স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে দেশের হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলো কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়?

আমাদের ছোট আয়তনের এ দেশে ১৮ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে। তাই স্বাস্থ্য খাতে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বিপুল। এত বেশি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে যে পরিমাণ জনবল দরকার, তা এ দেশে নেই। অর্থাৎ চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীসহ সর্বস্তরে জনবল সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে কর্মচারীর। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আছেন ৬০০ জন, কিন্তু অনিয়মিত শ্রমিকের সংখ্যা ৫৮০ জন। তিন শিফটে কাজ করতে হয় বিধায় এ সংখ্যাটা অপ্রতুল। হাসপাতালের ইনডোরে সবসময় সাড়ে চার হাজার রোগী থাকে; আউটডোরে আরো ছয় হাজার রোগী সেবা নিতে আসে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন এ হাসপাতালে অন্তত সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশি রোগী সেবা গ্রহণ করে। এ বিপুলসংখ্যক সেবাপ্রার্থীর চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। চাহিদা অনুযায়ী সেবিকাও কম। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক থাকায় চিকিৎসক সংকট তেমন নেই। কিন্তু পেরিফেরির হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক সংকট প্রকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেখানে অত্যন্ত অপ্রতুল।

বড় হাসপাতালগুলোয় এত বেশি রোগীর চাপের কারণ কী? এ চাপ হ্রাসে আপনার পরামর্শ কী?

উপজেলা থেকে যে কেউ চাইলেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বড় বড় চিকিৎসা কেন্দ্রে সরাসরি চলে আসতে পারেন। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির স্বাস্থ্য সমস্যাটি আঞ্চলিক পর্যায়ের কোনো হাসপাতালে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু তিনি উপজেলা, জেলা কিংবা আঞ্চলিক ও বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে না গিয়ে সরাসরি ঢাকা মেডিকেলে চলে আসেন। এভাবে বড় হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি হচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে আঞ্চলিক হাসপাতালগুলো খালি পড়ে আছে কিন্তু ঢাকার হাসপাতালে রোগীকে জায়গা দিতে পারছি না। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে রেফারেল সিস্টেম চালু করতে হবে, যাতে যে রোগের চিকিৎসা আঞ্চলিক হাসপাতালে সম্ভব, সেসব রোগ নিয়ে কেউ বড় হাসপাতালে ভিড় না করেন। বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারি চিকিৎসা খাতে কোনো রেফারেল সিস্টেম নেই।

হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

অবকাঠামোগত দুর্বলতা বা স্বল্পতা স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সমস্যা। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ পুরনো আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেডের সংখ্যার দ্বিগুণ-তিন গুণ রোগী রয়েছে। ফলে এসব হাসপাতালে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ হাজার শয্যাসম্পন্ন হাসপাতাল অবিলম্বে দরকার। তবে যদি আমরা কার্যকর রেফারেল সিস্টেম চালু করতে পারি, তাহলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হবে।

আঞ্চলিক হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে আপনার পরামর্শ কী?

আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পদায়ন করতে হবে। তবে সেখানে তাদের থাকার মতো সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আবাসন ও সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষাসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা আঞ্চলিক পর্যায়ে নেই। এ বিষয়টিতে নজর দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ উপজেলায় অনেকগুলো কনসালট্যান্টের পদ রয়েছে, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেকে জেলা কিংবা অন্য কোনো হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পোস্টিংয়ের তুলনায় হাসপাতালে কম চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে; বাকিরা জেলা শহরে অবস্থান করছেন। ফলে উপজেলার অধিবাসীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছে না। সুতরাং আঞ্চলিক হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হলে মহানগরের ওপর চাপ কমবে এবং প্রান্তিক মানুষ উন্নত সেবা পাবে।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেটস্বল্পতা নিয়ে অনেক বছর ধরেই কথা উঠছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের অভাব একটি বড় সমস্যা। স্বাস্থ্যসেবা কিন্তু সস্তা নয়। বাজেট যদি না বাড়ে তাহলে জনবল বাড়ানো এবং অবকাঠামো উন্নয়ন করে সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব নয়। আমাদের হাসপাতালে যে বাজেট পাই, তার দুই-তৃতীয়াংশ চলে যায় বেতন-ভাতা, ইউটিলিটি বিলসহ নৈমিত্তিক খরচে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ টাকা থাকে ওষুধ ও যন্ত্রপাতির জন্য। সুতরাং বাজেট বাড়ানো জরুরি।

আপনি যে সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করলেন, সেগুলোর অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান। এসব সমস্যা সমাধানে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছেন কি?

এতসব সংকটের পরও আশার আলো আছে। কেননা এসব সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অনেক বেশি আন্তরিক। আমি বিশ্বাস করি অন্তর্বর্তী সরকারের এ উদ্যোগ সফল হবে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন ২০২৫ বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন নির্ভর করবে একাধিক বিষয়ের ওপর। তবে আমি আশাবাদী দ্রুতই এ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হবে। স্বাস্থ্য খাতকে উন্নত করতে আমার প্রস্তাব হলো পর্যাপ্ত জনবল, অবকাঠামো, বাজেট বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ও রেফারেল পদ্ধতি চালু করা। এখানে বিকেন্দ্রীকরণ বলতে আঞ্চলিক পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সব জায়গায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা।