নারীর অগ্রগতির পথে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বর্তমানে অনেক বেড়েছে। স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই আমি নারীর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে গ্রামে গিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করি। দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি শহর ও গ্রামে নারীদের অবস্থানে বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
অতীতে নারীদের কাজের সুযোগ খুব সীমিত ছিল। গ্রামীণ নারীরা মূলত ধানকেন্দ্রিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতেন। ধান ঘরে আনার পর প্রক্রিয়াজাত করা ছিল নারীর দায়িত্ব। ধান থেকে চাল বানানোর কষ্টসাধ্য কাজ তাদের হাতে সম্পন্ন হতো। কিন্তু সেটি কখনো অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। বলা হতো, এগুলো গৃহস্থালির কাজ। ধানের দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বাজারে চাল বিক্রি হলেও নারীদের পরিশ্রমের কোনো মূল্যায়ন করা হতো না। ঘরের ভেতরে যে অসংখ্য কাজ নারীরা করতেন, তারও কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি ছিল না।
বর্তমানে এ চিত্র বদলেছে। নারী খেতমজুর হিসেবে কাজ করছেন। মাটি কাটার কাজও করছেন। আবার কৃষিকাজ কিংবা গার্মেন্টসেও চাকরি করছেন। ছোট ছোট শহরেও নারীর আয়ের নানা সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যেও এগিয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখন অনেক মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও মেয়েরা পড়াশোনা করছে।
নারীদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। মাতৃমৃত্যুর হার বেশি ছিল। বর্তমানে তা অনেক কমেছে। নারীদের গড় আয়ু বেড়েছে। একসময় বাংলাদেশে নারীদের আয়ু পুরুষের তুলনায় কম ছিল। এর কারণ ছিল অপুষ্টি, চিকিৎসার অভাব, কিশোরী বয়সে সন্তান জন্মদান প্রভৃতি। এ পরিস্থিতিও বদলেছে। বাংলাদেশে নারীর গড় আয়ু উন্নত দেশের সমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে কন্যাশিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে। একসময় কন্যাশিশুর জন্মকে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা এত প্রবল ছিল যে প্রকাশ্যে বলা হতো, ‘কন্যা আমাদের দরকার নেই।’ বর্তমানে পরিস্থিতি পুরোপুরি না বদলালেও অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এখন কন্যাশিশুর প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। অতীতের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই সরে গেছে।
তবে অগ্রগতি সত্ত্বেও নানা ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য রয়ে গেছে। খেতমজুর হিসেবে একজন পুরুষ যদি ৫০০ টাকা মজুরি পান, একজন নারী পান মাত্র ৩০০ টাকা। মৌসুমভেদে মজুরি কিছুটা বাড়লেও অফ সিজনে সেই আয় অর্ধেকে নেমে আসে। এছাড়া সমাজে নারীকে ঘিরে নানা ধারণা প্রচলিত রয়ে গেছে। নারী মানেই তাকে সংসার করতে হবে, বিয়ে করতে হবে, সন্তান জন্ম দিতে হবে—এমন ধারণা এখনো টিকে আছে। কভিডের সময় লকডাউনে পুরুষরা ঘরে বসে ছিলেন। সে সময় নারীর ওপর পারিবারিক নির্যাতন বেড়ে গিয়েছিল। তবু পরিবারের খাবারের জোগান দিতে হতো নারীকেই। কোনো না কোনোভাবে নারী দায়িত্ব নিয়েছে, কিন্তু তার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। এখনো নারীকে এমন অনেক দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, যা পুরুষরা নেন না।
এগুলোর চেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘নারীর নিরাপত্তাহীনতা’। শারীরিক, সামাজিক, মানসিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই নারীরা ঝুঁকিতে আছেন। নারী নির্যাতনের যত মামলা থানায় হয় বা ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ অনেক নারী থানায় যেতে পারেন না। কেউ কেউ বলে থাকেন, আসলে সহিংসতার সংখ্যা বাড়েনি, কেবল রিপোর্ট বেড়েছে। কিন্তু আমার মতে, নারী নির্যাতনের সংখ্যা সত্যিই বেড়েছে। এর মূল কারণ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি।
গ্রামীণ সমাজে এখনো দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার নারীকে সেই ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ে দেয়া হয়। যুক্তি দেয়া হয় যে এতে ভুক্তভোগীর পরিবারের মানসম্মান রক্ষা পায়। কিন্তু সেই নারীর মানসিক অবস্থার কথা কেউ ভাবে না। ধর্ষণ একজন নারীর প্রতি সবচেয়ে অপমানজনক অপরাধ। ধর্ষণের শিকার একজন নারী কীভাবে সেই পুরুষকে শ্রদ্ধা করবে বা তার সঙ্গে সংসার করবে—এ কথা চিন্তা করা হয় না। আবার দেখা যায়, ভুক্তভোগী নারী মামলা করতে চাইলে বা আদালতে গেলে তাকে নারীবিদ্বেষী মনোভাবের শিকার হতে হয়। এর দায় দেশের বিচার ব্যবস্থার। আদালতে নারীকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়, বর্ণনা দিতে হয়, অপমান সহ্য করতে হয়। সমাজও তাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। আমাদের উচিত ছিল এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ধর্ষককে জঘন্য অপরাধী হিসেবে দেখা হবে। কিন্তু গ্রামীণ সালিশে এখনো মানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা টিকে আছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা নারীর বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছি।
সমাজে এখন অনেকেই মনে করে বাল্যবিবাহ উচিত নয়। কিন্তু আবার অনেকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে রক্ষা করতে হলে বিয়ে দিতে হবে’। চলমান সময়ে বাল্যবিবাহ মানে অতীতের মতো নয়-দশ বছরে বিয়ে নয়। কিন্তু তার পরও মেয়েদের ১৫ বা ১৬ বছর বয়সে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। ১৬ বছর বয়সের মেয়েদের জন্য সমাজকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। পরিবার চিন্তা করে যে আমার মেয়ে বাইরে যাচ্ছে, কলেজে যাচ্ছে। তার ঝুঁকি আছে। তখন পরিবার ভাবে মেয়ের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেয়া জরুরি। এসব পরিস্থিতি নারীর নিরাপত্তাহীনতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এগুলো আমাদের সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আমরা এখনো সমাজ ব্যবস্থাকে নারী ও কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ করতে পারিনি।
নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। কিন্তু এটাও সত্য যে সরকার একা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এখানে আমাদের সবার, সব মানুষের সহযোগিতা লাগবে। পুলিশ, প্রশাসন, শিক্ষক, সরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও সবার সহযোগিতায় মব বা নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এখনো বর্তমান সরকারের হাতে সময় আছে। আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নারী সংস্কারে সরকার সময় দেয়া শুরু করে দিতে পারে।
নারীর ওপর অত্যাচার, নারীর প্রতি বৈষম্য, ধর্ষণ, নারীকে কোণঠাসা করে রাখার প্রচেষ্টা এগুলোর কারণ নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো নিয়ে ব্যাপকভাবে বৃহত্তর নারী সমাজকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। এখনো সময় রয়েছে। একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কিছু পুরুষ নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। কিন্তু কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণে না রেখে যেকোনো সমাজে, যেকোনো পরিবারে সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করে, তখন একটা ভারসাম্যপূর্ণ সুন্দর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তারা নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকতে চায়। সমাজে নারীর ওপর এটা চাপিয়ে দিচ্ছে যে ‘তোমাকে মানতেই হবে’। যারা চাচ্ছে না মানতে, তাদের মানানোর চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ জরুরি, পরিবর্তন দরকার এবং পরিবর্তন সম্ভব।
প্রথমত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বাসে, রাস্তাঘাটে সব জায়গায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। বাসে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজটি খুব সহজ। এক্ষেত্রে একটা হেল্প লাইন থাকবে। নির্দেশনা দেয়া থাকবে, বাসে কোথাও যদি নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটে তাহলে মালিক, কোম্পানি, চালক ও হেলপারকে দোষী করা হবে। বাসের ভেতর এ রকম ঘটনা বাস কর্তৃপক্ষকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দিতে হবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধ, নারী শিক্ষা, নারীর মজুরি বৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে কাজ করা দরকার। নির্বাচিত সরকারকে এগুলোয় মনোযোগ দিতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন দেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। তাদের চাহিদা, তাদের প্রয়োজন, তাদের দাবিগুলো উপেক্ষা করে একটা দেশে কীভাবে এগোবে। অর্ধেক জনসংখ্যাকে উপেক্ষা করে, পিছিয়ে রেখে গণতান্ত্রিক হওয়া অসম্ভব। জবাবদিহিও সম্ভব না। দেশের উন্নতিও সম্ভব না। নারীর অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তার জবাবদিহি, তার বিষয়ে জবাবদিহি, তার কাছে জবাবদিহি এগুলো জরুরি। নারীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়তে হবে। ইতিবাচক মনোভাব প্রথমে পরিবারের মধ্যে আনতে হবে। পারিবারিক ক্ষেত্রে যদি নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা না আনি, পারিবারিক ক্ষেত্রেই যদি ব্যবধান-বৈষম্য থাকে, ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়; তাহলে নারী অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। কোণঠাসা করে রাখার এ প্রক্রিয়া কখনই একটা দেশের সংস্কৃতি হতে পারে না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। আর পরিবর্তনের দায়িত্ব সবাইকে নিতে হবে।
খুশী কবির: মানবাধিকার কর্মী এবং সমন্বয়কারী, নিজেরা করি










