২০২৪ সালের ২০ জুলাই। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মোহাম্মদপুরজুড়ে সংঘাত নতুন মাত্রা নেয়। মোটরসাইকেলে না চড়ে গলিপথেই চলছিলাম। তখনই পুলিশের গুলির শব্দ কানে আসে। গলির গেট লক করা ছিল। আমরা কয়েকজন গেট থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মুহূর্তেই নারী-পুরুষের ভিড় জমে যায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্য গেটের ফাঁকা দিয়ে বন্দুক প্রবেশ করিয়ে নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকেন।
গুলিতে সাত-আট শিশু ও কয়েকজন নারী আহত হন। এক কিশোরের মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই মগজ বেরিয়ে যায়। রিকশায় তুলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা চললেও প্রধান সড়কে পৌঁছতেই আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলার মুখে পড়েন স্বজনরা। পরিস্থিতি মুহূর্তেই রূপ নেয় ব্যাপক বিক্ষোভে—নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ সবাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। আকাশ থেকেও হেলিকপ্টারে টিয়ার শেল ও গুলি ছোড়া হচ্ছিল।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোনে খবর নিয়ে নিশ্চিত হলাম—সেদিন মরদেহের সারি দীর্ঘ হবে। সরাসরি ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে ঢুকতেই চোখে পড়ে, মেঝেতে সারি সারি লাশ ও গুলিবিদ্ধ মানুষ। সেদিন রাত ৮টা পর্যন্ত নথিভুক্ত না হওয়া মৃতদেহ গুনে পেলাম ২১টি। সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ ছিল ২৮ জন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তাদের কাছে আরো ১৬টি লাশ ছিল, যা নথিভুক্ত হয়নি। অন্যদিকে রাত ১০টার মধ্যে অফিসে ফেরার তাগিদ আসছিল—পত্রিকা বের করতে হবে, কখন প্রেস বন্ধ করে দেয়া হবে বা অফিসে হানা দেয়া হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
জুলাইয়ের সেই দিনের ট্রমা এখনো পিছু ছাড়েনি। হাসপাতাল এলাকায় গেলেই অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে। কত পরিচিত, কত স্বজনতুল্য মানুষ সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন; কেউ সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়নি। সাংবাদিক হিসেবে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রেখে খবর প্রকাশের চেষ্টা করেছি, যদিও সংঘাতের ভেতর বহুবার মনে হয়েছে—এদিনই হয়তো জীবনের শেষ দিন।










