এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের সেই ছবি আজও হয়ে আছে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। কবি শামসুর রাহমানকে স্পর্শ করেছিল সেই ঘটনা। যার প্রকাশ ঘটেছে ‘‌বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ কবিতায়। তিন যুগ পর কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের বন্দুকের সামনে দুই হাত উঁচু করে বুক পেতে দেয়া শহীদ আবু সাঈদের অসীম সাহসিকতাই যেন বলে দিচ্ছে আবু সাঈদের বুক যেন বাংলাদেশের হৃদয়। পুরো আন্দোলনজুড়ে আবু সাঈদের এ হাত উঁচু করে বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেয়ার চিত্রই হয়ে ওঠে এক প্রতিবাদের প্রতীক। অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে শত শত শহীদ ছাত্র-জনতাকে। সাঁজোয়া যানের সামনে স্কুলছাত্রকেও দেখা গেছে বুক পেতে দিয়ে বলতে, ‘আঙ্কেল গুলি করেন’। দেয়ালে দেয়ালে স্থান পাওয়া আবু সাঈদের সেই প্রতীকী ছবির সামনে এখনো তার সেই ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে দেখা যায় আগামীর প্রজন্মকে।

রাজধানী ঢাকাসহ মফস্বল শহর, স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। হাতের লেখা কিংবা আঁকা যতটা আনাড়িই হোক না কেন প্রতিটি দেয়াল যেন আন্দোলনের দিনগুলোর হারানো শোক, অভ্যুত্থান-পরবর্তী শান্তি, সহমর্মিতা, সংস্কার আর নতুন বাংলাদেশের বার্তা দিচ্ছে। যে দেয়াল ছিল স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিবাদের ভাষায় বিবর্ণ সে দেয়াল হয়ে উঠল আরেক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতে রঙতুলি আর স্প্রে ক্যান নিয়ে নেমে পড়েন রাস্তায়। এ চিত্র শুধু ঢাকার নয়, বরং সারা দেশের বিভিন্ন শহরের অলিগলির চিত্রই যেন রঙে রঙে পাল্টে গেছে। দেয়ালের ভাষাই যেন এখন জনমানুষের মনের ভাষা। গ্রাফিতিতে স্থান পাওয়া বিষয়বস্তু দেখলেই বোঝা যায় ‘রাজনীতিবিমুখ প্রজন্ম’ বলা জেনজিরা কতটা রাজনীতি সচেতন।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন কোনো কথা বলার যেমন স্বাধীনতা ছিল না, তেমনি স্বাধীনতা ছিল না লেখার। হোক সেটা কংক্রিটের দেয়াল কিংবা ফেসবুকের ওয়াল। ৫ আগস্টের আগে আন্দোলনের দিনগুলোয় শিক্ষার্থীদের যেসব দেয়াল লিখন চোখে পড়ে তার অধিকাংশই খুব অল্প সময়ে লিখে কোনোমতে জায়গা থেকে প্রস্থান করেছেন তারা। অনেকটা ভয়, আতঙ্ক আর শঙ্কা নিয়েই ছিল দেয়াল লিখনগুলো। সেখানে ফুটে উঠেছে নানা দাবি, ক্ষোভ, প্রতিবাদ আর বিপ্লবের চিত্র। আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেয়াল লিখন ছিল মূলত শৈল্পিক ছাপ, রাষ্ট্র মেরামত কিংবা সংস্কারের আহ্বান, নতুন বাংলাদেশের আহ্বান। জায়গা পেয়েছে আন্দোলনের দিনগুলোয় শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনের মিথ্যা বুলির প্রতিচ্ছবি আর বর্বরতার চিত্রও।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকালে গ্রাফিতি বা দেয়াল লিখন মুছে করা নতুন গ্রাফিতির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে অনেক প্রতিবাদী ভাষা। ওই সময়ের দেয়াল লিখনের মধ্যে অন্যতম ছিল—কে রাজাকার?, না দিয়ে অধিকার বলে রাজাকার, লাশ দাফন হবে কোন কোটায়, মেধা হত্যার বিচার চাই, লাশের ভেতর জীবন দে নাইলে গদি ছাইড়া দে, দেশটা কারো বাপের না, ১৮ কোটি বুলেট আছে তোদের?, স্বৈরাচার আর কয়দিন, অধিকারের লড়াই, এ বয়স হার মানার নয়, নেট নিয়া মারে ঝলক নাম তার nigga পলক, মোরা সাঈদ, মোরা রাফি, মোরা মুগ্ধ সময়ের আলোড়নে হব সিংহ, পানি লাগবে কারো? পানি?, শহীদ মীর মুগ্ধ, ১ দফা, হাসিনাকে নামতে হবে, বিপ্লবের রঙ মোছা যায় না, আমরা ৫২ দেখিনি ২৪ দেখেছি, শোকের মাস জুলাই আগস্ট নয়, নাটক কম কর পিও, জয় বাংলা Gen Z সামলা, বুকের ভেতর অনেক ঝড় বুক পেতেছি গুলি কর, লাগবে না তোর অধিকার, ফিরিয়ে দে ভাই আমার, চব্বিশের জনযুদ্ধ ইত্যাদি।