ঢাকার আবাসন বাজারের বর্তমান কাঠামো কেবল উচ্চবিত্তের জন্য। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে উঠছে না কেন?
এ ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা হলো আমাদের রাষ্ট্রের কাছে সাশ্রয়ী আবাসনের গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি বা জমির অভাব। অন্যান্য দেশের রাজধানীর ভেতরেই সরকারের মালিকানায় প্রচুর ফাঁকা জমি থাকে। যে কারণে আবাসনের ক্ষেত্রে জমির প্রাপ্যতা সেখানে বড় কোনো বাধা নয়। সরকার চাইলে সেখানে কল্যাণমুখী অনেক প্রকল্প নিতে পারে। সেটা আবাসনও হতে পারে কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবাকেন্দ্রিক অবকাঠামোও হতে পারে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর সমস্যা হলো বেশির ভাগ জমিই ব্যক্তি মালিকানাধীন। যে কারণে সরকার চাইলেও এখানে আবাসনের জন্য কল্যাণমুখী কিছু করতে পারে না। ফলে আবাসন পুরোটাই চলে গেছে বাজার অর্থনীতিতে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার এখানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারত কিনা? অবশ্যই পারত। আমাদের পলিটিক্যাল ইকোনমি এক ধরনের মিশ্র ইকোনমি। সেখানে রাষ্ট্র একই সঙ্গে কল্যাণমুখীও কাজ করে, একই সঙ্গে পুঁজিবাদী ধারার অর্থনীতিও চলমান। আবাসনের ক্ষেত্রে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সবই পুঁজিবাদী ধারণা থেকে নেয়া হয়েছে। যেহেতু সরকারও বাজার থেকে জমিটা অধিগ্রহণ করে নেয়। সেখানে সরকার একটা ব্যবসা করে। এটাই আমাদের সবচেয়ে আপত্তির জায়গায়। সরকার কম মূল্যে একটা ভূমি কিনে সেটা ডেভেলপ করে, সেখানে রাস্তা করে, অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করে উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি করে। ফলে এখানেই সরকার ব্যবসায়ীর ভূমিকা পালন করে। এ জায়গাতেই আমাদের অনেকের আপত্তি। এখানে রাষ্ট্র যদি কল্যাণমুখী নীতিতে আগাত তাহলে সে ভূমিকে প্রস্তুত করে মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের কথা ভাবত। কন্তিু সোটা না করে পুরো আবাসনটাকে ব্যক্তি খাতের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যার ভূমি আছে, টাকা আছে সে বাড়ি তৈরি করে থাকবে। যার নেই সে ভাড়া থাকবে বা পথে থাকবে এটা নিয়ে রাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই।
হোম লোন আবাসন সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি কোনো কার্যকর সমাধান বলে মনে করেন কি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন লোনের ইন্টারেস্ট রেট ১০-এর ওপর হয়, আর লোন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে ধরনের ডকুমেন্ট জমা দিতে হয় এগুলো মেইনটেইন করে আবাসন কেনা অনেকের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব হয় পড়ে। অন্যান্য দেশে সুবিধা হলো, বাজার ও ভূমি দুটোর ওপরই সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। আরেকটা সুবিধা হলো সেখানে আবাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি লোন দেয়া হয় আর ইন্টারেস্ট রেটও তুলনামূলক কম থাকে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এমনকি আমেরিকার মতো দেশেও রিয়েলএস্টেট সেক্টরে লোনের ইন্টারেস্ট রেট খুবই কম। সে বিবেচনায় আমি মনে করি বাংলাদেশেও যদি এ মডেল অনুসরণ করা হয়, তাহলে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যত্তিদের মধ্যে যারা এখনো আবাসন কেনার ক্ষেত্রে এ মার্কেটের বাইরে আছেন, তারা এখানে ঢুকে পড়বেন। তিনি যখন দেখবেন দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, তিনি সহজেই আবাসন কেনার প্রতি আগ্রহী হবেন। এখানে আরেকটা বিষয় বলতেই হলো, আমাদের আবাসনের দাম বাড়ে কিন্তু এলাকার ভিন্নতার কারণে। নির্মাণ ব্যয় গুলশানে যা, পুরান ঢাকায়ও তা। তাহলে একই কোয়ালিটির গুলশানের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৫ কোটি টাকা, আর পূরণ ঢাকায় ৬০ লাখ টাকা হওয়ার কারণ কী? এ ক্ষেত্রে সরকার যদি জমির দামের এ তারতম্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে আশা করা যায় আবাসনের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-৩৫ বা ড্যাপে জনঘনত্ব হ্রাসের যে কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে ডেভেলপারদের আবাসন চাহিদা মেটানোর সংঘাত কোথায়?
সংঘাত আসলে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু ওনারা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ড্যাপকে দেখার কারণে সংঘাত মনে করছেন। ডেভেলপারদের কাজ হলো তারা আবাসন ইউনিট নির্মাণ করবে, তার সুনির্দিষ্ট প্রফিট রেখে বাজারে বিক্রি করবে। সরকারের কাজ হলো নাগরিক সুবিধার অবকাঠামোগুলো তৈরি করে দেয়া। এখন সবাই চাচ্ছে ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা বা সিটি করপোরেশন এলাকার ভেতরে থাকতে। ডেভেলপাররা যদি পূর্বাচল, ঝিলমিল বা অন্য কোথাও যেত এতে কোনো সমস্যাই হতো না। ভবন চারতলা করুক বা পাঁচতলা করুক নির্মাণের ব্যয়ের ১৫ শতাংশ হয়তো লাভ করতে পারে। তাহলে দামটা সেভাবেই নির্ধারিত হবে। এখানে সংঘাতের কোনো জায়গা নেই। এ ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে, যেকোনো শহর যদি সচল রাখতে হয়, জনঘনত্বটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমরা আজকাল কম্প্যাক্ট সিটির পরামর্শ দিই। ইউরোপ আমেরিকার প্ল্যানাররাও এ কথাই বলেন। সেখানে প্রতি একরে জনঘনত্ব হলো ২৩-২৪ জন। এটা যদি সর্বোচ্চ ১৫০-২০০ জনের মধ্যে রাখা যায় তাহলে আমরা বলি ভূমির ব্যবহারটা সর্বোত্তম পর্যায়ে হয়েছে। ঢাকা শহরে জনঘনত্বের এ সর্বোত্তম পর্যায় ছাড়িয়ে গেছে বহু বছর আগে। আমরা যে কথা বলছি, ঢাকার কম্প্যাক্টনেস আর ইউরোপীয়ান কম্প্যাক্টনেস এক রকম না। বার্সেলোনায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৪ হাজার মানুষ বসবাস করে। কিন্তু সেখানে যে পরিমাণ মেট্রোরেল আছে, রাস্তাঘাট আছে, মাঠ, জলাশয়, স্কুল, হাসপাতাল আছে, ঢাকায় তো সেটা নেই। অথচ এখানে কিন্তু প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৮ হাজার মানুষ বসবাস করছে। তিন গুণ হয়ে গেল। কিন্তু ন্যূনতম অবকাঠামো নেই। আমাদের যুক্তিতর্কগুলো এটা নিয়ে। কীভাবে নাগরিকদের বাসযোগ্য শহর উপহার দেয়া যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকা, আগুন লাগলে পানি না পেয়ে মারা যাওয়া, গরমে, শীতে, রোগে শোকে মারা যাওয়া তো বাসযোগ্য শহরের বৈশিষ্ট্য না। আমরা শুধু এ কথাটাই বলছি, আপনি যত মানুষ জায়গা দিচ্ছেন, তাদের জন্য ন্যূনতম সড়ক, ফুটপাত, হাসপাতাল, স্কুল ইত্যাদি নিশ্চিত করুন।
জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের আবাসনের অধিকার—এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কোনো গাণিতিক বা পরিকল্পনামূলক মডেল কি ঢাকার প্রেক্ষাপটে সম্ভব?
দেখুন, ঢাকায় জনঘনত্বের স্টান্ডার্ড মাত্রা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকাবাসীর অবস্থা কি দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাবে নাকি এ অবস্থা থেকে টেনে তুলতে হবে। এ শহরে যত মানুষ আছে তাদের বসবাসযোগ্য শহর দেব নাকি পরিস্থিতির কথা বলে এখানে আরো মানুষ এনে জড়ো করে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেব? মনে করুণ, ঢাকাবাসী এখন গড়ে ৩ ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকে, আর প্রতিদিন দুইশ মানুষ শ্বাসকষ্ট রোগে নতুন করে আক্রান্ত হয়। এ পরিস্থিতি কি আরো বাড়তে দেব? পাঁচ বছর পর মানুষ ৬ ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকবে আর প্রতিদিন দুই হাজার মানুষ শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হবে। ড্যাপের জনঘনত্ব পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়া থেকে বাঁচানোর একটা ক্ষুদ্র চেষ্টা মাত্র। তবে এটাও যে ভালো কাজ করবে আমি তা মনে করি না। এরই মধ্যে আমরা অসুস্থ
নগরীর বাসিন্দা হয়ে গেছি। ঢাকার কোনো পার্কে ঘাস থাকে না। কেন থাকে না? ওভার ইউস। মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। সেগুলো যদি না বাড়ানো যায়, শুধু ঘরবাড়ি তৈরি করে তো বাসযোগ্য শহর গড়া যাবে না।
রাস্তা, ফুটপাত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নগরসেবার মান কি সরাসরি আবাসনের মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে?
নাগরিক সেবার যে বিষয়গুলো আছে, ভালো রাস্তা, কানেক্টিভিটি, যাতায়াত ব্যবস্থা, গণপরিসর এগুলো আবাসনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পার্ক-মাঠ এগুলো তো আবাসনের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। যে এলাকায় একটা সুন্দর লেক আছে, পার্ক আছে, খোলা জায়গা আছে, সেখানে ফ্ল্যাটের দাম বেশি। আবাসন ব্যবসার স্বার্থেই পার্ক মাঠ ও জলাশয় সংরক্ষণ করা জরুরি। বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু এ পলিসির ব্যাপারে খুব সচেতন। কোনো এলাকা যখন এভাবে দাঁড়িয়ে যায়, যেমন ধানমন্ডি বা গুলশানের কথাই ধরুন, এসব এলাকায় একসময় প্রচুর মাঠ ছিল। খাল ছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীরা দেখছে এখানে তো আবাসনের চাহিদা তুঙ্গে। তখন তারা খোলা জায়গা, খাল, জলাশয়গুলো ভরাট করে আবাসান বানিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে অভিযাত এলকার সৌন্দর্য হারাতে থাকে। এ ক্ষেত্রে রাজউকে কঠোর ভূমিকা রাখা দরকার ছিল কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে।
ঢাকার চারপাশের নিচু জমি ও কৃষিজমি ভরাট করে হাউজিং হচ্ছে। পেরি-আরবান এলাকায় নগরায়ণ সীমিত রেখে উঁচু ভবন করে শহরকে বাড়ানোর সুযোগ ও ঝুঁকিগুলো কী কী?
ভবন উঁচু হোক বা নিচু হোক, সব ক্ষেত্রেই একটা লিমিট আছে। সে লিমিট কোনোভাবেই ক্রস করা যাবে না। এ কারণেই আমরা বারবার জনঘনত্বের কথা বলি। প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় কত লোক বসবাস করবে, তাদের জন্য কত স্কুল লাগবে, হাসপাতাল লাগবে, সড়ক লাগবে, জলাশয় লাগবে, মাঠ লাগবে, পার্ক লাগবে এগুলো সব আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃতি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। ১০ ফুট বাই ১০ ফুট একটা রুমে চারজন বসলে খুব আরাম করে গল্প করা যাবে। সেখানে যদি ৭০ জনকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, ২০০ জনকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তখন আর কেউ শ্বাস নিতে পারবে না। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে মারা যাবে। ঢাকার অবস্থা এখন এ জায়গায় এসেই দাঁড়িয়েছে। ম্যানহার্টনের কথা ধরুন। সেখানে বিশাল বিশাল হাইরাইজ ভবন আছে। সেখানে জনঘনত্ব মাত্র ২৮ হাজার প্রতি বর্গকিলোমিটারে। সেখানে অন্তত আট-নয়টা মেট্রো লাইন আছে। বাস আছে। রাস্তা আছে। ফুটপাত আছে। এত কিছু দেয়ার পর ২৮ হাজার জনঘনত্ব অনুমোদন করা হয়েছে। আর ঢাকায় তো আমরা কিছু না দিয়েই ৪৮ হাজার অনুমোদন করে ফেলেছি। ভবন যত উঁচুই বানানো হোক, সেখানে নাগরিক সেবার সক্ষমতা অনুযায়ী মানুষ বসবাসের সংখ্যা নির্ধারণ হবে। কিন্তু যারা মনে করেন, এত কিছু না, ৫০তলা ১০০তলা ভবন বানালাম আর মানুষ থাকা শুরু করল, এটা ভুল কনসেপ্ট। তখন আমাদের জ্যামের সময় ৩ থেকে বেড়ে ৯ ঘণ্টায় চলে যাবে। কোনো পরিকল্পনাই নগরীর এমন বিপর্যয় সমর্থন করে না।










