আমি সবসময় যেকোনো আন্দোলনেই ছিলাম। আমি যখন শিক্ষার্থী ছিলাম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছি, সেই সময় থেকে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম। সেই সময় আমরা দেখেছি, ফ্যাসিস্ট সরকার কীভাবে বাচ্চাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনকে নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে দমানোর চেষ্টা করেছে।
শুধু তাই নয়, সাড়ে ১৫ বছর ধরে দেশে দমন-পীড়ন, গুম, আয়নাঘর, ক্রসফায়ার, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, বাকস্বাধীনতা হরণ এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা জনগণের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যে অভিনয় করেছেন সেগুলো আমাদের ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হারানোর বেদনা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষকে কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়ার অপচেষ্টার ফলেই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। সে জায়গা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও উত্তাল হয়ে ওঠে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছিল। আন্দোলনের একপর্যায়ে উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের হাত থেকে নারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও রেহাই পাননি। উপাচার্যের বাসভবনে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক, ছাত্রলীগ, পুলিশ ও বহিরাগতরা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তখন থেকেই বেশি উত্তাল হয়ে ওঠে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এটি জাহাঙ্গীরনর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। এরপর গত বছরের ১৬ জুলাই আমরা ৫০-৬০ জন শিক্ষক মুখে কালো কাপড় বেঁধে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাই এবং প্রশাসকের উপস্থিতিতে এ ধরনের নির্যাতনে প্রশাসনের জবাবদিহি চাই। প্রশাসন এ ঘটনার বিচার না করে সিন্ডিকেট ডেকে তড়িঘড়ি করে হল ভ্যাকেন্ট করে দেয়। যখনই শিক্ষার্থীরা কোনো ন্যায্য আন্দোলন করেছেন কিংবা আন্দোলন জোরদার হয়েছে তখনই বিগত ফ্যাসিস্ট প্রশাসন হল ভ্যাকেন্ট করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছে। পরদিন ১৭ জুলাই শিক্ষার্থীদের ৪টার মধ্যে হল ছেড়ে দেয়ার জন্য বলা হয়। আমরা চার-পাঁচজন শিক্ষক প্রশাসনের সঙ্গে বারবার কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রশাসন আমাদের দেখা করার কোনো সুযোগ দেয়নি। তারপরে আমরা দেখেছি ৪টা থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। পুলিশ ও ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। টিয়ার শেল ছোড়া হয়। যেহেতু আমি বিভাগের সভাপতি ছিলাম, তাই সেদিন আমি আমার অফিস রুম খুলে দিয়েছিলাম। আমি একজন পিয়নকেও রেখে দিয়েছিলাম, যাতে শিক্ষার্থীরা বিভাগে আশ্রয় নিতে পারে। আমি সারাক্ষণই সমাজবিজ্ঞান অনুষদ থেকে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল পর্যন্ত রাস্তায় দৌড়াদৌড়ির মধ্যে ছিলাম, যাতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে হলে পৌঁছে দেয়া যায়।
স্বাধীন বাংলাদেশে একটি ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে ঘিরে ফ্যাসিস্ট সরকার ধীরে ধীরে দেশকে একটি রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। শিশু-শিক্ষার্থী-পথচারী-শ্রমজীবী, এমনকি ঘরে পর্যন্ত কেউ নিরাপদে ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে নির্বিচারে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়েছে। শিশু বা নারী ঘরের ভেতরেও নিরাপদ ছিল না। চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, সাধারণ পথচারী, রিকশাওয়ালা কেউ বাদ যায়নি সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ করেছি। লাখো প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীন দেশটা আমরা পেয়েছি সেই দেশটাকে রক্তাক্ত করেছেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা।
ফ্যাসিস্ট সরকার বিগত সাড়ে ১৫ বছর অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও মানুষকে গুম করেছে। কোটা সংস্কারের মতো একটি ন্যায্য আন্দোলনকে ফ্যাসিস্ট সরকার নানাভাবে উসকানি দিয়ে এবং নির্যাতন হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সারা বাংলাদেশকে যেভাবে রক্তাক্ত করেছিল সাধারণ মানুষ হিসেবে বা একজন শিক্ষক হিসেবে সেটা মেনে নেয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। এ কারণে প্রতিটা দিনই আন্দোলনে থেকেছি, সেই আন্দোলনে থেকে শিক্ষার্থীদের সাহস দেয়ার চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই শেখ হাসিনাকে হত্যাকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছিল না। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। শিশু মানছে না, প্রৌঢ় মানছে না, যুবক মানছে না, শিক্ষার্থী মানছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।
প্রতিটা মিছিলে প্রতিটা সময়ে নারীরা কিন্তু সামনে ছিল, সম্মুখ যোদ্ধা ছিল। নারীরা দেশের প্রতিটি আন্দোলনেই সম্মুখ সারিতে ছিলেন। নারীরা শুধু জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নয়, তারা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানেও সম্মুখ যোদ্ধা ছিলেন। নারীদের যতটুকু মূল্যায়ন করা উচিত কিংবা যতটুকু সম্মান দেখানো উচিত সেই সম্মানটুকু কিন্তু দেখানো হয় না।
জুলাই-আগস্টে নারীরা সবচেয়ে বেশি নৃশংসতার শিকার হয়েছেন। জুলাই আগস্টে নারীদের রক্তাক্ত ছবিগুলো জনগণের মনে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল ও এক ধরনের সহানুভূতিও জাগিয়েছিল জনগণের মনে। ফলে দেখা যায় জনগণ সেই ছবিগুলো দেখেই কিন্তু রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারীরা যদি জেগে ওঠে সেই আন্দোলনকে দমানো কিন্তু অনেক কঠিন। কারণ নারীদের মধ্যে যে আবেগ ও নীতিবোধ থাকে, সেই জায়গা থেকে নারীকে আন্দোলন থেকে হটানো সহজ না।
নারীদের স্লোগান ছিল কে এসেছে, কে এসেছে; পুলিশ এসেছে, পুলিশ এসেছে; কী করছে কী করছে স্বৈরাচারের পা চাটছে। যখন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বলে গালাগাল দিলেন, তখন গভীর রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা তাদের হলের তালা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের নারীরা বের হয়ে আসেন। আন্দোলনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টতায় আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। মনে হচ্ছিল একটা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
কোটা প্রথার বিরুদ্ধে নারীদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তাদের কোটা থাকা সত্ত্বেও তারাও বলেছে, আমরা কোটা চাই না। আমরা চাই মেধাকে মূল্যায়ন করা হোক। তাদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করা উচিত।
প্রতিনিয়তই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলতে থাকল। ঐক্যই ছিল নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের একমাত্র মনোবল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে স্বপ্ন ছিল বৈষম্য বিলোপ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। এমনকি নারী ও পুরুষের মধ্যেও কোনো বৈষম্য থাকবে না। এ জায়গা থেকেই সবাই একত্র হয়েছিল। একই কাতারে সবাই এসে দাঁড়িয়েছিল। সবার লক্ষ্য ছিল এক—বৈষম্য দূর করা।
জুলাই-আগস্টে নির্বিচারে যেভাবে শিক্ষার্থী, পথচারী ও শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে, এ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতির রুমে যে ছবিটা ছিল সেটি সেখানে থাকার কোনো অধিকার নেই। সেজন্য আমি সেই জায়গা থেকে তার ছবিটা নামিয়ে ফেলেছিলাম। এ ছবি নামানোর মধ্য দিয়ে আমি তার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করি।
জুলাই-আগস্টে যে স্বপ্নটা নিয়ে আমরা সবাই এক হয়েছিলাম, গত এক বছরে সেই স্বপ্ন পূরণের কোনো উদ্যোগ আমার চোখে পড়েনি। বৈষম্য দূর হয়নি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসেনি। আইন আদালতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। যে দেশে মানুষের নিরাপত্তা থাকে না সেখানে মূল্যবোধের ভীষণ অবক্ষয় দেখা দেয়। কাজেই সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম জোর দেয়া উচিত ছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে।
আন্দোলনে নানা ধর্ম, নানা বর্ণ ও নানা শ্রেণী-পেশা, বিভিন্ন দলের মানুষের সমান অংশীদারিত্ব ছিল। জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীরা একটা রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। আমরা তাদেরকে নেতা মেনেছি। জনগণ তাদের নেতৃত্বে একই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল। ক্ষমতায় না গিয়ে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তারা জনগণের পালস বোঝার চেষ্টা করত, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে হত্যাযজ্ঞ চলেছে সেখানেও যদি তারা প্রতিবাদ জারি রাখত তাহলে আমার মনে হয় বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল বৈষম্য, নির্যাতন, গুম ও খুন থেকে মুক্তি মিলবে। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে মানুষের বাকস্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসব জায়গায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। গত এক বছরে মানুষের তেমন কোনো স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে আমরা হাল ছাড়িনি। জনগণ উন্মুখ হয়ে আছে, যদি গণতান্ত্রিক উপায়ে কোনো সরকার আসে তাহলে সেই সরকার জনগণের আশা পূরণ করবে। আমরাও আশা করছি যে এমন সরকার আসবে যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেবে।
ড. শামীমা সুলতানা: অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি
বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










