ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে গত এক বছরে কোনো সংস্কার হয়েছে কি? এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাত অনেক প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল পুরনো সমস্যার সঙ্গে নতুন সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। খাতটি মূলত সরকারি নীতি, উদ্যোগ ও জনগণের সমর্থনেই এগিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক নীতিগুলো নতুন করে সংকট তৈরি করছে।
প্রথমত, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, যা এ শিল্পের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। এর সঙ্গে অন্যান্য অর্থনৈতিক সমস্যাও যুক্ত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর যে ধরনের চ্যালেঞ্জ আসবে, সেগুলোর জন্য বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়। বিশেষত, ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটসের (আইপিআর) আওতায় পেটেন্টের জন্য যে পেমেন্ট করতে হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান তৈরি হয়নি। আমরা এলডিসি উত্তরণের বিরুদ্ধে না। জাতি হিসেবে আমরাও চাই সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে।
তৃতীয়ত, সরকারের জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার বিষয়ে নতুন নীতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যেহেতু বেশির ভাগ মানুষ ওষুধের জন্য চিকিৎসকের ওপর আস্থা রাখেন, তাই জেনেরিক প্রেসক্রিপশন চালু হলে যেটা বিক্রি করলে লাভ বেশি হবে সেসব ওষুধ বিক্রি বেড়ে যেতে পারে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে আগে কয়েকটি হাসপাতালে পাইলটিং করার ব্যবস্থা নেয়া হোক। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে বিষয়টি কতটা কার্যকর। তার পরে জাতীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হোক। এসব না করে এ রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক না।
চতুর্থত, প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার নতুন ইন্টার্ন চিকিৎসক যুক্ত হচ্ছেন। যদি কোম্পানির প্রতিনিধিদের চিকিৎসকদের কাছে যেতে না দেয়া হয়, তাহলে নতুন ওষুধের নাম ও কার্যকারিতা সম্পর্কে তারা কীভাবে জানবেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে, যখন রোগীর চাপ কম থাকে, তখন প্রতিনিধিদের আসার জন্য অনুমতি দেয়ার বিধান করা যেতে পারে। আমরা এথিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিস গাইডলাইন তৈরি করেছি। চূড়ান্ত হলে এটা আমরা সরকারের কাছে জমা দেব। মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেললে তো হবে না। বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় দেড় লাখ প্রতিনিধি রয়েছেন, এরা কোথায় যাবেন। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সব রকম পণ্যের প্রমোশনাল কার্যক্রম রয়েছে। ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী জিনিসের তো অবশ্যই প্রমোশনের প্রয়োজন রয়েছে।
ওষুধ খাত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
সরকারের উচিত ফার্মা খাত নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা। ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটি ও কারিগরি কমিটি গঠনের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো আলোচনার মাধ্যমেই এসেছে। নতুন ড্রাগ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া এবং নারকোটিক-সংক্রান্ত সমস্যাও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আজকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প যে জায়গায় এসেছে তাতে সরকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। ড্রাগ অ্যাক্ট ভালো হয়েছে, কিন্তু এটা বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি না রেখে সব অংশীজনকে নিয়ে খোলামনে আলোচনা করতে হবে। সরকার দেশের মানুষকে কীভাবে চিকিৎসা দিতে চায় এটা আগে ঠিক করা দরকার।
সরকারের উচিত একটি পরিষ্কার নীতিমালা তৈরি করা, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। কিছু ওষুধ বিনামূল্যে, কিছু স্বল্পমূল্যে এবং কিছু কিনে নেয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। মৌলিক চাহিদার অনেক পণ্যের মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ না করলেও বেসরকারি খাতের ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ওষুধ শিল্পের জন্য একটি পরিষ্কার নীতিমালা তৈরি করা জরুরি। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে কার্যকর নীতিমালা অনুসরণ করা যেতে পারে। ওষুধ কোম্পানিকে সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে বরং সহযোগী হিসেবে দেখা উচিত।
ওষুধ চোরাচালান বন্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
অনিবন্ধিত ওষুধের চোরাচালান বন্ধ করতে বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে ড্রাগ সুপারভাইজারের সংখ্যা মাত্র ৪৭ জন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এক্ষেত্রে মানবসম্পদ বাড়ানো প্রয়োজন। জনগণের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। একবার ভেঙে পড়লে ওষুধ খাত পুনরায় দাঁড় করানো বেশ কঠিন হবে। যখনই আমরা বাজারে নির্দিষ্ট ওষুধ সরবরাহ করতে পারব না তখনই বর্ডার ক্রস করে সেটা চলে আসবে। তখন আমাদের দেশের ওষুধ খাত ধীরে ধীরে ধসে পড়বে।
ডেল্টা ফার্মার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কী কী বিষয় গুরুত্ব পাবে?
ডেল্টা ফার্মা ২০০৪ সালে কিছু উদ্যোক্তা ও চিকিৎসকের বিনিয়োগে যাত্রা শুরু করে। মানসম্পন্ন ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে এবং নৈতিকতার সঙ্গে সরবরাহ করা তাদের মূল লক্ষ্য। এ কোম্পানির পণ্য বিদেশেও রফতানি হয়, যা তাদের গুণগত মানের প্রতি অঙ্গীকারের প্রমাণ। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস দিয়ে শুরু করে ডেল্টা বর্তমানে ডার্মাটোলজি, ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনের ওষুধও উৎপাদন করছে। আগামীতে নতুন উৎপাদন ভবন চালু এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডেল্টা লাইফ সায়েন্স পিএলসি নামে একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান চালু করার পরিকল্পনা করছে।










