৪ আগস্ট সকালে ঢাকা মেডিকেলে যাই। একের পর এক আহত-নিহত বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করছে। বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছেন তারা আহত-নিহতদের ধরাধরি করে মেডিকেলে প্রবেশ করাচ্ছেন। তখন চারদিকে শুধু তিন ধরনের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। গুলি, আহতদের আর্তনাদ আর মিছিলের শব্দ। ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি, শব্দের সাক্ষী হয়েছি বহুবার।

২ আগস্ট মহাখালীতে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সোহান নামে এক আহত গার্মেন্টস কর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি পরে সেপ্টেম্বরে শহীদ হন। ওনার বুকে গুলি লেগেছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, শরীরের ভেতরে গুলিটা নড়াচড়া করে প্রচণ্ডভাবে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। যখন বুলেটটা অন্য জায়গায় যায়, তখন ভেতরে সবকিছু ছিঁড়ে যায়।

জুলাইয়ের দিনগুলোয় এক প্রতিবেদক হিসেবে নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া হতো। একেকদিন একেক রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতাম। ১৯ জুলাই প্রথম কয়েকটি সাক্ষাৎকার নিই, জুলাইয়ে আহত-নিহতদের বহন করা অ্যাম্বুলেন্সচালকদের। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্সচালককে দেখতে পাই। কিছুক্ষণ তাদের কথা শোনার পর ভেতরে ভেতরে যেন স্তব্ধ হয়ে যাই। এক চালক আমাকে বলছিলেন, ‘আমি অ্যাম্বুলেন্স চালাই ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এত মরদেহ কখনো আমি বহন করিনি।’

ঢাকা মেডিকেলে এক আহতের পরিবারের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ট্রমায় পড়েছিলাম। হাসপাতালের বেডে গুলিবিদ্ধ ছেলেকে কোলে নিয়ে শুয়ে ছিলেন তার মা। তারা একে একে হাসপাতালের রিপোর্টগুলো আমাকে দেখিয়েছেন। ছেলেটি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। পুলিশের গুলিতে তার খুলি ফুটো হয়ে যায়। তার মা আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলের মাথায় খুলি নেই। খুলে ফেলা হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, আমার ছেলে যদি সুস্থও হয় তবুও সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না।’ ওই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে পরে পত্রিকার জন্য লেখার সময় আমি ভেঙে পড়ি, বারবার চোখ মুছছিলাম। ওই ঘটনাটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে ট্রমাটিক। চোখ বন্ধ করলে সে ছবি ভেসে উঠত আর কানে শুনতে পেতাম মায়ের আহাজারি।