চব্বিশের জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোয় সঠিক তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে নিজের সুনাম ধরে রাখতে পেরেছিল বণিক বার্তা। সে সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিউজরুমে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় ১৮ জুলাই। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। শিক্ষার্থীদের ডাকা কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চলাকালে তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। ওই দিন গুলিতে মৃত্যু হয় অন্তত ২১ জনের। ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয় অনেক শিক্ষার্থী। সেদিন হাসপাতাল ও শহরের নানা রণক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বণিক বার্তার প্রতিবেদক ও আলোকচিত্রীদের নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কেউ কেউ হামলার শিকারও হয়েছেন। ওই দিনই পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন বণিক বার্তার ফটোসাংবাদিক মাসফিকুর সোহান।
১৮ জুলাই রাতে পত্রিকার প্রথম সংস্করণ ছাপাখানায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা। ঠিক সে মুহূর্তে সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হলো। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সংবাদপত্রের ইন্টারনেট-নির্ভরতা অনেক বেশি। বৈশ্বিক ঘটনাবলির রিয়েল টাইম আপডেট নেয়া বা দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ছাপাখানায় পত্রিকা পাঠানো পর্যন্ত সব কাজেই ব্যবহার হয় ইন্টারনেট। এ কারণে প্রথমদিন ছাপাখানায় সময়মতো পত্রিকা পাঠানো ছাড়া আর কোনো কাজে তেমন কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের।
তবে দ্বিতীয় দিন থেকে বাধ্য হয়েই নিউজরুমের কাজ চালাতে গিয়ে ইন্টারনেটের বিকল্প খুঁজে নেয়া ও কর্মপদ্ধতি বদলে ফেলতে হলো আমাদের। পরদিন থেকে যতদিন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল, বণিক বার্তা নিউজরুমে সংবাদ আদান-প্রদানের প্রধানতম উপকরণ হয়ে উঠেছিল মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন। ফিল্ডে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা ফোনে তথ্য দিচ্ছিলেন, সেটিই নিউজরুমে এডিট হয়ে অনলাইনে উঠছিল আর প্রিন্টে ছাপানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। কয়েকজনের কাজ ছিল কয়েকটি টিভি চ্যানেল খুলে বসে থাকা। সে সময় আন্তর্জাতিক খবরাখবরের জন্য টেলিভিশনই হয়ে উঠেছিল প্রধানতম ভরসা। ফটোজার্নালিস্টরা বিকালের মধ্যে সারা দিন ধরে তোলা ছবি জমা দিয়ে আবার বাইক নিয়ে বের হয়ে যেতেন নতুন ছবি সংগ্রহের জন্য। আবার কোনো কোনো প্রতিবেদক প্রায়ই একটি প্রতিবেদন জমা দিয়ে আবার ছুটে যেতেন কোনো না কোনো হাসপাতাল বা রণক্ষেত্র থেকে নতুন খবর সংগ্রহ করে আনার জন্য। আর চট্টগ্রামসহ ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলা থেকে খবর ও ছবি সংগ্রহের জন্য সে সময় বণিক বার্তার একটি এফটিপি সার্ভার খোলা হয়েছিল। তবে ইন্টারনেট না থাকায় সেটিরও কার্যক্রম ছিল বেশ ধীরগতির।
শুধু নিউজরুম লিডাররা নয়, প্রতিবেদক ও সাব-এডিটরদের অনেকেই সে সময় সাপ্তাহিক ছুটি নেয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। গোলযোগপূর্ণ সেসব দিনে সবাইকে অফিসে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে ঝুঁকি নিয়ে। বণিক বার্তার কর্তৃপক্ষও সে সময় সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করেছে। সে সময় নিউজরুমের আনুষঙ্গিক কাজকে সর্বোচ্চ গতিতে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বণিক বার্তার পরিবহন পুলের ড্রাইভার, অফিস সহকারী, পিয়ন সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে অবদান রেখেছেন।
পরিস্থিতি তখন দিনে দিনে আরো ঘোলাটে হয়ে উঠছিল। ১৯ জুলাই শুক্রবার সারা দেশে প্রায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়। ২১ জুলাই শনিবার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে নিউজরুমের সিনিয়র সদস্যরা কেউ না কেউ ২৪ ঘণ্টাই ওয়ার্কস্টেশনে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া রিপোর্টার ও সাব-এডিটরদের মধ্যে কেউ অফিসে থেকে যেতে চাইলে থাকতে পারবেন। বণিক বার্তার নিউজরুমের সভাকক্ষে পাতানো হলো তোশক। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত এ ব্যবস্থা চালু ছিল।
সে সময় প্রতিদিনের মৃতের সংখ্যা নিয়ে নানা মাধ্যমে বিভ্রান্তি দেখা গেছে। পুলিশের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। হাসপাতালগুলোয়ও মৃতের তথ্য চেপে রাখার সর্বোচ্চ প্রয়াস ছিল তৎকালীন প্রশাসনের। কোনো কোনো হাসপাতালের কর্তৃপক্ষও এ তথ্য বাইরে আসতে দিতে চায়নি। এজন্য প্রতিদিন বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েকজন রিপোর্টার সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকতেন, যাতে কোনো মরদেহ হাসপাতালে আসামাত্র এর তথ্য লিপিবদ্ধ করা যায়। এরপর পত্রিকায় তা প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্রের প্রমাণসহ টালি করা হতো। এমনকি রাতে প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পরও তা নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের সঙ্গে পুনরায় মেলানো হতো, যাতে আমাদের দিনের চূড়ান্ত অর্থাৎ দ্বিতীয় সংস্করণে কোনো ভুল না থাকে।
তৎকালীন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার পর আমরা শিখে গিয়েছিলাম পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে নিউজরুম সচল রাখতে হয়। এর মধ্য দিয়েই গণ-অভ্যুত্থানের ডামাডোল আর সরকারি ভাষ্যে আড়াল হয়ে পড়া সত্যকে খুঁড়ে বের করে নিয়ে আসার বিষয়ে সচেষ্ট ছিল বণিক বার্তা নিউজরুম।
(লেখক: যুগ্ম বার্তা সম্পাদক; বণিক বার্তা)










