতির কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে অনেক। উত্তরাধিকার সূত্রে পৌত্রিক প্লট ভাগ হওয়ার কারণেই ঘিঞ্জি আকার ধারণ করেছে। পুরান ঢাকায় ঘনবসতির পেছনে আরেকটা বড় কারণও আছে। সেটা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা দেশের অভিবাসী আসার কারণেও জনঘনত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আদি ঢাকার অনেক এলাকার রাস্তাঘাট সংকীর্ণ, ফলে জরুরি সেবাদানকারী ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে কষ্ট হয়। পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা নেই। আরবান রিজেনারেশন ও ল্যান্ড রিঅ্যাডজাস্টমেন্টের মাধ্যমে পুরান ঢাকায় নাগরিক সুবিধা প্রদান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসন করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। সন্দেহ নেই এ কাজ বাস্তবায়নে নাগরিক সম্পৃক্ততা জরুরি। এ বিষয়ে রাজউক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণে অংশীজন মতবিনিময় আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু ভূমি বা ভবন মালিকদের সম্মতি পাওয়া যায়নি। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকল্পে ভবিষ্যতে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে পুরান ঢাকায় এলাকাভিত্তিক রি-ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রম নেয়া প্রয়োজন। ডিএসসিসি সবসময় নাগরিক সেবাকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে কাজ করেছে। পুরান ঢাকাবাসীর জীবনমান উন্নত করার ক্ষেত্রেও রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে ডিএসসিসি বদ্ধপরিকর।

সিটি করপোরেশন আইনের আওতায় আপনারা বস্তিবাসীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেন। ভাসমান বা বস্তিবাসী জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ না করে তাদের বর্তমান অবস্থানেই বহুতল সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তোলার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিম্ন আয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য দয়াগঞ্জ, মিরঞ্জিল্লা, ধলপুর-এ হরিজন, তেলেগু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্লিনার ও কর্মচারীদের জন্য বহুতল সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তুলেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের আরো আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা ডিএসসিসির রয়েছে।

ডিএসসিসি কি এলাকাভিত্তিক বিদ্যমান সরু সড়কগুলো প্রশস্ত করে ভূমি মালিকদের ভবনের উচ্চতা ও ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে?

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-২০৩৫), ইমারত নির্মাণ অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও শহরের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। সিটি করপোরেশন রাস্তা উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ, রাস্তার বাতিসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা প্রদান করে। নির্মাণ অনুমোদন ও নির্মাণ তদারকির ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টতা থাকলে সরু রাস্তা প্রশস্তকরণের ভূমিকা রাখতে পারবে।

ভবনে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ছাদ বাগান এবং সোলার প্যানেল ব্যবহার করলে ভবন মালিকদের কি বিশেষ ‘‌হোল্ডিং ট্যাক্স রেয়াত’ দেয়ার চিন্তাভাবনা আছে?

অবশ্যই, সেটি করা যেতে পারে। আমরা সবসময় শহরের প্রতি নাগরিকদের দায়িত্বশীলতাকে উৎসাহ দিয়ে থাকি।

আইনত সিটি করপোরেশন আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে পারে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য ডিএসসিসি কি সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প বা ভাড়াভিত্তিক আবাসন করার উদ্যোগ নেবে, যা ডেভেলপারদের জন্য মডেল হতে পারে?

সিটি করপোরেশন সেবা প্রদানকারী সংস্থা। সিটি করপোরেশন নিম্ন আয়ের নিজস্ব কর্মচারীদের জন্য আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পগুলো জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও রাজউক কর্তৃক গৃহীত হয়ে থাকে।

ডেভেলপাররা যখন বড় হাউজিং প্রকল্প গড়ে তোলেন, তখন ওই এলাকার রাস্তা ও ড্রেনেজের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সিটি করপোরেশন কি ডেভেলপারদের কাছ থেকে একটি ‘‌ডেভেলপমেন্ট ইমপ্যাক্ট ফি’ নিয়ে ওই নির্দিষ্ট এলাকার নাগরিক সুবিধা ঢেলে সাজানোর কোনো নীতি গ্রহণ করবে?

বিদ্যমান বাস্তবতায় সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট এলাকার নাগরিক সুবিধা ঢেলে সাজানোর চেয়ে সব নাগরিকের জন্য উন্নত এবং সমনাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতে বর্জ্য ফেলার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থাকে না। ডিএসসিসি ডেভেলপারদের জন্য নকশা অনুমোদনের সময় আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র রাখা বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করছে না কেন?

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নকশা অনুমোদনের সময় আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র রাখা বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে রাজউকের ইমারত নির্মাণ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাস্তবায়ন তদারকি করা প্রয়োজন।

আবাসন এলাকার মান নির্ভর করে তার হাঁটার পরিবেশের ওপর। ডিএসসিসি কি এমন কোনো মডেল তৈরি করবে যেখানে ফুটপাত ও রাস্তা এতই উন্নত হবে যে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি বাদ দিয়ে হাঁটতে উৎসাহিত হবে?

আবাসন এলাকার নকশা রাজউক অনুমোদন দিয়ে থাকে। আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য হাঁটার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। রাজউক এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণে উন্মুক্ত স্থানের বড় অভাব। কোনো আবাসন প্রকল্পে বা আবাসিক এলাকায় যদি ভূমি মালিকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা পার্ক বা খেলার মাঠের জন্য ছেড়ে দেন, তবে সিটি করপোরেশন কি ওই এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের পুরো দায়িত্ব নেবে?

অবশ্যই, আমরা সাধুবাদ জানাই, যদি ভূমি মালিকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা পার্ক বা খেলার মাঠের জন্য ছেড়ে দেন, তবে সিটি করপোরেশন ওই এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের পুরো দায়িত্ব নিতে পারে।