বাংলাদেশে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা আজও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই তারা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু পারিবারিক সহিংসতায়ই প্রতি মাসে গড়ে ১৯ জন নারী জীবন হারাচ্ছেন।

নারী ও কিশোরীদের জন্য জনসমাগমস্থলও নিরাপদ নয়। কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন কিংবা বাজার—সবখানেই তারা যৌন হয়রানি, হামলা, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছেন। অনেক গোষ্ঠী যেন স্বঘোষিত মোরাল পুলিশ" হয়ে নারীদের চলাফেরায় বাধা দিচ্ছে। খেলাধুলা, সাইক্লিং বা সাধারণ বিনোদন থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এ সহিংসতা নারীদের মৌলিক অধিকার ও সংবিধানস্বীকৃত সুরক্ষা লঙ্ঘন করছে, যা আন্তর্জাতিক সনদ যেমন সিডওর প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থী। অথচ গার্মেন্টস শিল্পসহ অর্থনীতির বহু খাতে নারীদের অবদান অপরিহার্য এবং মানব উন্নয়নের সিংহভাগ সাফল্য তাদের শ্রম ও অংশগ্রহণের ফল। তবু পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা এখনো অবমূল্যায়িত।

নারীর প্রতি সহিংসতার একটি কারণ হলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ বা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য হিসেবে না দেখা। পরিবারের ও সমাজের মধ্যে নারীদের প্রয়োজনীয় ভূমিকা এখনো স্বীকৃত নয়, বরং প্রায়ই তা উপেক্ষিত থাকে। অথচ গার্মেন্টস শিল্পে আমাদের সাফল্যের জন্য তাদের শ্রম অপরিহার্য। নারীরা পরিবার ও সমাজের যত্ন, দেখাশোনা ও সমন্বয়মূলক কাজ করছে; মানব উন্নয়ন সূচকের অধিকাংশ উন্নতি নারীদের অবদান ও তাদের অংশগ্রহণের ফলে অর্জিত। কিন্তু এসব বিষয়ের কোনো প্রভাব বা মূল্য নেই।

নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতা ও অধিকার লঙ্ঘনের বিস্তারের পেছনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আছে পারিবারিক সহিংসতা সাধারণভাবে মেনে নেয়া; অপরাধী বা দুষ্কৃতকারীকে দায়ী না করা; নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নারীদের ন্যায়বিচার দিতে বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা।

পুলিশ, স্বাস্থ্যসেবা ও বিচার ব্যবস্থার মতো পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতার অভাবে অপরাধীদের মধ্যে অপরাধবোধ জাগ্রত হয় না। ধর্ষণ মামলার মাত্র ২-৩ শতাংশ দোষী সাব্যস্ত হয়। তাই ৯৭ শতাংশ অপরাধী মনে করে, তারা ধর্ষণের জন্য বিচার বা শাস্তি থেকে সহজে রক্ষা পাবে।

নারী ও কিশোরীদের অধিকার লঙ্ঘনের অন্য কারণগুলোর মধ্যে আছে আমাদের সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা। এখনো বিশ্বাস করা হয় যে নারীরা পুরুষদের অধীন এবং জেন্ডার সমতা একটি পশ্চিমা ধারণা। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যাও নারীদের মর্যাদাকে হেয় করতে ভূমিকা রাখে।

সহিংসতার বিস্তারের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিবারে সহিংসতা সহনীয় মনে করা, অপরাধীর দায়মুক্তি, বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও সামাজিক রীতিনীতি। ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারীদের প্রতি নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

সমাধানের পথ:

১. পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর অবদান তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালু করা।

২. বৈষম্যমূলক রীতি-প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

৩. জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ভিএডব্লিউজি ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিকে কার্যকর করা।

৪. পুলিশ, স্বাস্থ্য ও বিচার বিভাগকে সংবেদনশীল ও জবাবদিহিমূলক করা।

৫. নিম্ন আয়ের নারীদের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।

৬. মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রতিটি কার্যালয়ে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং চালু করা।

৭. সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রকে নারীবান্ধব করে তোলা, যাতে নারীরা ভয়মুক্ত জীবনযাপন করতে পারেন। কারণ সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ কেবল নারীর জীবন নয়, আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

শাহীন আনাম: নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন