১৬ জুলাই রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। সারা দিনের কর্মব্যস্ততায় ক্লান্ত শরীর। আবার শহীদ আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় মানসিকভাবেও ছিলাম বিপর্যস্ত। ক্লান্তি-শ্রান্তি নিয়ে কর্মস্থল কারওয়ান বাজার থেকে আবাসস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হই। রাজু ভাস্কর্যে পৌঁছতেই রোকেয়া হল থেকে ভেসে আসে তুমুল হট্টগোলের শব্দ। ততক্ষণে রাত ১২টা ১০ কিংবা ১২ মিনিট। এগিয়ে গিয়ে হলের কর্মচারীদের কাছে জানতে পারি ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাসে নারাজ রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা। ভাই হারানোর শোকে বিক্ষুব্ধ বোনেরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা আতিকা বিনতে হোসেনসহ হল ছাত্রলীগের ১০ নেত্রীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। পরে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা এবং হলের অভ্যন্তরে দলীয় রাজনীতিমুক্ত রাখার শর্তে প্রাধ্যক্ষের মুচলেকা নিয়ে অবরুদ্ধদের ছেড়ে দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

পরবর্তী ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে একই কৌশলে হল থেকে ছাত্রলীগ নেত্রীদের বিতাড়ন করেন শামসুন্নাহার হল, সুফিয়া কামাল হল, কুয়েত মৈত্রী হলের নারী শিক্ষার্থীরা। তাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ছাত্ররাও নিজেদের হলকে একে একে ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করে। ছাত্রদের হলের মধ্যে প্রথম ছাত্রলীগমুক্ত হয় সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। এ ধারাবাহিকতায় পরদিন দুপুর ১২টার মধ্যে ছেলেদের সব হল থেকে ছাত্রলীগ তাড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মুক্তাঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা দেয় ভাই হারানো বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। সবক’টি হলের শিক্ষার্থীরা একই মৌলিক শর্তে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনের মুচলেকা নেয়। সব মিলিয়ে ১২-১৩ ঘণ্টার মধ্যে গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগমুক্ত হয়।

সেদিনের ঢাবির হলগুলোয় শিক্ষার্থীদের বিস্ফোরণ ছিল বহু বছরের ক্ষোভের বহিঃর্প্রকাশ। কেননা গত সরকারের আমলে শিক্ষাঙ্গনে একদলীয় ব্যবস্থা কায়েম করেছিল ছাত্রলীগ। আসন বণ্টন ব্যবস্থায় ডি-ফ্যাক্টো প্রশাসক ছিল নিষিদ্ধ সংগঠনটি। হলে একটি আসনের বিনিময়ে ক্লাস-পরীক্ষা ফেলে রেখে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রটোকল দিতে হতো শিক্ষার্থীদের। যেন আধুনিক যুগে ফিরে এসেছে মধ্যযুগীয় ক্রীতদাস প্রথা। তার পরও পান থেকে চুন খসলেই শারীরিক-মানসিক অত্যাচার ভোগ করতে হতো। নারী শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করা হতো। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। চোখের সামনে হাজারো অনিয়ম-দুর্নীতির পর চুপ করে থাকতে হতো। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে জায়েজ করতে ‘সহমত জ্ঞাপন’ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করা যেত না। এ রকম দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষার্থীরা মুক্ত হন ১৭ জুলাই।

সেদিন তপ্ত দুপুরেও ক্যাম্পাসের বাতাস একটু বেশিই নির্মল ও প্রশান্তির লাগছিল। জসীমউদ্‌দীন হলের ৪১৮ নম্বর কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক পরিচিতের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলাম, ‘আমরা একটি ঐতিহাতিক মুহূর্ত পার করছি, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে নারীরা।’