দেশে বর্তমানে গৃহনির্মাণ ঋণের বিদ্যমান ব্যবস্থায় ব্যাংকের কী কী প্রডাক্ট আছে? তার মধ্যে পূবালী ব্যাংকের কোন প্রডাক্ট বেশি জোগান দিচ্ছে?
এখন গৃহনির্মাণ ঋণের সবগুলো প্রডাক্ট নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে এবং কিছু বৈচিত্র্যও আসছে প্রডাক্টের মধ্যে। যেমন বর্তমানে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের একটা প্রবণতা দেখছি আমরা। পাঁচ-সাতজন বন্ধু কিংবা সহকর্মী মিলে একটা জায়গা কিনছে, এরপর আবার তারা সেখানে বাড়ি তৈরি করছে। বিশেষ করে বসুন্ধরা, পূর্বাচলের মতো নতুন শহরগুলোতে তুলনামূলক কম দামে জায়গার প্রাপ্যতা আছে। সেখানে তারা জায়গা কিনে ডেভেলপ করছে। এটা নতুন ধরনের উদ্যোগ এবং সফলতাও দেখা যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জ থেকে শুরু করে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় এটা ‘সাকসেসফুল মডেল’ হয়েছে। এটা নিয়ে আমরা একটা প্রডাক্ট করেছি ও ধীরে ধীরে এ প্রডাক্টের চাহিদাও বাড়ছে।
এ প্রডাক্টের আকার ও চাহিদা কেমন?
আমরা তো কেবল গত বছর থেকেই এ প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করছি। তবে ক্রমাগতভাবেই আমরা গৃহ ঋণের একটা চাহিদা দেখছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একজনকে ৪ কোটি টাকা করেই ঋণ দেয়া হবে। এক্ষেত্রে মৌলিক প্রডাক্ট হচ্ছে পূবালী মর্টগেজ ও পূবালী আবাসন। এর মধ্যে পূবালী আবাসন সারা দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটা সাধারণ প্রডাক্ট। কারো একটা বাসা বানাতে ৫ লাখ, ১০ লাখ, ১৫ লাখ যা লাগুক, এই প্রডাক্টের মাধ্যমে তাদের ঋণ দেয়া হচ্ছে। আবাসন মানে হচ্ছে বাড়ি। এর যেকোনো ধরনের বাড়ি নির্মাণেও আমরা সহযোগিতা করতে আগ্রহী। এমনকি গ্রামের টিনের ঘর নির্মাণের জন্যও আমরা ব্যাংক ঋণ দিতে চাই।
গত বছর এ প্রডাক্টের আওতায় প্রায় ৩-৪ হাজার গ্রাহককে প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি আমরা। তবে এ প্রডাক্টকে আমরা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাই। আমাদের যেহেতু বিস্তৃত নেটওয়ার্ক আছে, আশা করি তা সম্ভবও হবে। এজন্য শাখাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে। আমরা চিন্তা করছি আরো কিছু সুবিধা হচ্ছে এখানে কিছু ফ্লেক্সিবিলিটি আনা যায়। যদিও আবাসনটা মর্টগেজ লোন, আমরা চিন্তা করছি যারা ৫ লাখ টাকার নিচে বাড়ি বানাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো বাড়ির দলিল রেখে আন্ডারটেকিং নিয়েই ঋণ দেয়া যায়। গ্রামেগঞ্জে জমির দাম খুব কম; শতকপ্রতি হয়তো ২০-৫০ হাজার টাকা। সেখানে জমির দাম আর বিল্ডিংয়ের দামের মর্টগেজ বাস্তবসম্মত না। আবার আমরা এনআরবি প্রবাসীদের জন্যও একটা আবাসন প্রডাক্ট তৈরি করেছি। এক্ষেত্রে প্রবাসীর বাবা, মা অথবা স্ত্রীর নামে জমি থাকলেই আমরা ঋণ দিয়ে দেব। শুধু দেখব যে প্রবাসী আয়টা ঠিকঠাকভাবে আসছে কিনা। এরপর ঋণগ্রহীতা ও প্রবাসী থেকে প্রতিশ্রুতিপত্র নিয়েই ঋণের টাকা ছাড় করা হয়।
ব্যাংক মধ্যস্থতায় প্রবাসীদের জন্য এমন প্রডাক্ট করা যায় কিনা?
এক্ষেত্রে সমস্যা হলো রেজিস্ট্রেশন। যিনি আবাসন নেবেন তাকে তো সশরীরে আসতেই হবে। তবে আমরা একটা অসাধারণ কাজ করছি। যারা আমাদের থেকে ঋণ নিচ্ছে, আইনজীবী দিয়ে আমরাই তাদের সব কাগজপত্র যাচাই করে দিচ্ছি। তবে কেউ যদি বিদেশে থেকেই বাড়ি বানাতে বা কিনতে চায়, তাহলে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সে তা করতে পারবে। ফ্ল্যাট পছন্দ হলে আমরা ডেভেলপারদের সঙ্গে কথা বলে তাকে নমুনা দেখাতে পারি। তবে রেজিস্ট্রেশনের সময় তাকে সশরীরে আসতেই হবে।
পূবালী ব্যাংকের হাউজিং লোন পোর্টফোলিও আকারে কেমন?
প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হবে। এক্ষেত্রে সুদের হার ১১-১২ শতাংশ পর্যন্ত হয়। তবে বাজারে সুদহার ওঠানামা করলেও আমরা কখনো বাড়াই না। বরং কমলে কমতে পারে।
মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ডেভেলপারদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। গুণগত পণ্য ব্যবহার করা কিংবা দরদামের কারণেও হয়তো নিজেরা উদ্যোগী হয়েই বাড়ি বানাচ্ছেন। এ দায় কি ডেভেলপাররা এড়াতে পারেন?
ঢাকা শহরে ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাই বেশি। ডেভেলপার কোম্পানিই কম। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাই ডেভেলপার লাইসেন্স নিজের জায়গায় বাড়ি বানিয়েছে। হয়তো ভেবেছিল একসময় অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। কিন্তু আর এগোতে পারেনি। উত্তরার দিকে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। ডেভেলপার কোম্পানির ক্ষেত্রে কমিটমেন্ট আর ডিসক্লোজারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেখা গেল যে কোনো একটা বিল্ডিং পুরোটাই মর্টগেজ দেয়া আছে, এর পরও সেখানকার কোনো ফ্ল্যাট বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ে এবং তারা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অনেকটা অনলাইন শপিংয়ের মতো—দেখায় এক রকম, পণ্য হাতে পাওয়ার পর দেখে ভিন্ন রকম। তরে বড় ডেভেলপাররা কিন্তু কমিটমেন্ট রাখে। তারা অনেক ব্যয়বহুল ফ্ল্যাট বানিয়েও তা বিক্রি করছে।
আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মধ্যবিত্ত। এ শ্রেণীর লোকজন যে বেতনে চাকরি করে, তা দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি বানানো যথেষ্ট কঠিন। তাদের জন্য কী করার আছে?
ঢাকা শহর পুরোটাই বেড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। সারা দেশ থেকেই প্রতিনিয়ত মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে এ ছোট্ট শহরে। অথচ তাদের জায়গা দেয়ার মতো অবস্থা এ শহরের নেই। এ থেকে উত্তরণে সরকার ভিন্ন পরিকল্পনা করতে পারে। দেশে এখনো বিভিন্ন জায়গায় বিশাল খালি জায়গা পড়ে আছে। ৫৭ হাজার বর্গমাইল থেকে ১ হাজার বর্গমাইল চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সেখানে কমিউনিটি ডেভেলপ করা যেতে পারে, যেখানে ৪০ শতাংশ হবে দালানকোঠা, আর বাকি ৬০ শতাংশ জায়গা হাঁটাচলা, পার্ক ও খেলাধুলার জন্য খালি থাকবে। রাজধানীকে সেখানে স্থানান্তর করা যেতে পারে। রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) হয়তো গর্ব করতে পারে যে তারা উত্তরাকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করেছে। কিন্তু তারা সেখানে প্রতিটা প্লটকে সীমানা দিয়ে আবদ্ধ করে রেখেছে। যেখানে কোনো খোলা জায়গা নেই। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আলাদা কোনো বাসস্থান নেই। দরকার ছিল পুরো এলাকাটা একটা সীমানার মধ্যে হওয়া এবং সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দির সবকিছু প্রতিষ্ঠা করা। উন্নত দেশগুলোতে এভাবেই হয়।
পূর্বাচল নিয়ে এ রকম পরিকল্পনা ছিল। সেটা কি কাজে দিয়েছে?
পূর্বাচলে যাদের জমি দেয়া হয়েছে, তারা তো কেউ বাড়ি বানায়নি; উল্টো দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় জায়গা বিক্রি করে দিচ্ছে। যাদের প্রকৃতপক্ষেই জমির প্রয়োজন আছে, এমন ব্যক্তিদেরই জায়গা দেয়ার দরকার ছিল; যারা ইউটিলিটি নিশ্চিত হওয়ার পরই সেখানে বাড়ি বানাবে। বিপরীতে আমরা ব্যবসা করার জন্য তাদের জায়গা দিয়েছি সেখানে।
পুরো আবাসন ব্যবস্থাই তো আমাদের জন্য বিশাল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায় কী?
এটি পুরোটাই সরকার ও নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভর করছে। সরকার, মন্ত্রণালয় ও রাজউক মিলে পরিকল্পিতভাবে এগোলেই এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। আগে যেমনটা বলছিলাম, পরিকল্পিতভাবে চার-পাঁচটা নতুন শহর গড়ে তুললেই এ সংকট কেটে যাবে। ফলে বর্তমান শহরগুলোও আবার বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। যেমনটা মতিঝিলের ক্ষেত্রে হয়েছে। অধিকাংশ সরকারি অফিস আগারগাঁওয়ে স্থানান্তর হয়ে যাওয়ায় যানজট কমে গেছে। তবে এখানে এখনো অনেক দুর্বলতা থেকে গেছে। এখন পুরনো ভবন ভেঙে পার্কিং, পার্ক, কমিউনিটি স্পেস তৈরি করা দরকার। এ জায়গাটা আর্থিক ব্যবস্থাপনার হাব, অথচ এখানে একটা ভালো হোটেল নেই।
আবাসন ঋণে আপনারা কেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন?
আবাসন খাতের ঋণ আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। কারণ এখানে খেলাপি হওয়ার হার খুবই কম। আবার মর্টগেজ আছে, প্রভিশন কম লাগে। কোনো কারণে খেলাপি হলেও জমি বিক্রি করে জনগণের টাকা উদ্ধার করা যায়। সেজন্য এ খাতে আমরা বেশ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বছরভিত্তিক প্রায় ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমরা আশা করছি।
পূবালী ব্যাংকের ঋণ আবেদন করে টাকা পেতে কেমন সময় লাগে? আর ৪ কোটি টাকা ঋণসীমা কি যথেষ্ট?
একক ব্যক্তির জন্য ৪ কোটি টাকা ঋণসীমা ঠিক আছে বলেই মনে হয় আমার। এর চেয়ে বেশি দরকার আছে বলেও মনে হয় না। আর পূবালী ব্যাংকে ঋণের জন্য এখন অনলাইনেই আবেদন করা যায়। আবেদন করতে গিয়ে গ্রাহক তাৎক্ষণিক তার ঋণসীমা জানতে পারেন। এরপর কাগজপত্র যাচাই করা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। তবে এজন্য আমরা গ্রাহককে কষ্ট দিই না। আমাদের দুটি টিম আছে। এর মধ্যে একটি সশরীরে গিয়ে ঠিকানা যাচাই করে, আরেকটি টিম কাগজপত্র যাচাই করে। প্রকৃত গ্রাহক হলে সব প্রক্রিয়া শেষ করে গড়ে ৩০ দিনের মধ্যেই টাকা ছাড় করা যায়।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা যায় কীভাবে?
রিয়েল স্টেট খাতে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ শতাংশ মাত্র। এর মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষ ও বাড়ি সংস্কারের ক্ষেত্রে সেটা শূন্য শতাংশ। পূবালী ব্যাংক নিম্ন আয়ের মানুষেরও আবাসন নিশ্চিত করতে চায়। আবার এখন মর্টগেজ ছাড়া ছোট ঋণ দেয়ার একটা মডেল বের করার চেষ্টা করছি। শুধু ঋণ পরিশোধের উৎসটা নিশ্চিত করেই যেন টাকা ছাড় করা যায়। এটা করতে পারলে অনেক বড় আকারে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন ব্যবস্থা করতে পারব আমরা।










