১৮ জুলাই ২০২৪। আমি সেদিন অন্য একটি দায়িত্ব পালনের উদ্দেশে বের হয়েছিলাম। পথে অফিস থেকে জানানো হয়, ‘উত্তরায় আন্দোলনের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দ্রুত সেখানে যেতে হবে।’
মহাখালীতে পৌঁছেই দেখি, সেখানেও উত্তেজনা। পরিচিত ফটোসাংবাদিকদের অনেকেই সতর্ক করে বললেন—‘উত্তরার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ’। তবুও পেশাদারত্বের তাগিদে নিজের ভয় চাপা দিয়ে রওনা হই। পথে একের পর এক পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। বারবার রাস্তায় ঘুরে বিকল্প পথে এগোতে হয়। এয়ারপোর্ট পার হতেই টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ আরো তীব্র হয়ে ওঠে, নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
জসীমউদ্দীন এলাকায় একদল শিক্ষার্থী আমার বাইক আটকে দেয়। পরিচয় দেয়ার পর বলে ‘নিজ দায়িত্বে যান।’ সামনে এগোতে গিয়ে দেখি, টায়ার জ্বলছে। দুইশ গজ দূরে শিক্ষার্থীরা জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে। পুলিশ দূর থেকে টিয়ার শেল ছুড়ছে। আমি বাইক রেখে ছোট গলির ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে ক্যামেরা হাতে সামনে এগোই। রাস্তায় টায়ার জ্বলছিল। ঝুঁকি এড়াতে আমি রাস্তার ধার দিয়ে সামনে এগোতে থাকি। শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ার শেল ছোড়ার ছবিও তুলতে থাকি। শিক্ষার্থীরা বারবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঢুকতে চাইছিল। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল, এমনকি রাবার বুলেট ছুড়ছিল। আজমপুরের পরিস্থিতি ছিল আরো ভয়াবহ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছিল। অনেককে গ্রেফতার করা হচ্ছিল, ছবি তুলতে গেলে বাধা দিচ্ছিল পুলিশ।
রবীন্দ্র সরণিতে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিলে পুলিশ আবার হামলা করে। আমি ডিভাইডারের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম পুলিশ থানার ভেতরে গিয়ে ছাদে উঠে গুলি করছে। খেয়াল করলাম আমার ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার অস্বাভাবিকভাবে ভেজা, হাত দিয়ে দেখলাম আমার কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে। হাতে ও পেটে ব্যথা অনুভব করলাম। ছররা গুলি আমার শরীরে লাগে। ডিভাইডার ধরে এগিয়ে নিরাপদ দূরত্বে এসে দেখলাম পেটে ক্ষত। সেখানে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখলাম গুলিবিদ্ধ, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। অন্য শিক্ষার্থীরা তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। গুরুতর আহত অবস্থায়ও ক্যামেরা ছাড়িনি। একপর্যায়ে ব্যথায় বসে পড়ি। শিক্ষার্থীরাই আমাকে ধরে নিয়ে যায় কাছের একটি বাড়ির গেটে। সেখানে মায়েরা বসে কেউ শরবত খাওয়াচ্ছেন, কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। তারা আমাকে জীবাণুনাশক লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। সেখান থেকে বাইক রাইডাররা আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল। একজন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু সেখান এত বেশি ভিড় ছিল যে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। পরে অফিসে চলে এলাম। সেখান থেকে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অস্ত্রোপচার করে গুলিগুলো বের করা হলো। চারদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। হাসপাতালের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম—তরুণ প্রজন্ম কীভাবে রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখে চলেছে।
মাসফিকুর সোহান, আলোকচিত্রী, বণিক বার্তা










